kalerkantho

রবিবার । ১২ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৯ সফর ১৪৪২

Reporterer Diary

৬৮ বছর আগের রক্তাক্ত ঘটনা সম্পর্কে এম এ গোফরানের সেই স্মৃতিচারণ

‘ময়না তদন্ত ছাড়া রাতের মধ্যেই লাশ দাফনের নির্দেশ ছিল আমাদের উপর’

কাজী হাফিজ   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ১৯:২৯ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



‘ময়না তদন্ত ছাড়া রাতের মধ্যেই লাশ দাফনের নির্দেশ ছিল আমাদের উপর’

‘সেই রাতে  কেবল শহীদ আবুল বরকতের মাকে তাঁদের শান্তি নগরের বাসা থেকে আজিমপুর কবরস্থানে নিয়ে আসা হয়। একমাত্র তিনিই তার পুত্রের লাশ দেখতে সক্ষম হন। অন্য ৩ শহীদ- সালাম, রফিক ও জব্বারের লাশ দেখার সুযোগ পাননি তাদের আত্মীয়-স্বজন। রাতের মধ্যেই লাশ দাফন সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশ ছিল আমাদের উপর। ময়না তদন্ত ছাড়াই ঢাকা মেডিকেল থেকে লাশ নিয়ে রাত ২টার সময় আজিমপুর কবরস্থানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই আমরা’।

২০০৫ সালের ফেব্রয়ারি মাসে ধানমন্ডির ভূতের গলির ৩৬ নর্থ সার্কুলার রোডের বাসায় এম এ গোফরান যখন এ কথাগুলো বলছিলেন, তখন তাকে বেশ কিছুটা বিব্রত মনে হচ্ছিল। আমার যে সহকর্মী তার সন্ধান জানিয়েছিলেন. তিনিও পরে বলেছিলেন, ‘বিষয়টি কিভাবে প্রকাশ করবেন জানিন না, তবে দেখবেন গোফরান সাহেব এবং তার পরিবারের সদস্যদের কাছে আমি যেন খাটো হয়ে না যাই। আসলে কিইবা করার ছিল ওনার ! উনি তো কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পালন করেছিলেন মাত্র।’

আমি নিজেও এই যুক্তিতে স্থির হতে পারি যে, এম এ ঘোফরান ছিলেন সে সময়ের বৈরি রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। যাদের নির্দেশে ওই রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছিল, তারাই এর জন্য দায়ী। এমএ গোফরান নন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতেই শুধু নয়, তার পরের ৬৮ বছরে শুধু এদেশেই নয়, সারা বিশ্বেই মাঝে- মধ্যে রাষ্ট্রযন্ত্রকে গণবিরোধী কাজে লাগানো হয়েছে এবং হচ্ছে। এর জন্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রাষ্ট্রযন্ত্রকে যদি দায়ী করতে হয়, তাহলে সে দীর্ঘ তালিকা রাষ্ট্র পরিচালকদের দায় দায়িত্বকে অনেকটাই আড়াল করে দেবে।

অতএব এমএ গোফরানকে সেদিনের একজন অসহায় এবং দুর্ভাগা পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবেই দেখি, যাকে বাঙালি হয়েও বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে রক্তস্নাত আন্দোলনের সময় বিপক্ষ শিবিরে অবস্থান নিতে হয়েছিল। রাতারাতি ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করতে হয়েছিল ভাষা শহীদদের লাশ। তাছাড়া তার স্মৃতিচারণে তারই মত আরো  বেশ ক’জন বাঙালি পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয় মেলে , যারা ওই দিন নিজেদের বাঙালিত্ব বিস্মৃত হয়ে পেশাগত তাঁবেদার চরিত্রটিই প্রকাশ করেছিলেন।

এমএ গোফরান অবশ্য এখন আর বেঁচে নেই। বায়ান্নর একুশে  ফেব্রুয়ারির ভাষা শহীদ বরকত, সালাম, রফিক ও জব্বারের লাশ দাফনের বিয়োগান্তক বিব্রতকর স্মৃতি নিয়ে ২০০৭ সালের ১ জুলাই চিরবিদায় নিয়েছেন তিনি। মৃত্যুর সময তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। ভূতের গলির নর্থ সার্কুলার রোডের ওই বাসাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

 ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময়  তিনি  ছিলেন লালবাগ থানার ওসি । ঢঅকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটি তখন তার দায়িত্বে ছিল। বাংলাদেশে স্বাধীন হওয়ার পর সর্বশেষ ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অবসর নেন।  তিনি নোয়াখালী সমিতি ও রমনা ঊষাসংঘের  আজীবন সদস্য এবং অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর একমাত্র ছেলে মেজর ( অব.) নিজামুল আলম রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিচারক ছিলেন। মৃত্যুর দিনই এমএ গোফরানের লাশ তার  গ্রামের বাড়ি মাইজদিকোর্টে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়। 
এম এ গোফরান বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির সেই ঘটনা সম্পর্কে ২০০৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি নিজের স্মৃতি হাতড়ে জানান, ঘটনাস্থল লালবাগ থানা এলাকার অন্তর্ভুক্ত থাকার কারণে শহীদদের লাম দাফনের ওই দায়িত্বটি সে রাতেক তাকেই পালন করতে হয়।

তিনি আমাকে বলেন, ‘ওই ঘটনা কথনও বিস্মৃত হবার নয়। সব কিছু এখনও আমার স্পষ্ট মনে আছে।   মিল ব্যারাক পুলিশ লাইনের মসজিদের ইমাম সাহেবকে নিয়ে আসা হয় গোসল  দেয়া ও জনাজা পড়াবার জন্য। কাফনের জন্য থান কাপড় আনা হয় পটুয়াটুলির ‘আম্বিয়া ক্লথ স্টোর’ থেকে। ওই কাপড়ের দেকানটির মালিক ছিলেন তখনকার সিটি ডিএসপি কুদ্দুস দেওয়ানের। কবরস্থানে রেঞ্জ ডিআইজি এজেড ওবায়দুল্লাহ, এসপি ইদ্রিস উপস্থিত ছিলেন।

এডিশনাল এসপি মাসুদ মাহমুদ (পাঞ্জাবি) কবরস্থানে যাননি।  এএজড ওবায়দুল্লাহ  সে সময় বলেছিলেন, ‘তাড়াতাড়ি লাশ দাফন শেষ করেন। ছাত্ররা টের পেলে আমাদেরই জীবন্ত কবর দেবে।’ রাত ৪টার দিকেই দাফনের কাজ শেষ হয়ে যায়।

সে সময়ের ঢাকা, রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে সেদিনের সেই  উত্তাল আন্দোলন এবং আন্দোলনকারী ছাত্রদের উপর পুলিশের নির্বিচার গুলি বর্ষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ঢাকায় তখন মাত্র ৪টি থানা। লালবাগ, কোতোয়ালি, সুত্রাপুর ও তেজগাঁও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা তখন লালবাগ থানার অন্তর্ভক্ত ছিল। আমি ওই থানার দায়িত্ব গ্রহণ করি ১৯৫১ সালের ২৭ আগস্ট। তার আগে আমি বাকেরগঞ্জ থানার ওসি ছিলাম।

বিশ্ববিদ্যালয় তথা ঢাকার পরিস্থিতি রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ২১ ফেব্রুয়ারির আগে থেকেই উত্তপ্ত ছিল। ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নেন তারা চীফ মিনিস্টার নুরুল আমীনকে স্মারকলিপি দেবেন। ওই সময় অ্যাসেম্বলি চলছিল। অ্যাসম্বলি হল তখন ছিল আজকের জগন্নাথ হলটির স্থানে। রাওয়াল পিন্ডি থেকে নির্দেশ আসে ছাত্রদের ওই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে দেয়া যাবে না। যে কোনো ভাবেই হোক না কেনো তাদের কে প্রতিহত করতে হবে। ঢাকার ডিএম হেসেবে তখন সদ্য দায়িত্ব নিয়েছেন কোরেইশী নামের এক পাঞ্জাবি । তিনি ওই এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেন। ঢাকার ডিএম হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর  ওটিই ছিল তার প্রথম নির্দেশ। ২০ তারিখের রাতেই ডিসি স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশ প্রচারের দায়িত্ব পড়ে আমার উপর। হোম মিনিস্ট্রি থেকে রাত ১০ টায় আমার কাছে কাগজটি পৌঁছায়। বিষয়টি তখনই নিয়ম মাফিক থানায় সাধারণ ডায়েরিভুক্ত করি।  হোম মিনিষ্ট্রি থেকে এসপি ঢাকাকে বলা হলো প্রস্তুতি নিতে। ২১ ফেব্রুয়ারি ভোর থেকে ডিউটি শুরু হয় আমাদের। শহীদ মিনারটির কাছে তখন ছিল ঢাকা মেডিকেলের পুর্বদিকের গেট সংলগ্ন। মেডিকেল কলেজ হোস্টেলটি ছিল মুলি বাঁশের বেড়ার তৈরি। পশ্চিমে নার্সেস কোয়ার্টারটি তখন নির্মানাধীন। ওই জায়গায় ভাঙ্গা ইটের টুকরো জড়ো করা ছিল। মেডিকেল কলেজ গেটেই ডিউটি পড়ে আমার। সেখানে অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। রাজার বাগ থেকে স্পেশাল আর্মস ফোর্সের একটি বড় দল আসে। তাদের  ইনচার্জ ছিলো এক পাঞ্জাবি, আর আই নবীশের খান। ডিএম কোরেইশী, ডিআইজিপি এ জেড ওবায়দুল্লাহ, এসপি ইদ্রিস ও  এডিশনার এসপি মাসুদ মাহমুদ পাঞ্জাবিও ঘটনাস্থলে ছিলেন।

১৪৪ ধারা জারির পর আন্দোলনকারীদের অনেকেই তখন আত্মোগোপন করেছিলেন। ছাত্ররা  ৫ জন একত্রিত হলেই তারা  ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেছে বলে ধরে নিতে প্রস্তুত ছিল পুলিশ। এ অবস্থায় বেলা ৩ টা সাড়ে ৩টার দিকে ছাত্ররা  ৪ জন করে অ্যাসেম্বলি হলের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তাতেও বাধা দেয়া হয়। চারটার সময অ্যাসম্বলি শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু পুলিশ কর্তৃপক্ষের  ওই মনোভাবের কারণে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেন। পুলিশের মারমুখী আচরণের প্রতিবাদে ইট-পাটকেল নিক্ষেপও শুরু হয়ে যায়। হোস্টেল বয়রা টুকরিতে করে, লুঙ্গিতে ভরে ইটের টুকরো ছাত্রৃদের কাছে সরবরাহ করতে থাকে। তারা নিজেরাও ইট-পাটকেল  ছুঁড়ে পুলিশকে প্রতিরোধের চেষ্টা করে। ওই সময়  ডিআইজিপি ওবায়দুল্লাহ’র পিঠে ইট পড়ে। আর আই নবী শের খানের মাথায় পড়ে ইটের একটি টুকরো। তখনই ডিএম গুলি করার নির্দেশ দেন। এর আগে নবী শের খানের মাথায় যখন ইটের টুকরো পড়ে তখন এসপি ইদ্রিস ডিএমকে উত্তেজিতভাবে বলেছিলেন, ‘ ওয়েল মিস্টার কোরেইশী, ডু ইউ ওয়ান্ট অল অব আস টু ডাই হিয়ার? ইউ শ্যুড নট ওয়েট ইন মোর।’  ইদ্রিসের এ কথার পরই ডিএমস কোরেইশ িবলেন, ‘ওপেন ফায়ার’।

ঘটনাস্থলেই লুঠিয়ে পড়েন সালাম, বরকত। রফিক ছিলেন হাইকোর্টের কার্ক । তিনি পুলিশের ট্রাকের নীচে পড়ে নিহত হন। জব্বার মারা যান পুলিশের লাঠির বাড়িতে।’

তবে রফিকের মৃত্যুর বিষয়ে এ এ গোফরানের এ তথ্যের সঙ্গে একমত ননন সেদিনের অনেক প্রত্যক্ষদর্শী ।  সেসময় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের আর্টিস্ট ও ফটোগ্রাফার আমানুর হক রফিকের লাশের, তাঁর ছিন্নভিন্ন মাথার ছবি তুলেছিলেন। তিনি রফিককে গুলি করা হয় বলেই জানান।

 এম এ গোফরান  আরো বলেন, ‘গুলি চালানোর সময় আমি ইটবৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে ফুলার রোডের ক্রাউন লন্ড্রিতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমি মনে করি পুলিশ  সেদিন এতাটা বাড়াবাড়ি না করলে ওই পরিস্থিতি  সৃষ্টি হতো না। নদীর স্রোতের বিপরিতে বাঁধ দিতে গেলে যে অবস্থা হয় সেদিন সেটাই ঘটেছিল। না হলে ওই দিন চট্রগ্রামের পরিস্থিতিও ছিল ঢাকার অনুরুপ। বিভাগীয় কমিশনার নিয়াজ মোহাম্মদ খান চট্রগ্রামে ছাত্র-জনতার মিছিল সমাবেশে বাধা দেয়ার  বিপইে অবস্থান নেন।

ঘটনাস্থল থেকে লাশ সরিযে নেয়া প্রসঙ্গে এম এ গোফরান বলেন, ওই কাজটি করেছিল পুলিশ। পুলিশের আর্মড ফোর্সের সদস্যরা ধরাধরি করে লাশগুলো মেডিকেলে নিয়ে যায় । রাতে আমার  ওপর নির্দেশ আসে লাশগুলো আজিমপুর গোরস্থানে দাফনের জন্য। আমার মনে পড়ছে, ওই সময় ডিআইজিপি ওবায়দুল্লাহ সাহেব বেশ ভয় পাচ্ছিলেন। বারবার বলছিলেন, ‘খুব তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে আমাদেরকে।’

কেবর আবুল বরকতের মাকে লাশ দেখার সুযোগ দেওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা অন্যদের বাসার ঠিকানা তখনও যোগাড় করতে পারিনি।’

এম এ গোফরান সেদিন আরো জানান, বায়ন্ন একুশে ফেব্রুয়ারির আগেই  তার প্রমোশন এবং বরিশারে পোস্টিং অর্ডার হয়েছিল। কিন্তু ওই ঘটনার পর লালবাগ থানাতেই তাকে তদন্তের প্রয়োজনে থাকতে হয়। একুশের ওই ঘটনা নিয়ে গঠিত হয় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন। সেই এলিস কমিশন মূলত পুলিশের নির্বিচার গুলি বর্ষণের ঘটনাকেই জাস্টিফাই করে। কমিশন রিপোর্টে বলা হয়, ‘ পুলিশ তাদের নিরাপত্তার স্বার্থেই গুলি ছুঁড়েছিল।’ ওই হত্যাকান্ড নিয়ে কোন মামলা হয়নি।

( এম গোফরানের এই স্মৃতিচারণটি এর আগে তার জীবদ্দশায় ২০০৫ সালে একটি জাতীয় দৈনিকে এবং ২০০৮ সালের জাতীয় প্রেসক্লাবের একুশে ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশ হয়।) 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা