kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ আষাঢ় ১৪২৭। ২ জুলাই ২০২০। ১০ জিলকদ  ১৪৪১

Reporterer Diary

রকি হুজুর হুংকার দিলেন 'টাকাটা নেন সাংবাদিক, না হলে গুলি করব'

লায়েকুজ্জামান   

২৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২০:২২ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



রকি হুজুর হুংকার দিলেন 'টাকাটা নেন সাংবাদিক, না হলে গুলি করব'

ঝিনাইদহ শহরে থেকে বেরুচ্ছি- বাইপাস সড়কে না এসে ঝিনাইদহ শহর প্রবেশের পুরানো সড়ক দিয়ে আসছি। বাইপাস সড়কের আরাবপুর মোড়ে চরমপন্থীদের বেশ কিছু ইনফরমার থাকে, ওরা অনেক সময় গতিবিধির খবর দেয়। সে কারণেই বাইপাস এড়িয়ে পুরানো সড়ক ধরেছিলাম। বিধিবাম। রাত তখন সাড়ে আটটা কিংবা নয়টা হবে। আধো আধো জোসনা। শহর থেকে বাইপাস সড়কে ওঠার কিছুটা আগে একটি ছোট্ট ব্রিজ আছে, অনেকটা কালভার্টের মত। কালভার্টের খুব কাছাকাছি আমরা।

হঠাৎ গাড়ির চালক আবুল চিৎকার করে উঠল, 'ভাই সর্বনাশ! দশ-এগারোটি মোটর সাইকেল দিয়ে রাস্তা আটকানো'। সরু রাস্তা। গাড়ী দ্রুত ঘুরিয়ে পেছনে নেয়ারও উপায় নেই। আবুল দাড়িঁয়ে পড়লো। বললাম, 'আগাও। দেখি কী হয়'। আবুল কাঁপছে। বলল, 'চালাতে পারছি না'। ধমক দিয়ে বললাম, 'মোটর সাইকেলের ওপর দিয়ে চালিয়ে দে'। মৃদু স্বরে জবাব দিল, 'সম্ভব না। অনেকগুলো মোটর সাইকেল, আবার অস্ত্রহাতে লোক দাড়াঁনো'। 

আমাদের কথোপকথনের মাঝেই সাত থেকে আটজন দ্রুত গাড়ির কাছে ছুটে আসল। আমি সমানের সিটে বসা ছিলাম। গ্লাস নামানো। ওরা এক যোগে এসে সাত-আটটি নানা পদের অস্ত্র কেউ মাথায়- কেউ বুকে ঠেকিয়ে ধরল। বলল, গাড়ী থেকে নামুন। দূরু-দূরু বুকে গাড়ী থেকে নামলাম। গাড়ী সেখানেই রইল। ওরা আমাকে নিয়ে একটু সামনে এগুলো। দেখি, কালভার্টে পা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন। গড়পড়তা গড়নের এক যুবক। প্যান্টের ওপর রঙ্গিন পাঞ্জাবি পরা। অস্ত্রধারীরা আমাকে নিয়ে তার কাছেই গেল। 

কাছাকাছি যেতে তিনি অস্ত্রধারীদের ধমক দিয়ে বললেন, 'এই, এই কি করছিস, সাংবাদিক সাবের বুকে অস্ত্র ধরেছিস ক্যান। সর -সর দূরে যা'। অস্ত্রধারীরা একটু দূরে গিয়ে দাড়াঁল। আমি কিছু বলার আগেই তিনি নিজের পরিচয় দিতে হাত বাড়িয়ে দিলেন, বললেন, আমি 'রকি হুজুর। নামটা নিশ্চয়ই শুনেছেন। আমাকে নিয়ে সত্য-মিথ্যে অনেক রিপোর্ট করেছেন'। নামটা শোনার পর যেন আন্তরাত্মা শুকিয়ে আসছিল। মুখ দিয়ে শব্দ বেরুচ্ছিল না। মূর্তির মত দাড়িঁয়ে আছি। 

রকি হুজুর সম্পর্কে বেশ ভালোই জানা আছে আমার। এক ভয়ঙ্কর খুনী, চরমপন্থী। এক সময়ে মাদ্রাসার ছাত্র ছিল বলে সবাই তাকে 'রকি হুজুর' বলে ডাকে। পুলিশের খাতায়ও তার নাম 'রকি হুজুর'। পূর্ব বাংলার কমিউনিষ্ট পাটি এমএ'র (জনযুদ্ধ) প্রতিষ্ঠাতা আবদুর রশিদ মালিথা ওরপে দাদা তপনের ভগ্নিপতি। তপনের পথ ধরেই চরমপন্থী লাইনে এসেছে রকি হুজুর। রকি হুজুর কীভাবে ভয়ঙ্কর চরমপন্থী হয়ে উঠল সে কাহিনীও একদিন তার কাছেই শুনেছিলাম।

মাদ্রাসার শিক্ষা শেষে যার হওয়ার কথা ছিল, মাদ্রাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমাম বা কোন পরহেজগার ব্যাক্তি- সেই কিনা এক সময়ে হয়ে উঠল চরমপন্থী, খুনী। কে তাকে চরমপন্থী বানাল? সে কথাও শুনিয়েছিল রকি। এ কথা ২০০১ সালের। এপ্রিল মাসের ১৯ তারিখ। ঝিনাইদহ গিয়েছিলাম রিপোর্ট করতে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে প্রতিমাসের বিভিন্ন সপ্তাহ ভাগ করে যেতাম রিপোর্ট করতে। সে সময়ে চরমপন্থীদের দাপাদাপিতে অতিষ্ঠ ছিল ওই জনপদ। ঝিনাইদহ শহরে একজনের কাছ থেকে কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে দেরি হয়ে যায় বলে ফিরতে রাত হয়। 

রকি হুজুর ঘাড়ে হাত দিয়ে বলে উঠলেন, 'আরে সাংবাদিক সাব, ভয় পেলেন নাকি। ভয়ের কিছু নেই। আপনাকে মারার জন্য আটকাইনি। একটু জুরুরী প্রয়োজনে কথা বলব, তাই আপনার অপক্ষায় দাড়িঁয়ে আছি। খবর পেলাম আপনি এ পথ দিয়েই ফরিদপুর যাচ্ছেন- তাই দাড়াঁলাম। আপনি তো সেই সকাল বেলা এসেছেন। অনেক ঘোরাঘুরি করেছেন। দুপুরে আপনার বন্ধু আওয়ামী লীগ নেতা কাজী মিলনের সঙ্গে বসে হোটেলে ভাত খেয়েছেন। ভাতটা আমি খাওয়াতে চেয়েছিলাম। তা মিলন ভাই জোর করে দামটা দিয়ে দিলেন। পরে এক প্যাকেট সিগারেট কিনে দিলা '।

বললাম, 'কই আপনাকে তো দেখলাম না'। উচ্চ স্বরে হেসে দিয়ে বললেন, 'মিলন ভাই ভাত খাওয়াননি'? বললাম 'হাঁ' । অস্ত্রধারী বলেন, 'শ্যামল রঙের নীল শার্ট পরা এক যুবক আপনাকে সিগারেট কিনে দেয়নি'? বললাম 'হ্যা দিয়েছে'। বলল 'ওকে আমিই পাঠিয়েছিলাম। আপনাকে আপ্যায়ন করতে'। এবার বুঝতে পারলাম রকি হুজুর কি ভাবে আমার এ পথ দিয়ে আসার খবর পেল।

সে সময়ে আরো ঘটনায় দেখেছি চরমপন্থী নেতারা গা ঢাকা দিয়ে লুকিয়ে থাকলেও শহরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে তার চর থাকে। তবে সংবাদিকদের মধ্যেই চরমপন্থীদের চর দেখেছি সবচে বেশি। এ ছাড়া তপন মালিথার তখন দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে একচেটিয়া প্রভাব, প্রাধান্য। তার দলেই অস্ত্রবাজ ক্যাডারের সংখ্যা বেশি। দাদা তপন নিজেও এক ভয়ঙ্কর মানুষ। রকি হুজুর তার বোনের জামাই সে কারণে তারও ব্যাপক প্রভাব। নামটা শুনলেই মানুষ ভয়ে কুঁকড়ে যায়। সেই রকি হুজুর আমার সামনে দাড়াঁনো।

তার হাতে পিস্তল, আবার আশপাশে প্রায় পনের-ষোল জন হবে, তাদের হাতেও নানা পদের অস্ত্র। রকি হুজুর যতই ভরসা দিক- আমার পায়ের কাঁপুনি থামছে না। দাদা তপনের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে,তার সঙ্গে কথা হয়। কুষ্টিয়ার চরমপন্থী নেতা গামা, আনোয়ার, মালেক, খুলনার ডুমুরিয়ার শৈলেন এদের সঙ্গে কিছুটা হলেও সখ্যতা রয়েছে। তাদের হাতে ধরা পড়লে বুঝিয়ে পার পাওয়ার সম্ভবনা আছে, তবে রকি হুজুরের সঙ্গে কোনো চেনা-পরিচয় নেই। তাই ভয়টা বেশি হচ্ছিল। এবারই প্রথম তার মখোমুখি। তার এজেন্ডাও জানি না।

ভয়ের আরকটি কারণ ছিল দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সাংবাদিকদের ভাগাভাগি। এদের অনেকেই নিজস্ব অর্থিক লাভের কারণে চরমপন্থীদের সহযোগী হিসেবে কাজ করে। আবার অনেক সময়ে সাংবাদিকদের সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়ে চরমপন্থীদের বিভ্রান্ত করে। যশোরের খ্যাতিমান সাংবাদিক শামসুর রহমান কেবলকে হত্যার নেপথ্যে চপরমপন্থীদের আত্মসমর্পণের বিষয়টি কাজ করলেও তাকে হত্যা করার ক্ষেত্রে চরমপন্থীদের উস্কানী ও ভুল তথ্য দিয়েছিল যশোরের ক'জন সাংবাদিক। ওই সব সাংবাদিকদের সঙ্গে শামসুর রহমান কেবলের পেশাগত বিরোধ ছিল।

ঝিনাইদহের একজন বয়স্ক সাংবাদিক একবার আমাকে একটি প্রতিবেদন করার অনুরোধ করেছিলেন। একজন চরমপন্থীকে নিয়ে। পরে খোঁজ নিয়ে দেখি ওই সাংবাদিকের তথ্য সঠিক ছিল না। রিপোর্টটি করলে নির্ঘাত বিপদে পড়তাম। রিপোর্টটি না করার কারণে ওই সাংবাদিক আমার ওপর বেশ ক্ষুদ্ধ ছিলেন। তার সঙ্গে চরমপন্থী একাধিক সংগঠনের যোগাযোগের কথাও চাউর ছিল ঝিনাইদহে। ভয়টা বেড়েছিল সে কারণে। রকি হুজুরের সামনে দাঁড়িয়েই মনে মনে নানা হিসাব কষছিলাম। 

ভয় ছাপিায়ে রকিকে নির্বিঘ্ন ভাব দেখাতে একটা সিগারেট ধরালাম। চরমপন্থীদের সম্পর্কে জানা আছে। ওদের যদি কোন সিন্ধান্ত থাকে সেটা কার্যকর করবেই। অনুনয়-বিনয় করে লাভ নেই। তবে রকি হুজুরকে নিয়ে সম্প্রতি কোন রিপোর্ট করেছি বলে মনে পড়ল না। তবে দাদা তপনকে নিয়ে করেছি গত সপ্তাহেই। আবার ভাবলাম নিউজ নিয়ে দাদা তপনের আপত্তি থাকলে সে নিজেই আমাকে বলত। এলোমেলো নানা ভাবনার মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসল। রকি  হুজুর প্রস্তাব করল একটা নিউজ করে দিতে। 

সে বেশ অনুরোধের স্বরে বলল, ‌'সাংবাদিক সাব একটা রিপোর্ট করে দিতে হবে'। বললাম, 'বলুন- কী রিপোর্ট করতে হবে?' এক অদ্ভূত রিপোর্ট করে দেয়ার দাবি তার। তার প্রস্তাব পত্রিকায় লিখে দিতে হবে, ওমুক তারিখে ঝিনাইদহের ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় প্রতিপক্ষের হামলায় রকি হুজুর নিহত হয়েছে। প্রতিপক্ষ তার লাশটিও গুম করে ফেলেছে। পরিবারের লোকেরাও লাশ খুঁজে পায়নি। একটা তারিখের কথাও বলে দিল। জানতে চাইলাম, ‌'এতে আপনার লাভ'? বলল 'লাভক্ষতি আমি দেখব। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই আপনি রিপোর্টটি করে দেবেন। দ্রুত তার হাত থেকে রেহাই পেতে রাজী হয়ে গেলাম। বললাম ঠিক আছে করে দেবো।

এবার এক গাল হাসি দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন। ‌‌'ঠিক আছে তা হলে আসি' বলে,গাড়ীর দিকে যাচ্ছি এ সময়ে রকি হুজুর হাতটা টেনে ধরে বলল, 'দাঁড়ান'। ঘুরে দাঁড়ালাম। এবার তিনি পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে বললেন, টাকাগুলো রাখেন। বললাম, 'না ভাই টাকা নেব না'। এবার তিনি জোরাজুরি শুরু করলেন। চরমপন্থীদের টাকা নেয়া খুবই বিপদজনক। এক দিকে ওদের কাছ থেকে টাকা নিলে ওদের সঙ্গে বাধা পড়তে হয়। অন্যদিকে চরমপন্থীরা কখনো ধরা পড়লে গোয়েন্দাদের কাছে বলে দেবে কোন কোন সাংবাদিককে ওরা টাকা দেয়।

মান-ইজ্জতের প্রশ্ন। এছাড়া পরবর্তী সময়ে নিউজ করার নৈতিক বল আর থাকে না। এভাবেই অনেক খ্যাতিমান সাংবাদিক ওদের ফাঁদে পড়ে হারিয়ে যান। প্রায় মিনিট বিশেক হবে সে টাকা দেয়ার চেষ্টা করছে আমি ফিরিয়ে দিচ্ছি। এরপর হঠাৎ করে রাগে গর্জে উঠল রকি হুজুর। পকেট থেকে পিস্তল বের করে সোজা আমার বুকের ওপর ঠেকিয়ে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে বলল, 'হয় টাকা নেবেন, না হলে গুলি করব।' দ্রুত বললাম ‌‌'ঠিক আছে দিন'। গাড়ীতে এসে গুনে দেখি ২০ হাজার টাকা।

খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। এক সপ্তাহ হলো রিপোর্ট করিনি। রকিও কোনো ফোন করেনি। দ্বিতীয় সপ্তাহ শেষ হওয়ার একদিন আগেই ফোন: ‌'সাংবাদিক সাব, রিপোর্ট কই'। এরপর ঘন ঘন ফোন। রাত নেই, দিন নেই কয়েক মিনিট পরপর ফোন। একবার ভাবলাম রিপোর্টটা করেই দিই। আবার ভাবলাম, আজ রিপোর্ট করলাম রকি হুজুর মারা গেছে, দেখা গেল আগামীকাল বা যেকোন দিন পুলিশের হাতে ধরা পড়লো বা সত্যিকারেই কারো হাতে মারা গেল। তখন কী হবে? মতি ভাই এত বিশ্বাস করেন, বিশ্বাসটা চিরদিনের জন্য হারাব। সাংবাদিকতার সুনামটাও নষ্ট হবে।

চিন্তা-ভাবনা করছি কীভাবে বাচাঁ যায়। সিন্ধান্ত নিলাম ঘটনাটা দাদা তপনকে জানাই। বিপদের কথাটা বলি। পরের দিনই ফোনে দাদা তাপনকে পেয়ে গেলাম। বিষয়টি তাকে জানালাম। টাকা দেয়ার কথাও বললাম। সাংবাদিকতার পেশার কথাও বললাম। সব শুনে বললেন, ঠিক আছে ও আর ফোন দেবে না, ফোন দিলেও নিউজের কথা বলবে না। এক সপ্তাহ রকি কোন ফোন দেয়নি। এক সপ্তাহ পর ফোন দিলে ভয়ে ভয়ে ধরলাম। না, নিউজের কথা কিছু বলল না। এর পর মাঝে মাঝে ফোন দিয়ে নিজের জীবনের নানা কাহিনী শোনাত। 

দাদা তপনের নিহত হওয়ার কিছু দিন আগেই র‌্যাবের সঙ্গে ক্রসফায়ারে নিহত হয় রকি হুজুর।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা