kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ আষাঢ় ১৪২৭। ২ জুলাই ২০২০। ১০ জিলকদ  ১৪৪১

Reporterer Diary

করোনাকালে কেমন আছি?

আনিসুর বুলবুল   

১৪ এপ্রিল, ২০২০ ১৩:১৫ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনাকালে কেমন আছি?

যে টাইমটাতে আয়ানের স্বজনদের সান্নিধ্য পাওয়ার কথা; সে টাইমটাতে ও বারান্দার গ্রিল ধরে আকাশের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।

স্রেফ এক সেকেন্ড। হাইড্রোলিক ব্রেক না থাকলে কি যে ঘটতো! তাকিয়ে দেখি, আমার বাইকের সামনে এক নারী দাঁড়িয়ে; তার কোলে এক কি দেড় বছরের এক বাচ্চা।

ফুটপাত থেকে হুট করে ওই নারী আমার বাইকের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন; আমার দিকে হাত বাড়িয়ে আছেন।

ঘটনাটি হোটেল রেডিসনের ঠিক একটু আগে।

রাত সাড়ে দশটা। অফিস থেকে বাসায় ফিরছি। বাইকের গতি ১৫ থেকে ২০ এর মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

বসুন্ধরা থেকে কুড়িল ফ্লাইওভার পার হয়ে শ্যাওড়া। পুরো রাজপথ ফাঁকা। এ যেন অচেনা নগরী।

শ্যাওড়ার রেলক্রসিং এলাকায় জটলা। আমার বাইকের গতি কমে যায়। রেলক্রসিং এলাকায় একটি লাল রঙের প্রাইভেট কার ঘিরে রেখেছে কিছু মানুষ।

চোখ পড়তেই বুঝতে পারি; ওই কার থেকে কিছু খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হচ্ছে। আমার বাইক রাজপথ ধরে সামনের দিকে যায়।

এরপর আরেকটু এগুতেই ঘটে ঘটনাটি।

ওই নারী আমাকে বলেন, 'মাইয়াডা না খায়া আছে'।

আমার বুকটা ধুক করে ওঠে!

দুই

আয়ান এখন হাটতে পারে, কথা বলতে পারে, খেলতেও পারে। কখনো ক্রিকেট ব্যাট হাতে পুরো বাসা ঘুড়ে বেড়ায়; কখনো বা ফুটবল নিয়ে।

সে আজ আমাকে 'পাপো' বলে ডাকতে শুরু করছে। পাপো বলাটা ওকে শেখানো হয়নি; নিজে নিজেই শিখেছে।

আগে কিছু দিন ছোট্ট একটি চুম্বকচিত্র ওয়াশিং মেশিন আর ফ্রিজে লাগাতো; এখন দেখছি ড্রয়িং টেবিল, চেয়ার, দরজা, সোফা আর অ্যাকোরিয়ামে লাগানোর চেষ্টা করছে!

সেদিন দেখলাম একা একাই চুষে চুষে জুস খাচ্ছে। কখনো লাবিবার হাত থেকে চিপস নেওয়ার জন্য ছুটোছুটি করছে।

মাঝে মধ্যে মোবাইলে ওর ফুপুকে ভিডিওকল দিয়ে বলে 'ফুপুও'! ওই ওইপাশে শোনা যায় ওর ফুপুর চিৎকার 'ওরে আমার সোনারে!'

যে টাইমটাতে আয়ানের স্বজনদের সান্নিধ্য পাওয়ার কথা; সে টাইমটাতে ও বারান্দার গ্রিল ধরে আকাশের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।

আমার বুকটা ধুক করে ওঠে!

তিন

বড় ভাইয়ের একমাত্র ছেলের বিয়ে। মাস তিনেক আগে থেকেই প্ল্যান করা শুরু করি আমরা।

কনের বাড়ি চট্টগ্রামে বরযাত্রা যাওয়ার জন্য ট্রেনের একটি বগি ভাড়া করা হয়; চট্টগ্রামে গিয়ে যে হোটেলে ওঠবো সেটিও।

ঠিক করা হয় বউভাত আর গায়ে হলুদের জন্য কমিউনিটি সেন্টার; বাসার সামনের পুরো রোড আলোকসজ্জার ব্যবস্থাও।

পছন্দ করা হয় বরযাত্রার প্রত্যেকের জন্য পাঞ্জাবি-পাগড়ির কালার, ডিজাইন। ছাপানো হয় বিয়ের কার্ডও।

অথচ সবকিছু বাদ দিতে হয়েছে।

সেদিন শুধুমাত্র বড় ভাই আর ভাবি তার ছেলেকে নিয়ে গিয়ে আকদ করিয়েছে। একা একাই বাসায় নিয়ে এসেছে বাড়ির একমাত্র ছেলের বউকে।

সেই যে একটি মেয়ে একা বাপের বাড়ি ছেড়ে এসেছে; আজও আর যেতে পারেনি। এখন পর্যন্ত আমরাও প্রিয় ভাতিজার প্রিয় বউকে দেখতেও পারিনি।

আমার বুকটা ধুক করে ওঠে!

চার

সেরেলাক, ওটস, ডায়াপার আর কিছু কাঁচা বাজারের তালিকা ধরিয়ে দেয় বউ। হ্যান্ড গ্লাভস-মাস্ক পরে বাসা থেকে বের হই।

বাজারের প্রবেশ মুখ পর্যন্ত রাস্তা ফাঁকা। সেখানে গিয়ে পড়ি মসিবতে। সামাজিক দূরত্ব খায় না মাথায় নেয় অবস্থা। দোকানের সামনে গোল মার্ক করা থাকলেও সবাই গায়ে গা লাগিয়েই বাজার করছে।

কোনো রকমে হেটে সোজা পরিচিত দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। দোকানের সামনেও ভিড়।

দোকানদারের মাস্ক গলায়; ঘেমে একাকার। একটার পর একটা বাজার দিতেই আছেন।

'জাহাঙ্গীর ভাই, দোকানের সেই ছেলেটি কই?'

আমার দিকে একবার তাকান; কথার কোনো উত্তর না দিয়ে আমাকে দাঁড়াতে বলেন। পনের-বিশ মিনিট পর

আমার সিরিয়াল আসে। আমি কেবলই হাতে ডায়াপারের ব্যাগটি ধরেছি ওই সময় হুট করে এক বৃদ্ধা এসে আমার হাতটি চেপে ধরেন।

বৃদ্ধার চোখের দিকে চোখ পড়তেই বুঝতে পারি; দোকানের সামনের সারিতে রাখা পাউরুটির দিকে তার ইঙ্গিত।

সামাজিক দূরত্ব আর আতঙ্ক মাথায় থাকা দোকানদার দেন ধমক! মলিন চেহারার বৃদ্ধার ভাঁজপড়া হাতটি আমার হাত থেকে আলতো করে ছুটে যায়!

আমার বুকটা ধুক করে ওঠে!

পাঁচ

সেদিনও তার সঙ্গে ক্যান্টিনে বসে কফি খেয়েছি; আড্ডা দিয়েছি। এদিকটায় আসলেই একবার উঁকি দিয়ে যেত সে। আজকে শুনি তার নাকি করোনা পজিটিভ!

আমার এই বন্ধুটি তার বাসাতেই হোম কোয়ারেন্টিনে আছে। বাসায় তার সঙ্গে দুই মেয়ে ও স্ত্রীও আছে।

খুব টেনশন হচ্ছে তার ছোট মেয়েটির জন্য; কি মিষ্টি মেয়েটা!

বন্ধুকে ফোন দিই। মনে হলো কণ্ঠটা একটু দমে গেছে। সাহস দিই।

এতোদিন খবর এসেছে দূরের মানুষদের। আজ আসলো কাছের মানুষের।

ফোনটি রাখতে রাখতেই ফেসবুকের হোমপেজে চোখ পড়ে; বন্ধুটি লিখেছে - চলার পথে যদি কেউ আমার কোনো কথায় বা আচরণে কষ্ট পেয়ে থাকেন, পারলে ক্ষমা করে দিবেন।

আমার বুকটা ধুক করে ওঠে!

--

লেখক : জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, কালের কণ্ঠ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা