kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৫ আষাঢ় ১৪২৭। ৯ জুলাই ২০২০। ১৭ জিলকদ ১৪৪১

Reporterer Diary

পাঠানরা পেঁয়াজখোর

কাজী হাফিজ   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১৯:১৫ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পাঠানরা পেঁয়াজখোর

ছবি : লেখক

পেঁয়াজ নিয়ে দেশে চলমান হা-পিত্যেশে আমার বারবার পাঠান মুলুকের সেই কাবাবের দোকানের কথা মনে পড়ে। প্রায় ১৪ বছর আগের কথা। আমরা ফিরছিলাম পাকিস্তান- আফগান সীমান্তের কাছে খাইবার পাস সংলগ্ন সাগাই ফোর্ট থেকে। যাওয়ার কথা ছিল মিচিনি চেকপোস্টে। কিন্তু ওই ফোর্টের কাছেই খাইবার পাসে গাড়ি বহর থেমে গেল। 

জানানো হলো, সামনে দুই ট্রাইবের মধ্যে গোলাগুলি চলছে। সামনে আর যাওয়া যাবে না। গাড়ি বহর ইউটার্ন নিয়ে হাজির হলো প্রাচীন সাগাই ফোর্টে। আমাদের সফরসঙ্গীদের মধ্যে স্বদেশি এক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ক্যাপ্টেন থাকা অবস্থায় এই ফোর্টে কিছুদিন ছিলেন। পুরোনো কর্মস্থলের পৌঁছে তিনি খুশি হয়ে উঠলেন। ফিরে পেতে চাইলেন পেছনে ফেলে আসা দিনগুলিতে। তাঁর সেই চাওয়া থেকেই পেশওয়ার শহরে ফেরার পথের পাশে এক কাবাবখানাতে হাজির হওয়া। 

কাবাবখানার গল্পের আগে সাগাই ফোর্টটার কথা বলি। ১৯২৭ সালে বৃটিশ সেনারা খাইবার পাস পর্যবেক্ষণের জন্য এই ফোর্ট তৈরি করে। এটি খাইবার জেলা শহর জামরুদ থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে। সমূদ্র পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা সাড়ে আটশ’ মিটারের মত। এটি এখন খাইবার রাইফেলস্-এর হেড কোয়ার্টার।

ফোর্টে খাইবার রাইফেলস্-এর একজন অফিসারের সাথে কথা হলো। ২০/২১ বছর বয়স। পাকিস্তান আর্মির সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট। জানতে চাইলো আমাদের দেশের নোবেল বিজয়ী অ্যধাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুস ও তাঁর ক্ষুদ্র ঋণের কথা। 

ফোর্টে কতক্ষণ আমাদের থাকতে হবে, মিচিনি চেক পোস্টে যাওয়া হবে কি না- সে সম্পর্কে কেউ কোন নিশ্চয়তা দিতে পারছিলেন না। ফোর্টের ওপর থেকে চারপাশের ছবি তোলা, গিরি পথে হাাঁটাহটি- এসব করেই সময় কাটছিল। 

পাশের পাহাড়ের চূড়াই দেখলাম কয়েকজন শিশু আমাদের পর্যবেক্ষণ করছে। তাদেরও ছবি তুললাম। গিরি পথ ধরে হেঁটে আসছিলেন কয়েকজন। সালাম দিলাম। সালামের গম্ভীর জবাবও পেলাম। কিন্তু ওরা যখন আমাকে অতিক্রম করে যাচ্ছিল, তখন দেখি ওদের সবার পিঠে ভারি আগ্নেয়াস্ত্র। হয়তো একে ফোরটিসেভেন। কার কাছে যেন শুনেছিলাম এখানে অস্ত্রের বাজার আছে। গুলি বিক্রি হয় ঝুড়িতে করে দাঁড়ি পাল্লায় মেপে। 

প্রায় দেড় ঘণ্টা ফোর্টে থাকার পর আমাদের জানানো হলো, নিরাপত্তাগত সমস্যা আছে। মিচিনি চেকপোস্টে যাওয়া হবে না। পেশওয়ারে ফিরে যেতে হবে। 

তথাস্থ। উপায় যখন নেই তখন কী আর করা! তবে সফরসঙ্গী অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল প্রস্তাব দিলেন, পথে এক কবাব খনায় গাড়ি থামাতে হবে। বললেন, ‘আমি যখন এই ফোর্টে ছিলাম তখন প্রায় ওই কাবাবখানায়  যেতাম রসনা নিবৃত করতে। সেই স্বাদের কথা এখনও ভুলিনি।’ প্রস্তাব রক্ষা হলো। 

বলে রাখা ভালো, পাকিস্তানের অন্যান্য শহরের মধ্যে পেশওয়ারই সম্ভবত সব চেয়ে ধুলোময় অপরিচ্ছন্ন  শহর। শহরের বাইরে অবস্থা আরো শোচনীয়। রাস্তার পাশে মাঝে মাঝেই ময়লা ভরা কালো পলিথিনের ব্যাগের মত কিছু একটা পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছিল। গাড়ির গতি কমিয়ে কাছ থেকে দেখে জানা গেল ওগুলো ময়লার ব্যাগ নয়, বোরকা পরা নারী। এ ধরণের অস্বস্তিকর পরিবেশেই কাঙ্খিত কাবাব খানার দেখা মিললো। 

স্থানীয় এক ফার্নিচার দোকানি বিক্রির অপেক্ষায় রাখা এবং বার্নিশের টাটকা গন্ধমাখা গদিহীন শোফায় বসতে দিলেন আমাদের। পাশেই কাবাবখানার একদিকে মাংস কাটা হচ্ছে, আরেক দিকে চুরানো হচ্ছে পেঁয়াজ। যতটা মাংস, তার চার পাঁচগুণ বেশি পেঁয়াজ। 

এতো পেঁয়াজ একসাথে কাটতে দেখিনি কখনো। কাটা হচ্ছে মাংস কাটা বিশাল আকারের চাপাতি বা ডাঁসা দিয়ে । একপাশে কাঠের আগুনের বিশাল চুল্লিতে  তৈরি হচ্ছে কবাব। সেই দিন আমার মনে হয়েছিল, পাঠানরা পেঁয়াজখোর। আমাদেরও পেঁয়াজ খাওয়ার কিঞ্চিৎ দোষ আছে, কিন্তু পাঠানদের মতো অতোটা না। 

তবে সম্প্রতি পেঁয়াজ নিয়ে হা-পিত্যেশে সে দিনের সেই উপলব্ধি পাল্টে দিচ্ছে।

লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি ও চিফ রিপোর্টার, কালের কণ্ঠ 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা