kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৩ আষাঢ় ১৪২৭। ৭ জুলাই ২০২০। ১৫ জিলকদ  ১৪৪১

Reporterer Diary

হাজার মাইল দূরে

মেহেদী হাসান   

১১ মার্চ, ২০২০ ১৬:০২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হাজার মাইল দূরে

এটা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রেই সম্ভব! প্রেসিডেন্টকে ইমপিচমেন্ট করার প্রশ্নে সিনেটে ভোট হবে কিছুক্ষণের মধ্যে। শেষ মুহূর্তের যুক্তি-তর্ক চলছে। আর কাকতালীয়ভাবে সে সময়ই বিদেশিদের কংগ্রেস লাইব্রেরি, হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ, সিনেট দেখাতে নিয়ে যাওয়া। তাও আবার যুক্তরাষ্ট্রের টাকায়! 

আমরা যখন কংগ্রেস লাইব্রেরি থেকে সিনেটের দিকে হাঁটছি তখন সেখানে সাংবাদিক ও উৎসুক লোকজনের জটলা। সিনেটরদের কেউ কেউ বের হয়ে সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। দর্শক গ্যালারি  প্রসঙ্গে আগেই বলে দেওয়া হয়েছে- কোনো ছবি তোলা যাবে না। জোরে কথা বলা যাবে না।

হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ/ সিনেটের দর্শক গ্যালারিতে যাওয়ার জন্য আমেরিকানদের পাশ পেতে তার কংগ্রেসম্যান/ সিনেটরের সুপারিশের প্রয়োজন হয়। বিদেশিরা নিজেদের পাসপোর্ট দেখিয়েই শর্তসাপেক্ষে তা পেতে পারে। আমি যখন আমার পুরো গ্রুপের জন্য আমার পাসপোর্ট (বাংলাদেশি) দেখিয়ে পাস সংগ্রহ করছি তখন অনেক আমেরিকান পাস সংগ্রহের পথ খুঁজছে । তাদের একজন বললেন, কত সহজেই তুমি পাস নিয়ে নিলে। আমি বললাম, হ্যাঁ, আমেরিকায় বিদেশি পরিচয়ও অনেক সময় সুবিধাজনক!

আইভিএলপি প্রোগ্রামের প্রথম দিনই লাঞ্চের পর হোস্ট বললেন, ধন্যবাদ আমাদের নয়। ওদেরকে (রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করতে আসা আমেরিকানদের) দাও। কারণ আমেরিকা জনগণের করের টাকায় তোমরা আমেরিকায় এসেছো।

তিন দিন পর ওয়াশিংটনে জাজ সঙ্গীতের এক সান্ধ্য আয়োজনে একই টেবিলে ছিলেন সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়া এক নারী। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, তোমরা কি নিজেদের টাকায় আমেরিকা ঘুরছো? আমি উত্তর দিয়েছি, ‌‌‌‌’না, তোমাদের টাকায়। তোমাদের করের টাকায়। তোমার করের টাকায়।’

এরপর তিনিও রসিকতার সুরে বলেন, যেহেতু আমাদের টাকা। তাই আমি বলবো, এর সদ্ব্যবহার করো। যতটা সম্ভব আমেরিকাকে জানার ও বোঝার চেষ্টা করো।

সিঙ্গাপুর থেকে সানফ্রান্সিসকো যাওয়ার জন্য ফ্লাইটের সিটে বসে শুনছিলাম পাশের সিটে বসা এক আমেরিকান সামনের সিটে বসা অপর এক আমেরিকানের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন। আমার পাশের সিটে বসা ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি কি করেন? সামনের সিটে বসা আমেরিকান জবাব দিলেন, ‌'গ‌ার্বেজম্যান'। অর্থাৎ ময়লা আবর্জনা সংগ্রহ করেন। ওই জবাবের তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া ছিল- ‌‌'গ্রেট' (অসাধারণ)। 

যত দূর জানি, আমেরিকা তথা পশ্চিমা সমাজে কে কি করেন, কার কি পেশা এগুলো নিয়ে লোকজন মাথা ঘামায় না। আর এগুলো তাদের অধিকার চর্চা ও সামাজিক পরিচয়েও তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না। 

এবার আমেরিকায় আসার আগে এবং পরে স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে- ‘অব দ্য রেকর্ড’ মানে ‘অব দ্য রেকর্ড’। আনুষ্ঠানিক সব প্রোগ্রাম, পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা ‌’অব দ্য রেকর্ড’। জানা, বোঝা, আলাপ-আলোচনা, নেটওয়ার্কিংয়ের জন্য প্রোগ্রাম। লেখার জন্য নয়। 

বিটের সহকর্মীদের কয়েকজন ফোন করে জানতে চেয়েছে, কী রিপোর্ট লিখছি? আমেরিকা থেকে লিখবো না দেশে ফিরে লিখবো? তাদের বলেছি, রিপোর্ট লিখবো না।

আমার আইভিএলপি প্রজেক্টের সহকর্মীদের বেশিরভাগই বিভিন্ন দেশের থিংকট্যাংকের ডিরেক্টর। আমি ছাড়া মাত্র একজন সাংবাদিক। এর বাইরেও আছেন একজন সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক। সমস্যা হলো- শুরুর দিকে তিনি কিছুটা দ্বিধান্বিত ছিলেন আমাদের, সাংবাদিকদের নিয়ে। কবে, কখন আমরা কি লেখে ফেলি! তাই হয়তো নিজেদের মধ্যে আলোচনা বা জোকস বলার সময়ও বলে নিতেন, এটাও ‘অব দ্য রেকর্ড’। 

শেষ মেষ কিন্তু দ্বিধা কেটে গিয়েছিল। আমরা ভালো বন্ধুও হয়েছি। দেখা গেলো, ভাষাগত ভিন্নতা থাকলেও বিভিন্ন ইস্যুতে আমাদের চিন্তা-ভাবনা, বোঝাপড়ার পার্থক্য খুব বেশি না। জোকসগুলোও কম-বেশি একই রকম!  

লেখক : কালের কণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের আইভিএলপি অ্যালামনাস

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা