kalerkantho

শনিবার । ৪ আশ্বিন ১৪২৭। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১ সফর ১৪৪২

Reporterer Diary

মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে ঘুরছি, কিন্তু কেন জানি না

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৫ জানুয়ারি, ২০২০ ১৯:৩৪ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে ঘুরছি, কিন্তু কেন জানি না

অপরাধ কি জানি না, তবুও মাথার ওপর মত্যুদণ্ড। পার্টির সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে আমাকে দৈহিকভাবে উচ্ছেদ করা হবে। শব্দটা বেশ চমৎকার। শুনেছি আমার মত চুনোপুটিকে দৈহিকভাবে উচ্ছেদ করতে, পার্টি কোনো গুলি খরচ করবে না।

মৃত্যুদণ্ডের খবর পেয়েছি কুষ্টিয়ার সাংবাদিক আমার বন্ধু মিঠু চৌধুরী এবং ছোট ভাই মুনশি তরিকুলের মাধ্যমে। ওয়ান ইলেভেনের পর, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে, কারাগার থেকে বেরিয়ে মিঠু এবং তরিকুল আমাকে উদ্বিগ্নতার সঙ্গে ঘটনাটা জানায়।

ওই সময় তাদের সঙ্গে কারাগারে ছিলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন মার্কসবাদী চর্চা কেন্দ্রের প্রধান ডা. বুলু ওরফে সাগর। ডা. বুলু সশস্ত্র সংগ্রাম ধারার তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে পরিচিত। তাদের মূল সংগঠনের নাম মার্কসবাদী চর্চা কেন্দ্র। গণসংগঠন পৈরাত সমিতি। কুষ্টিয়া, মাগুরা এবং রাজবাড়ী জেলাতে পার্টির তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে পার্টির নেতা ডা. বুলু গ্রেপ্তার হয়ে সে সময় কারাগারে ছিলেন। গ্রেপ্তার হবার পর তিনদিন পর্যন্ত প্রশাসন গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশ করেনি। পরে ডা. বুলুর স্ত্রী তার অবস্থান জানাতে কোর্টে মামলা করলে, পুলিশ তাকে কারাগারে প্রেরণ করে।

ডা. বুলু কুষ্টিয়া কারাগারে থাকতে মিঠু এবং তরিকুলের কাছে আমার সম্পর্কে বলে, আমাকে বলা হয়েছে, আমি পাংশার জনৈক আমজাদ চেয়ারম্যানের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ডা. বুলু এবং তার পার্টির বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে বিষোদগার করে চলছি। আমি পৈরাত সমিতি এবং ডা. বুলুকে নিয়ে একাধিক রিপোর্ট করেছি এটা সত্য। কিন্তু আমজাদ চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় নেই। ব্যক্তিগতভাবে তাকে আমি চিনি না, তিনিও আমাকে চিনেন না। তাছাড়া কখনোই কারো প্ররোচণায় আমি লিখি না। তথ্য নিই।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে চরমপন্থী রাজনীতি অধ্যুষিত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে চরমপন্থীদের হাতে বহু সাংবাদিক খুন হয়েছেন। চরমপন্থী সংগঠনগুলো তাদের হত্যার দায় স্বীকারও করেছে।

কি কারণে চরম পন্থীদের হাতে এতো সাংবাদিক খুন হয়? তাদের বিরুদ্ধে সংবাদ পরিবেশনই কি একমাত্র কারণ? এ প্রসঙ্গে খুলনার একজন প্রবীণ সাংবাদিক আমাকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন। তার মূল বক্তব্য হচ্ছে, এ পর্যন্ত একমাত্র নিউজের কারণে কোনো সাংবাদিককে চরমপন্থীরা খুন করেনি। খুনটা ওরাই করে তবে পেছনে তিনটি কারণই বেশি।

প্রথমত, সাংবাদিকদের নিউজের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত, রাজনীতিবিদ, বা সমাজ বিরোধীরা ভাড়াটে খুনি হিসেবে চরমপন্থীর দিয়ে সাংবাদিকদের খুন করায়।

দ্বিতীয়ত, এ অঞ্চলে কেবল সাংবাদিকই নয় অনেক হত্যাকাণ্ড এবং অস্ত্রবাজ তৈরির পেছনে পুলিশের একটা হাত আছে।

তৃতীয়ত, চরমপনথী সংগঠনগুলো যখন নিশ্চিত হয় কোনো সাংবাদিক তাদের প্রতিপক্ষ সংগঠনের সঙ্গে হাত মিলিয় তাদের বিপে লিখছে সে ক্ষেত্রে তারা সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের ওপর প্রতিশোধ নেয়। পাটিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে।

সাতক্ষীরায় গিয়ে জেনেছিলাম সেখানকার প্রখ্যাত মানুষ দৈনিক পত্রদূত পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক স.ম. আলাউদ্দিন খুন হয়েছিলেন স্থানীয় কতিপয় চোরাকারবারী এবং একই সঙ্গে খুলনা রেঞ্জের এক পুলিশ কমকর্তার সঙ্গে তার বিরোধের কারণে। সাতক্ষীরা থানার একশ গজের মধ্যে থানার গেটের সঙ্গে লাগায়ো তার অফিসে বসা অবস্থা গুলিবিদ্ধ হন তিনি। গুলিটা এসেছিল পেছনের জানালা দিয়ে, অফিসের পেছন দিকটায়ই থানা। কি ভাবে থানার দিক থেকে গুলিটা আসলো আজো তা রহস্যময় হয়ে আছে। আলোচিত ওই পুলিশ কমকতার সঙ্গে স.ম আলাউদ্দিনের বিরোধ ছিল ওপেন সিক্রেট। বতমানে অবসরপ্রাপ্ত ওই পুলিশ কমকর্তা এখন আওয়ামী লীগের হিসেবে পরিচিত, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে বাগেরহাট জেলার একটি আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ওই পুলিশ কর্মকতা।

ক্রসফায়ারে নিহত পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির একাংশের প্রধান চুয়াডাঙ্গার রনি বিশ্বাস এক সাক্ষাতকারে লেখককে বলেছিলেন, স্থানীয় অন্য গ্রুপ চরমপন্থদের দমণ করতে আলমডাঙ্গা থানার সে সময়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকতা রনি বিশাসের হাতে প্রথম অস্ত্র তুলে দেয় এবং দল গঠন করতেও নানাভাবে সহযোগিতা করে। এক সময়ে সন্ত্রাসের দানবে পরিণত হয় রনি বিশ্বাস। যা হোক প্রবীণ ওই সাংবাদিক আমাকে বলেছিলেন দলমত, পক্ষ-বিপক্ষের উর্ধে থেকে সমানভাবে লিখবেন, তাতে বিপদের আশঙ্কা কম। প্রাথমিকভাবে কেউ ভুল বুঝলেও এক সময়ে তা ঠিক হয়ে যায়। অনেকদিন ধরেই সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী দলগুলো নিয়ে লেখালেখি করি, লেখার সময় খুলনার ওই প্রবীণ সাংবাদিকের উপদেশটা মনে রাখার চেষ্টা করি। তারপরও অনেক সময় অনেক চরমপন্থী নেতা ভুল বুঝে ফোন করে গালিগালাজ করেন, হত্যার হুমকি দেন, কাউকে বুঝাতে পারি, কাউকে পারি না, আবার অনেককে বুঝাতে চেষ্টাও করি না।

কমরেড আব্দুল হকের মৃত্যু নিয়ে একটি রিপোর্ট করে এমনি বিপদে পড়ে গিয়েছিলাম। আমি যতদূর জেনেছি কমরেড আব্দুল হকের মৃত্যুর পেছনে পার্টির ফান্ড নিয়ে একটি ঘটন আছে। যদিও তার মৃত্যু ছিল স্বাভাবিক। কোনো হত্যাকাণ্ড নয়। লাল নামের একজন পার্টি ক্যাডার ছিল কমরেড আব্দুল হকের সার্বক্ষণিক সঙ্গী। পার্টি ফান্ডের প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যবসা করতে দেয়া হয়েছিল লালের এক নিকট আত্মীয়কে। কিন্তু লালের ওই আত্মীয়রা টাকা আত্মসাত করে। টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পার্টির টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে ঢাকায় খুন হয় দুই পার্টি ক্যাডার। এ নিয়ে তুমুল হৈ চৈ শুরু হয় পার্টির অভ্যন্তরে। কমরেড আব্দুল হক নিশ্চুপ থাকলেও পার্টির লোকেরা দায়ী করে লালকে। কমরেড আব্দুল হকের সঙ্গে ঝিনাইদহ থেকে যশোর যাওয়ার পথে জবাই করে হত্যা করা হয় লালকে। হত্যার ঘটনা ঘটে কমরেড আব্দুল হকের সামনে। সেখানেই স্ট্রোক করেন তিনি। তাকে প্রথমে নেয়া হয় যশোরে, সেখান থেকে ঢাকাতে। ঢাকাতেই তার মৃত্যু হয়। এ রিপোর্টটি প্রকাশের পর নানামুখী চাপে অস্থির হয়ে উঠি। বেগ সামলাতে অনেক দিন সময় লাগে। অন্য প্রসঙ্গের অনেক কথা বলে ফেলেছি।

২০০৩ সালের ৩১ জানুয়ারি খুন হন পাংশা থানার ওসি মিজানুর রহমান। সে সময়ে ঈদের বন্ধ, পত্রিকা ছুটি। রাজবাড়ীতে ছিলাম শ্বশুর বাড়ি ঈদ করতে গিয়েছিলাম। রাজবাড়ী থাকলে নিয়মিত বসা হয় বাবু মলি­কের পত্রিকা অফিসে। বাবু মলি­ক রাজবাড়ী থেকে দু’টি পত্রিকা বের করেন। সাপ্তাহিক অনুসন্ধান এবং দৈনিক সহজ কথা। ব্যক্তি জীবনে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জড়িত, ভদ্রলোক মানুষ, একজন ভালো বন্ধু। ছুটি শেষে মানবজমিন বেরুবে ৪ ফেব্রুয়ারি। বাবু মলি­ককে বললাম, সময় যেহেতু পাওয়া গেছে এলাকা ঘুরে প্রকৃত ঘটনা বের করে রিপোর্টটা করতে চাই। মোটর সাইকেল নিয়ে দু’জন চারদিনে পুরো এলাকা চষে বেড়ালাম, তাও আসল হত্যাকারীদের সনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ল। যা হোক, অবশেষে ওই দলেরই একজনের সহযোগিতায় আসল ঘটনা পেয়ে গেলাম। ওসি মিজানুর রহমান খুন হয়েছেন ডা. বুলু ওরফে সাগরের পৈরাত সমিতির ক্যাডারদের হাতে, এটা সত্য তবে, ওসিকে খুন করার উদ্দেশ্য ছিল না, তিনি মিস টার্গেট হয়েছেন। এবং সেখানে পার্টি প্রধান ডা. বুলু উপস্থিত ছিলেন না, ছিলেন পার্টির সেকেন্ডম্যান কামাল।

পাংশা থানায় যোগ দেয়ার আগে ওসি মিজানুর রহমান ছিলেন ঢাকাতে একটি এলিট ফোর্সে। পাংশার জাগিরকয়া গ্রামের এক জামাই ঢাকাতে ওই এলিট ফোর্সে ছিলেন তার সহকর্মী। জাগিরকয়া গ্রামে ওই বাড়ির সামনে সে রাতে পৈরাত সমিতির সেকেন্ডম্যান কামালের নেতত্বে পার্টি ক্যাডাররা অবস্থান নেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ওই এলাকায় হঠাৎ গজিয়ে ওঠা এক চাঁদাবাজ বাহিনীর নেতা সজলকে ধরে শাস্তি দেয়া।

ওদিকে বাড়ির সামনে এতো অস্ত্রধারী লোকজন দেখে বাড়ির লোকেরা মনে করেছে, নিশ্চয় বাড়িতে ডাকাত পড়বে, ওরা হয়তো সে কারণে এখানে অবস্থান নিয়েছে। এটা ভেবে, বাড়ির লোকেরা ফোন করেছে ঢাকাতে এলিট ফোর্সে থাকা তাদের জামাতার কাছে। তিনি ফোন করেছেন ওসি মিজানুর রহমানের কাছে। ফোন পেয়ে মিজানুর রহমান মাত্র একজন পুলিশ নিয়ে সাদা পোশাকে যান জাগিরকায়া গ্রামে। অন্ধকার রাত। পৈরাত সমিতির লোকেরা সজল এসেছে মনে করে গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই মারা যান ওসি মিজানুর রহমান। পৈরাত সমিতি নিয়ে এটা ছিল আমার প্রথম রিপোর্ট। এরপর আমি ডা. বুলু এবং তার দল সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিতে চেষ্টা করি।

২০০১ মেয়াদে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর পাংশার এমপি নাসিরুল হক সাবুর ভাই রোজেন রাজবাড়ী এলজিইডি অফিসে প্রায় শ’খানেক ঠিকাদারের উপস্থিতিতে বলেছিলেন, পাংশার অমুক কাজটা কেউ ড্রপ করবে না, এই কাজটা ডা. বুলুকে দেয়া হবে। কোনো ঠিকাদার এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেনি। রোজেন সম্পর্কে নিউজ করতে গিয়ে কথাগুলো লিখেছিলাম। একজন রির্পোার হিসেবে দায়িত্ব ছিল, ডা. বুলুর কাছে জানা আসলে তিনি ঠিকাদারী কাজ নিয়েছেন কি না? না কি রোজেন তার নাম ভাঙিয়ে কাজটা নিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হিলো নিষিদ্ধ ঘোষিত দল সমূহের নেতাকর্মীদের এতো সহজে মেলানো যায় না। অন্যকোনো রিপোর্ট করেছি বলে মনে করতে পারছি না।

একটা কথা জোর দিয়ে বলতে পারি, যদি কেউ অভিযোগ করেন, কারো দালালি করে, কারো পে বা বিশেষ কারণে সুবিধার কারণে নিউজ করি, দৃঢ়কণ্ঠে বলবো অভিযোগ সঠিক নয়। হ্যাঁ! অনভিজ্ঞতার কারণে ভুল হয়েছে, হতে পারে, যথেষ্ট তথ্যের অভাবে ভুল হতে পারে, লেখাপড়ার অভাবে ভুল হতে পারে এমন অভিযোগ দিলে  মাথা পেতে নেব, সমালোচনা করলে গ্রহণ করব।

বিশ্বাস করি পঁজিবাদে মুক্তি নেই, সমাজতন্ত্র মানি কিন্তু সশস্ত্র ধারায় আস্থা নেই। কারো সমালোচনা মানে বিরোধীতা নয়। খুনিকে ঘৃণা করি, ক্রসফায়ারের নামে হত্যাকে ও করি, আবার কমিউনিজমের নামে খুনকেও করি। মানুষকে পরিবর্তনের বদলে হত্যা কোনো সমাধান হতে পারে না, বরং এটাকে কা-পুরুষতাই মনে হয়। মানুষের ভেতরের পরিবর্তন যিনি আনতে পারেন, তিনিই প্রকৃত নেতা। কথায় কথায় মানুষকে দালাল বলা, মত্যুদণ্ড দেয়া তো মৌলবাদীদের ফতোয়া দেয়ার মত সস্তা কাজ। হত্যায় মানুষের বিনাশ হয় না, বরং কোনো কোনো হত্যা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে অনন্তকাল।

বন্ধু মিঠু চৌধুরী, স্নেহাস্পদ তরিকুলকে বলেছি, স্বীয় বিশ্বাসের প্রতি আমি অবিচল। যা বিশ্বাস করি অন্তরে বাহিরে সেটা সমান। সাহসের সঙ্গেই কোনো কিছু মোকাবেলা করার শক্তি আছে। মনোবল আছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা