kalerkantho

সোমবার । ২০ জানুয়ারি ২০২০। ৬ মাঘ ১৪২৬। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

Reporterer Diary

হঠাৎ নারী কণ্ঠের গর্জন ‘ক্যামেরা ক্লিক করলেই গুলি’!

লায়েকুজ্জামান   

৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১৮:৩২ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



হঠাৎ নারী কণ্ঠের গর্জন ‘ক্যামেরা ক্লিক করলেই গুলি’!

প্রতীকী ছবি

হঠাৎ ভড়কে গেলাম এক নারী কণ্ঠের গর্জনে। নৌকার সব যাত্রীও তার দিকে তাকিয়ে। নৌকার দিকে তাক করা স্টেনগান। চিৎকার করে নারীটি বলছেন- ক্যামেরা ক্লিক করলেই গুলি। খেয়া নৌকাটি তখনো পাড়ে ভিড়েনি, ছুঁই ছুঁই করছে। দাড়িঁয়ে তীরে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আমি। ঘাড়ে ব্যাগ, হাতে ছোট একটি ক্যামেরা। নৌকা ভিড়লো। আমি দাড়িঁয়েই রইলাম। আমরা পাশ দিয়ে অন্যরা নেমে গেল। ক্যামেরাটা ব্যাগে ঢুকিয়ে মাটিতে পা রাখলাম। এগিয়ে এলেন নারী। হাতে তখনো তাক করা স্টেনগান। অদুরে একটি রিক্সাভ্যান দাড়াঁনো। ধমকের সুরে বললেন, ‘ভ্যানে গিয়ে বসুন’। পেছনে তাকিয়ে দেখি, সোর্স উধাও। ভাবলাম বোকামি করে ফেলেছি। বিপদ নিশ্চিত। তবুও সাহস নিয়ে ভ্যানে উঠলাম।

২০১০ সাল। তারিখটা ১৮ নভেম্বর। পাবনার ঢালার চরে তখন চরমপন্থীদের অভয়রাণ্য। পুরো চর পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি (আনোয়ার করিব) গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। চর দেখভাল করেন রাজবাড়ি সদরের পাচুরিয়া এলাকার সামাদ মেম্বার। দীর্ঘদিন ধরে খুব ইচ্ছে ছিলো ঢালার চরে গিয়ে একটি রিপোর্ট করবো। তাই অনেক চেষ্টা করে সোর্স যোগাড় করি।

হাসেম নামের ওই সোর্সের সঙ্গে পরিচয় রাজবাড়ি শহরে বসে। রাজবাড়ি শহর থেকে মুদি দোকানের মালামাল কিনে ঢালার চরে  বিক্রি করেন হাসেম। রাজবাড়ি জেলা ও পাবনা জেলার মাঝে পদ্মায় জেগে ওঠা চর এটি। তবে চরটি পড়েছে পাবনার সুজানগর উপজেলার ভেতরে।

ভ্যান চলছে চরের মেঠো সড়ক ধরে। চুপচাপ বসে আছি। আমার সঙ্গে দুই যুবক। দু’পাশে বসা। ভ্যানে বসে থাকলেও চোখে ভাসছে খেয়াঘাটে দেখা সেই নারীর অবয়ব।

সুঠাম দেহ। ঠিক যেন অনেক আগে দেখা  টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে প্রকাশিত এক তামিল নারী গেরিলা। পরনে সনা কায়দায় জলপাই রং-এর প্যান্ট। শার্টের ওপর চওড়া বেল্ট। মাথায় ক্যাপ। হাতে ধরা ষ্টেনগান। পেছনে ওয়ারলেস সেট শরীরে বাধা। পায়ে বুটজুতা। আমাকে ভ্যানে বসার নির্দেশ দিয়ে তার পাশে থাকা দুই যুবককে ইশারা দিয়েছিলেন ভ্যানে উঠতে। তারা এসে সেই যে বসলো, কোন কথা বলছে না। চালক তার মত করে ভ্যান চালিয়ে যাচ্ছে। দুপুর হয়ে গেছে। নভেম্বর মাস হলেও ঝলসানো রোদ চর জুড়ে।

আধা ঘণ্টা খানেক হবে। ভ্যান গিয়ে থামলো একটি বাড়ির উঠানে। চৌচালা একটি টিনের ঘর। বাড়ির সামনে কয়েকটি বাবলা গাছে। পেছনে বেশ কিছু কলা গাছের ঝোপ। বাড়ির সামনে বাবলা গাছের নীচে বাশেঁর একটি বেঞ্চ বসানো। ভ্যানটা সেখানেই থামলো। সঙ্গের দু’যুবকের একজন অনুচ্চস্বরে বাশেঁর বেঞ্চ দেখিয়ে বসতে বলে ঘরের ভেতর চলে গেল। অন্যজন আমার পাশেই দাড়িঁয়ে। গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। তাকে বললাম এক গ্লাস পানি দেবেন। ভ্যান চালক একটি টিনের গ্লাস ধুয়ে টিউবয়েল থেকে পানি নিয়ে আসলো। এক গ্লাস সাবাড় করে, আরেক গ্লাস চাইলাম। এনে দিলেন।

ভয় হয়, আবার হয় না। চরমপন্থীদের নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করি রিপোর্ট করি। এমন অবস্থার মুখামুখি আগেও হয়েছি। চূড়ান্ত বিপদ হয়নি। সেটা স্মরণ করে মনে সাহস যোগাই। পানি পান শেষ করে বাবলা গাছে পিঠ ঠেকিয়ে বসলাম। মিনিট কয়েক পর ঘরের ভিতরে যাওয়া যুবক ফিরে এসে বললেন, চলুন খাওয়ার সময় হয়ে গেছে, হাত মুখ ধুয়ে নিন। লিডার খেতে ডাকছেন আপনাকে।

চৌচালা টিনের ঘরটিতে এক কোনায় একটি কাঠের চৌকি। বাকি ঘর জুড়ে খেজুরের পার্টির বিছানা। ঘরে ঢুকে দেখি পনের কুড়িজন, কেউ বসে কেউ শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। চৌকির ওপরে দেশি বন্দুক থেকে পিস্তল স্টেনগান সাজিয়ে রাখা। খাবার দেয়া হয়েছে, সবাই এক সঙ্গে বসেছে। খাসির মাংস। রুই মাছ। ছোট মাছ। বড় আকারের সিলভারের ডিশে ভাত। আরেকটি বড় পাতিলে ডাল। যখন খেতে বসেছি, খেয়াল করলাম বেশ কিছু যুবক বাড়ির সামনে টহলের মত করে পাহারা দিচ্ছে। আমাদের খাওয়া শেষে আরো এক ডিশ ভাত, তরকারি ডাল আনা হলো। বুঝলাম আরেক রাউন্ড খাওয়া হবে, এখানে অন্যরা খাবে। খাওয়া শেষে লিডার এবং আমি রইলাম ঘরের ভেতর। ওই পনের-কুড়িজন বেরিয়ে গেলেন। কেউ কেউ অস্ত্র নিলেন সঙ্গে। 

ছোটখাটো, হালকা পাতলা। শ্যামল বর্ণের লোকটিই রাজবাড়ির দুর্ধর্ষ সর্বহারা সামাদ মেম্বার। হাত মিলিয়ে নিজের পরিচয় দিলেন। আমরা পরিচয় দিতে গেলে থামিয়ে বললেন, আপনার সবজানি, চিনিও আপনাকে। তা এত কষ্ট করে এমন দুর্ধর্ষ এলাকায় আসার কারণ কি? আপনি বললে তো আমি ফরিদপুরে গিয়ে কথা বলে আসতাম। 

আসলে সোর্সের সঙ্গে কথা ছিলো অন্যরকম। তিনি কথা দিয়েছিলেন অতিথি হিসেবে তার বাড়ি বেড়াতে যাবো, তিনি ঢালার চর ঘুরে দেখাবেন। স্বচক্ষে চরমপন্থী অস্ত্রবাজদের দেখে আসবো গোপনে। এসে রিপোর্ট করবো। সে কথা আর বললাম না। জবাব দিলাম আসলে জায়গাটা দেখার খুব ইচ্ছে জাগলো। মনে করলাম আপনার কীভাবে দিন কাটান, জীবনযাপন করেন তা নিজে দেখে আসি। সে কারণে আসা।

সামাদ মেম্বার মৃদু হাসলেন। বললেন, তা হলে দেখে যান আমরা কীভাবে দিন কাটাই। আপনারা তো দূরে বসে অনেক কিছু মনগড়া লিখেন। আমাদের বিলাসী জীবনের কথা লিখেন, টাকা পয়সার কথা লিখেন। এবার নিজে দেখে যান কী বিলাসী জীবনে আমরা থাকি। বলে চলছেন সামাদ মেম্বার। কান পেতে শুনছি। 'শুনুন আমরা সমাজ বদলের একটি লড়াই করছি, তা কখনো লিখলেন না। আমরা শুধু খুন-খারাবি করি সেটাই আপনার লিখেন।' তারপর হেসে দিয়ে বললেন, ভাই কিছু মনে করবেন না। কিছু বেদনার কথা বললাম আর কি। 

আমরা ঘরে থাকতেই প্রবেশ করলো সেই নারী। খেয়াঘাটে যার গর্জনে ভড়কে গিয়েছিলাম। সামাদ মেম্বার পরিচয় করিয়ে দিলেন, সর্বহারা পার্টির নেত্রী, সামরিক শাখা দেখাশোনা করেন। তিনি খেতে বসলেন। এর মধ্যে ঘরে ঢুকলেন আরো পনের কুড়িজন। তাদের মধ্যে চার-পাচঁজনকে চেনাচেনা মনে হচ্ছে। তবে নিশ্চিত করতে পারছি না। আগে কোথায় দেখেছি। হঠাৎ মনে পড়লো এদের সঙ্গে তো এক সাথে খেয়া নৌকায় সুজানগর থেকে এসেছি। সোর্সের উধাও হয়ে যাওয়া, খেয়া থেকে নামার সময়ে একমাত্র আমাকে ভ্যানে তুলে দেয়া, অন্যদের নির্বিঘ্নে চলে যাওয়া- মনে মনে হিসাব মিলিয়ে নিলাম। বুঝলাম সামাদ মেম্বারের লোকদের খপ্পরে পড়েই আমাকে ঢালার চরে আসতে হয়েছে।

সোর্সকে পেলাম একেবারে বিদায় বেলায়। সামাদ মেম্বার পরিচয় করিয়ে দিলেন, বললেন ও আমাদের লোক। পার্টি ক্যাডার। শহরে কাজ করে। ও আপনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে। দেখবেন ওর যেন কোন বিপদ না হয়। বুঝলাম সামাদ মেম্বারের শেষ কথা গুলো আসলে হুমকি। কথাগুলোর মানে হলো আমি যেন তার বিষয়ে পুলিশকে কিছু না বলি। সোর্স হাসেম ধরা পড়লে দায় পড়বে আমার ওপর। এটা চিন্তার বিষয় হয়ে দাড়াঁলো। কেউ পার্টি ক্যাডারদের ধরিয়ে দিলে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে পার্টি। আন্ডার গ্রাউন্ড পার্টিগুলোর এটাই নিয়ম।

সামাদ মেম্বার ২০১১ সালের শেষ দিকে ক্রসফায়ারে নিহত হন। তার আগ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ ছিলো আমার। সে সময় যোগাযোগ ছিলো সোর্সের সঙ্গেও। সামাদ মেম্বার নিহত হওয়ার পর সেই সোর্সকে আর খুঁজে পাইনি। আর দেখা হয়নি সেই নারী চরমপন্থীর সঙ্গেও। ঢালার চরে ওই চরমপন্থীদের হাতে চার পুলিশ সদস্য খুন হয়েছিল। তারপর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে ঢালার চর ছাড়তে হয় চরমপন্থী পূর্ব বাংলার সর্বহারা পাটির। তবে মাস কয়েক আগে জুলমত নাম-পরিচয় দিয়ে দৌলতদিয়া ঘাটে এক মধ্যবয়েসী লোক এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, তাঁর সঙ্গে নাকি ঢালার চরে আমার পরিচয় হয়েছিলো সামাদ মেম্বারের আস্তানায়। তবে আমি তাঁকে চিনতে পারিনি। ব্যস্ততার কারণে তাঁর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কেও জানা হয়নি।

 

লেখক : জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, কালের কণ্ঠ  

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা