kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

Reporterer Diary

নীরবে মানবতার হাত, শিক্ষা নেব কি

বাহরাম খান   

১৪ এপ্রিল, ২০২০ ১৭:৫৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নীরবে মানবতার হাত, শিক্ষা নেব কি

ব্যক্তিগত কাজ সেরে একটি দোকান থেকে বের হলাম। স্থান রাজধানীর ধানমণ্ডি ল্যাবএইড হাসাপাতলের বিপরীত পাশ। হেঁটেই যাচ্ছি, গন্তব্য আজিমপুর। দুপুর সাড়ে বারোটার মতো বাজে। রাস্তা একদম খালি, দু-একটি সিনজি, প্রাইভেট কার চলছে সাঁই সাঁই করে চলছে। দূর থেকেই খেয়াল করছিলাম, নিউমার্কেটের পাশ থেকে আসা একটি গাড়ি চলছে ধীর গতিতে। ফুটপাতের পাশে মানুষ দেখলেই থামছে। আবার সামনে এগুচ্ছে। এমন করতে করতে আমার কিছুদূর সামনে দাঁড়ালো। গাড়ির ভেতর থেকে ফুটপাতে থাকা দুই জন মানুষের জন্য দুইটি খাবারের প্যাকেট বাড়িয়ে দিলেন একজন। 

দেখেই বুঝা যাচ্ছিল। নিম্ন আয়ের মানুষ। রাস্তায় বের হয়েছেন যদি কোনো সাহায্য পাওয়া যায়। গাড়ির ভেতর থেকে খাবারের প্যাকেটের হাতছানি দেখেই খাবার নিলেন। সঙ্গে গলিতে থাকা আরো কয়েকজনকে ডাকলেন। খাবার পেলেন তারাও। খাবার দিয়ে গাড়িটা দ্রুত চলে গেল। ঘটনাটা এত তাড়াতাড়ি ঘটলো যে ছবি তুলে আর কিছু বুঝে উঠার আগেই উধাও সাদা রংয়ের প্রাইভেট কারটি। শুধু এতটুকু বুঝতে পারলাম, ড্রাইভারের পাশে একজন বোরকা পড়া মহিলা। তিনিই খাবার তুলে দিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন অভাবী মানুষের হাতে।

মনটা আনন্দে ভরে গেল। এটাই তো দান-এর প্রকৃত দৃশ্য। পবিত্র হাদিসে আছে- এমনভাবে দান করুন, যাতে ডান হাতের দান বাম হাতেও টের না পায়। আজকাল দানের যে দৃশ্য চোখে পড়ে তাতে খুব আহত লাগে। একটি সামান্য প্যাকেট একজন অভাবী মানুষকে দেওয়ার জন্য ডজন ডজন মানুষ ক্যামেরা দিকে দাঁত ভাসিয়ে হাসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ছবি ভরে গেছে। না, এক দফা ছবিতে সন্তুষ্ট না এসব ‘দানবীর’রা। সামান্য একটি উদ্যোগের কত যে ছবি ফেসবুকে আপলোড করা যায় তার একটি অতি সামন্য বর্ণনা দিতে চাই।

সমমনা একটি গ্রুপ এই করোনা সময়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাড়াঁবে। এজন্য তারা একদিন বৈঠকে বসলো। সেখান থেকে ছবি পোস্ট শুরু- ‘আজ সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা গরিব মানুষের পাশে দাঁড়াব’- লিখেই কয়েকজনের দাঁত ভাসানো সম্মিলিত ছবি দেখা গেল। (উল্লেখ্য তারা করোনার সময়ে নিজেরাই সচেতন নন, সামাজিক দূরত্ব মেনে ছবিটাও তুলেননি)। 
দ্বিতীয় বৈঠকে সগর্বে জানানো হলো,  ...... টাকা উঠেছে, শিগগিরই ত্রাণ নিয়ে হাজির হবো গরিবের দুয়ারে দুয়ারে (অনেকটা বাংলা সিনেমার প্রমোর মতো)। 

তৃতীয় দফায় চাল-ডাল কেনার দৃশ্য দেখানো হবে। চতুর্থ দফায় ফেসবুকে আসবে ভিক্ষার থলির মতো কিছু প্যাকেটে করা স্তুপের দৃশ্য। 

এরপর ফাইনাল রাউন্ড। একটা প্যাকেট ১৩ জন ধরে একজন মানুষকে দেওয়ার দৃশ্য। উফফ্ । হাপিয়ে গেলাম। এগুলো প্রত্যক্ষভাবে জানা দৃশ্য। এর বাইরে আরো কোনো কৌশল আছে কি না জানি না।

না, বিপদের সময় মানুষের উপকার করার আগ্রহকে ছোট করে দেখছি না। যেভাবে পর্যায়ক্রমে ফেসবুকিং ত্রাণ সিস্টেম চলছে তাতে বিরক্ত হচ্ছি। সামান্য দুইটা সাহায্যের জন্য এত প্রচার করতে হবে কেন আমাদের। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অবারিত। ব্যক্তিগত যে কোনো ধরনের প্রচার চালানোর সুযোগ আছে। আমি নিজেও সেই সুযোগ নিই। কিন্তু অন্যকে সামান্য সাহায্য দেওয়ার সময় কেন প্রচার করতে হবে? এই দেওয়া আপনি কতদিন দিতে পারবেন? একদিন, দুইদিন, এর চেয়েও বেশি! মনে হয় না। 

তাহলে এত বড়াই কেন? তার চেয়ে বরং এই সংকটে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ বেশি কার্যকর। যদি ত্রাণ কিছু দিতেই চান তাহলে নীরবে দিয়ে দিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করুন। আর অভাবী মানুষের ঘরে ঘরে বলুন যে, এই খাবার দিয়ে গেলাম। আগামী এক সপ্তাহ ঘর থেকে বের হবেন না।

রোহিঙ্গাদের ঢল শুরু হওয়ার সময়ের দৃশ্য মনে আছে? সারা দেশের ‘দানবীর’রা ত্রাণ নিয়ে কক্সবাজার দৌঁড়েছেন। কয়দিন দৌড়ালেন শুনি? করোনা পরিস্থিতিও কয়েকমাস ভোগাবে। এর অর্থনৈতিক প্রভাব থাকবে কয়েক বছর। তাই মানুষকে সচেতন করার কাজকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। 

উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ত্রাণ স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে দিন। আর সামান্য পরিমাণ হলে ওই মহিলার কাছ থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। পাহাড় সমান দান করে চেহারা দেখানোতে বাহাদুরি নেই, প্রকৃত মন নিয়ে তিল পরিমাণ দানও বড় উদাহরণ হতে পারে।



সাতদিনের সেরা