kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

Reporterer Diary

আইভরি কোস্ট বিজয়ী বাংলাদেশির খোঁজে

কাজী হাফিজ    

৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ২০:৪৬ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



আইভরি কোস্ট বিজয়ী বাংলাদেশির খোঁজে

মনিরুজ্জামান মনির (২০০৫ সালের ছবি)

একযুগ আগের ঘটনা। ২০০৫ সালের ৩ আগস্ট বাংলাদেশের গণমাধ্যম দলের সদস্য হিসেবে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ আইভরি কোস্ট পৌঁছানোর পর থেকেই প্রায় অসম্ভব একটি বিষয় নিয়ে ভাবতে থাকি। সে ভাবনার কথা সেখানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত স্বদেশী সেনা কর্মকর্তাদেরও জানানো হয়। তাদের বলা হয়, আপনারা কি এমন কোনো বাংলাদেশির সন্ধান পেয়েছেন—যার এই দেশটিতে দীর্ঘদিনের বসবাস? ভাগ্যান্বেষণে এসে এ দেশে স্থায়ী হয়েছেন? এ প্রশ্নের ইতিবাচক জবাব পেয়ে আমরা আগ্রহী হয়ে উঠি। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সেক্টর হেড কোয়ার্টার ডালোয়াতে অবস্থানরত সেনা কর্মকর্তা কর্নেল বাকের ও তার সহকর্মীরা জানালেন, বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি আইভরি কোস্টে বসবাস করছেন। চেষ্টা করলে তাদের দেখা মিলতে পারে। সম্ভবত রাজধানী আবিদজানে একটি লেবানিজ কারখানায় কয়েকজন কাজ করছেন। 

এ ধরনের তথ্য জেনে সিদ্ধান্ত নিই, আবিদজানে পৌঁছানোর পর অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে ওইসব প্রবাসী স্বদেশীদের। কীভাবে, কোন পথে ১৫ হাজার কিলোমিটার দূরের এই দেশে তারা পৌঁছালেন, কীভাবে কাটে তাদের প্রবাস জীবন, বাংলাদেশিদের জন্য এখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ কেমন—এসব জানতে হবে। ডালোয়া থেকে যেসব সেনা কর্মকর্তাদের আমাদের সঙ্গে আবিদজানে যাওয়ার কথা তাদের অনুরোধ করি, যেভাবেই হোক আপনাদের নির্ধারিত কর্মসূচির বাইরে এর জন্য একটু সময় বের করতেই হবে। 

সফর সঙ্গীদের মধ্যে সে সময়ের নয়া দিগন্তের প্রধান প্রতিবেদক মাসুমুর রহমান খলিলী, চ্যানেল আইয়ের প্রতিবেদক মাহাবুব মতিন (প্রয়াত), বিটিভি’র প্রযোজক (নিউজ) ফারুক আহমেদ ও ক্যামেরাম্যান আবু ইউসুফ মজুমদার বিষয়টি সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। 

আমরা তখনো ভাবিনি, আবিদজানে পৌঁছে লেবানিজ কারখানায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের নয়, পেয়ে যাব আইভরি কোস্ট বিজয়ী বিস্ময়কর এক বাংলাদেশি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানকে। ভাবতে পারিনি আফ্রিকার প্যারিস হিসেবে খ্যাত জৌলুসপূর্ণ ওই নগরীতে দেখা মিলবে সেখানকার এক অভিজাত এলাকায় বসবাসকারী স্বদেশের এক তরুণ কবি কাজী জহিরুল ইসলামের সঙ্গে। 

আইভরি কোস্টের আবিদজানে কাজী জহির এবং সহযাত্রী সাংবাদিকদের সাথে লেখক। 

একসময় সংবাদপত্রে কাজ করার সুবাদে কাজী জহির ঢাকার সাংবাদিক মহলে কিছুটা পরিচিত। প্রখ্যাত কবি আল মাহমুদও তার কবিতার প্রশংসা করে লিখেছেন। তবে কবি হিসেবে নন, ওই তরুণ আইভরি কোস্টে জাতিসংঘের শন্তিরক্ষা মিশন ‘ওনুসি’তে (ONUCI) কাজ করছিলেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকর্তা হিসেবে। আবিদজানে কাজী জহিরের সঙ্গে দেখা না হলে সে দেশে এক বাংলাদেশির সাফল্য কাহিনী হয়তো আমাদের অজানাই থেকে যেত। 

ডালোয়া থেকে রওয়ানা হয়ে বিদ্রোহী বাহিনী ‘ফোর্স নোভেল’ নিয়ন্ত্রিত মান, দানানি, ডুয়োকুয়ো, লগুয়ালে, জুয়োনালা, সরকারী বাহিনী  নিয়ন্ত্রিত গিগলু—এসব এলাকায় বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীদের প্রশংসিত কার্যক্রম সরেজমিন প্রত্যক্ষ করার পর ৮ আগস্ট আমরা আবারো সেখানে ফিরে আসি। এরপর ৯ আগস্ট ডালোয়া থেকে জাতিসংঘের একটি এমআই-৮ হেলিকপ্টারে রওয়ানা হই আবিদজানের উদ্দেশ্যে। পথে যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে আবিদজান থেকে ৮৬ কিলোমিটার দূরের এক প্রত্যন্ত এলাকায় জরুরি অবতরণ, আরেকটি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আমাদের উদ্ধার—এসব কথা আগেই লিখেছি। 

আবিদজানে পৌঁছানোর পরদিনই মিশন হেড কোয়ার্টারে দেখা হয় কাজী জহিরের সঙ্গে। হোটেল সেব্রেকো’র পাশে বাংলাদেশি শন্তিরক্ষীদের সাপোর্ট কোম্পানির যে ক্যাম্পে আমরা অবস্থান করছিলাম সেখানেও দেখা করতে আসেন তিনি। ওদিকে আবিদজানে পৌঁছে সেখানে বসবাসকারী স্বদেশীদের যে খোঁজখবর নেয়ার অবকাশ জোটে না। নির্ধারিত কর্মসূচির বাইরে সময়ও দিতে পারেন না সেনা কর্মর্তারা। সে সুযোগও তাদের ছিল না। নিজেদের নির্ধারিত কাজের অবকাশে মেহমানদারি, মেহমানদের বিভিন্নমুখী চাহিদা পূরণ—এ সবে এমনিতেই অতিব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছিল তাদের। 
আবিদজানে গণমাধ্যম দলটির গাইড হিসেবে মূলত কাজ করছিলেন ক্যাপ্টেন মাহমুদ (ডন)। ব্যান-সাপোর্ট কোম্পানির কমান্ডার লে. কর্নেল আতিকুর রহমানের অধীনে মিশনের ফোর্স হেড কোয়ার্টারের নিরাপত্তায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। আবিদজানে কোথায় আইভরির অলংকার পাওয়া যায়, কোথায় সুলভমূল্যে পাওয়া যাবে বিখ্যাত এবনি বা আবলুশ কাঠের শোপিস, কোন মার্কেটে সস্তায় ফ্রান্সের পারফিউম মিলবে, কম দামের চাইনিজ কেডস কোথায় পাওয়া যাবে—এসব কিনতে কীভাবে দরাদরি করতে হবে সবই তার জানা। এসব বিষয়ে সময় দিতে গিয়ে ক্যাপ্টেন মাহমুদও সেখানে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের কোনো সন্ধান দিতে বা তাদের খুঁজে বের করতে সময় দিতে পারলেন না। অবশ্য এরই মধ্যে সেনা কর্মকর্তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে আমাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন। হোটেল পারগোলাতে বৈঠক হয় মিশনের ফোর্স কমান্ডার সেনেগালের লে. জেনারেল আবদুল্লায়ী ফলের সঙ্গে। কোকোডিতে মিশন হেড কোয়ার্টারে বৈঠক হয় মিশনের প্রধান সুইডেনের পিয়েরে শোরি’র সঙ্গে। 

আইভরি কোস্টের মান-এ সে সময়ের বিদ্রোহী বাহিনী ফোর্স নুবেল-দের সাথে। 

এছাড়া মিশনের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা আমেরিকার লুবার্ট এইচ প্রাইসসহ তথ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও সেখানকার পরিস্থিতি ও পরিস্থিতি নিয়ল্প্পণে বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীদের প্রধান ভূমিকার কথাও প্রশংসার সঙ্গে আলোচনা হয়। এর আগে উত্তর-পশ্চিমের শহর মান ও দানানিতে গণমাধ্যম দলের সঙ্গে বৈঠক হয় বিদ্রোহী বাহিনীর কমান্ডারদের সঙ্গে। তাদের কাছে শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে হস্তান্তর করা হয় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছার নিদর্শন। বাকি ছিল সরকারের সামরিক বাহিনী ফেনসি (FANCI))-র অধিনায়কদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়। আবিদজানে অবস্থানকালে সে কাজটিও সারা হয়। ১১ আগস্ট ফেনসি হেড কোয়ার্টারে তার দফতরে উপস্থিত ছিলেন না সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল ফিলিপ মাঙ্গু। বাংলাদেশের গণমাধ্যম দলটিকে সেখানে অভ্যার্থনা জানান সেনাপ্রধানের ডেপুটি লে. কর্নেল গোহো। তার মাধ্যমে জেনারেল মাঙ্গুকে বাংলাদেশের রিকশার একটি মডেল উপহার দেয়া হলে ভীষণ খুশি হয়ে ওঠেন ফেনসির কর্মকর্তারা। তারা বলেন, বাংলাদেশ ইউএন-এর ছত্রছায়ায় আমাদের জনগণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। একদিন জাতিসংঘের ওই ছাতাটি থাকবে না। কিন্তু বাংলাদেশের সেনা সদস্যদের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব থেকে যাবে। লে. কর্নেল গোহো এ কথাও বলেন, বাংলাদেশি সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে আমার কয়েকজন কোর্স মেট রয়েছেন। লে. কর্নেল রাজ্জাক তাদেরই একজন। 

সাংবাদিক হিসেবে এসব ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারাকে প্রাপ্তিই বলতে হবে। এছাড়া আবিদজানে ফোর্স হেড কোয়ার্টারের চিফ অব স্টাফ কর্নেল রেজাউর রহমান ব্যান-সিগন্যাল কোম্পানির কমান্ডার লে. কর্নেল মোঃ আবদুল খালেক, চিফ কমিউনিকেশন অফিসার লে. কর্নেল গোলাম মাওলা এবং ডালোয়াতে ব্যান-মেডিক্যালের কমান্ডার কর্নেল জাহাঙ্গীর ও ব্যান-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওসি (অফিসার কমান্ডিং) লে. কর্নেল শরীফসহ অন্যান্য সেনা কর্মকর্তার কাছে তাদের কার্যক্রম এবং আইভরি কোস্টবাসীর জীবনযাত্রা সম্পর্কে যেসব তথ্য পাওয়া যায় তাও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি শান্তিরক্ষা মিশনের সার্বিক বিষয় সম্পর্কে আমাদের প্রায় সার্বক্ষণিক সঙ্গী বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বাহিনীর সেক্টর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জহুরুল আলম ও কর্নেল ইমামের সুচিন্তিত বিশ্লেষণ তো ছিলই। অতএব আমরাও প্রায় ভুলতে বসি আইভরি কোস্টে দীর্ঘদিন বসবাসকারী একজন বাংলাদেশিকে খুঁজে বের করার কথা। 

কিন্তু আবিদজান ছেড়ে চলে আসার আগের রাতের ডিনারের সময় হঠাৎ টেলিফোন আসে ডালোয়া থেকে। একজন সেনা কর্মকর্তা তার মোবাইল ফোনটি আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে বলেন, কর্নেল বাকের আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। কথা হয়। বাকের জানান, মনিরুজ্জামান নামে একজন বাংলাদেশির সন্ধান পাওয়া গেছে। তিনি আবিদজান থেকে প্রায় সাড়ে ৪শ’ কিলোমিটার দূরে বুয়াক শহরের কাছে দীর্ঘদিন ধরে সপরিবারে বসবাস করছেন। তার মোবাইল ফোনের নম্বরটি পাওয়া গেছে। 

তাহলে? যোগাযোগ সূত্রটি পেয়েও হাল ছেড়ে দিতে হয়। ব্যান-সাপোর্ট ক্যাম্পে কারো মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে ইচ্ছা হয় না। আর কত? যথেষ্ঠ ধকল সহ্য করতে হচ্ছে ওদের। 

পরদিন সকালের কর্মসূচি বিনোদনের। গ্রান্ড বাসামের সমুদ্র সৈকত দর্শন। সারাদিন সেখানেই থাকা এবং খাওয়া-দাওয়া। রওয়ানা হওয়ার কিছুক্ষণ আগে দেখা করতে গাড়ি হাঁকিয়ে এলেন কাজী জহির। তার হাতে মোবাইল ফোন। আমাদের জন্য নিশ্চয় তার কিছু করার আছে?  প্রস্তাব দিতেই রাজি হন জহির। কথা হয় মনিরের সঙ্গে। জানা যায়, তার বাড়ি বরগুনা জেলার বেতাগি উপজেলার হোসনাবাদে। বুয়াকের কাছে কাফিওয়ালা শহরে কানাডার এক ব্যবসায়ীর সহযোগিতায় ‘ট্যানটোস’ নামের একটি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেখানে একিস (ACKEES) নামের একটি বিশেষ ফল বিশেষ প্রক্রিয়াতে টিনজাত করে বিদেশে রফতানি করেন তিনি। ১০০ হেক্টর জমির ওপর একিস ফলের একটি বাগানও গড়ে তুলেছেন। প্রায় ১০ বছর ধরে এ ব্যবসায় তিনি আইভরি কোস্টে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সংক্ষিপ্ত এসব তথ্য জানানোর পর তিনি বলেন, আমি এ মুহুর্তে চিকিত্সার জন্য আবিদজানেই রয়েছি। আপনার সঙ্গে কি আমাদের দেখা হতে পারে? অবশ্যই পারে। সানন্দে রাজি হয়ে যান মনির। বলেন, আমি এখন হাসপাতালে। বিকেলে দেখা হতে পারে। 

একিজ ফল।

এ অবস্থায় সমুদ্র সৈকতের কর্মসূচি থেকে মাসুমুর রহমান খলিলী, মাহাবুব মতিন ও আমার নাম প্রত্যাহার করে নিই। জহিরের গাড়িতে আমরা বেরিয়ে পড়ি শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেখে বিকেল পর্যন্ত সময় কাটানোর জন্য। কূটনৈতিক জোন হিসেবে পরিচিত রিবেরা এলাকায় জহিরের বাসাতেও তার কবিতা আবৃত্তি শুনে কিছুটা সময় কাটে। স্থানীয় সময় বেলা ৩টার দিকে মনিরের টেলিফোন আসে। পরিকল্পনাা হয়, পাশের রিবেরা মসজিদের গেটে ১৫ মিনিটের মধ্যে তার ভাগ্নে নাসিরুদ্দিন এসে পৌঁছবেন। তারপর আমাদের নিয়ে যাবেন। ওই পরিকল্পনাা মতই আমরা পৌঁছে যাই শহরের প্রায় কেন্দ্রস্থলের একটি বাসায়। বাসাটির ভাড়াটে মনিরের এক ভারতীয় বন্ধু। ওই বাসাতেই স্বদেশী সাংবাদিকদের সামনে আবেগাপ্লুত মনির শুরু করেন তার আইভরি কোস্ট বিজয়ের সেই দুঃসাহসিক কাহিনী। 

মনির সেদিন জানান, দীর্ঘদিন  অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ওই ফল কানাডা, ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ আরো অনেক দেশে রফতানির মাধ্যমে নিজের ফার্মটিকে লাভজনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। ছোট ভাই, স্ত্রী, একমাত্র কন্যা ও ভাগ্নেকে নিয়ে এক অপরিচিত জনগোষ্ঠীর মাঝে মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করছেন তিনি। তার ফার্মে কর্মসংস্থাান হয়েছে ৩২৫ জন স্থানীয় বাসিন্দার। এর ফলে দেশটিতে বিদেশিদের জন্য যে নিরাপত্তা সংকট বহাল রয়েছে, তা থেকে বাংলাদেশী ওই ব্যবসায়ী পরিবারটি পুরোপুরি মুক্ত।

জানা যায়, ওই সময় আইভরি কোস্টে মনিরুজ্জামান মনিরের পরিবারটি ছাড়াও আরো দু’জন বাংলাদেশি দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছিলেন। তাঁরা  কাজ করছিলেন আইভরি কোস্টের বাণিজ্যিক রাজধানী আবিদজানের একটি লেবানিজ ফার্মে।
মনিরুজ্জামান আইভরি কোস্টে যে ফল নিয়ে ব্যবসা করছেন, সেই একিজ ফলের ব্যবহার সম্পর্কে স্থানীয়রা অবগত ছিলেন না। বুনো ফল হিসেবে বনেই ঝরে পড়ে নষ্ট হয়ে যেত। ফলটি দেখতে অনেকটা ডালিমের মতো। পোক্ত হলে ফেটে যায়। ভেতরে কাঁঠালের মতো কোয়া। টকসিনযুক্ত বিচি ফেলে দিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোতে সবজি হিসেবে ওই কোয়া ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়ে থাকে। ফলটির মূল উত্পাদনকারী দেশ জ্যামাইকা। তবে জ্যামাইকার চাষীরা জানেন পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ওই ফল এনে তাদের দেশে বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ শুরু হয়। ওই তথ্য জেনেই মনিরুজ্জামান মনির কানাডার এক ব্যবসায়ীর পরামর্শে আইভরি কোস্টের জঙ্গলে জঙ্গলে একিজ ফলের অনুসন্ধান শুরু করেন। এক সময় রাজধানী আবিদজান থেকে প্রায় সাড়ে ৪০০ কিলোমিটার দূরে বুয়াকের কাফিওলা শহর ও শহরের আশপাশের পাহাড়ি জঙ্গল এলাকায় ওই ফলের সন্ধান পান। তিনি লক্ষ্য করেন জ্যামাইকার একিজের চেয়ে আইভরি কোস্টর একিজ অনেক বেশি উন্নত মানের। এরপর সেখানে এক একর বাড়ির ওপর একটি দোতলা বাড়ি দীর্ঘমেয়াদে লিজ নেন তিনি। ১৯৯৬ সালের মার্চে ওই ফল প্রক্রিয়াজাত করার জন্য ফ্রুটক্যান তৈরির মেশিন আমদানি করেন। তাকে এ বিষয়ে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেন কানাডার ওই ব্যবসায়ী। ১৯৯৬ সালেই ফার্মটি চালু হয়ে যায় স্থানীয় মেয়র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে। 

মনিরুজ্জামানের বক্তব্য ছিল, ‘প্রথমে স্থানীয় লোক নিয়োগ করে পাহাড়-জঙ্গল থেকে ওই ফল বস্তাভর্তি করে এমনিতেই নিয়ে আসা যেত। কিন্তু পরে ফলটির চাহিদা বুঝতে পেরে এখন স্থানীয়রা বস্তাপ্রতি বাংলাদেশি ৫০/৬০ টাকার সমপরিমাণ সিফা (স্থানীয় মুদ্রা) নিতে শুরু করেছে। ওদিকে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ১০০ হেক্টর জমি দীর্ঘমেয়াদে লিজ নিয়ে আমিও একিজের বাগান শুরু করি ২০০০ সালের দিকে। বর্তমানে আমার ওই বাগানে ফল ধরতে শুরু করেছে। ফল রফতানিও শুরু হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে ৯ কন্টেইনার ফল রফতানি হয়েছে। প্রতি কন্টেইনারে থাকছে ২৬ হাজার ৪০০ ক্যান একিজ। বিক্রি হচ্ছে প্রতি ক্যান ১ ডলার ৮০ সেন্টে। বছরে  তিন বার ওই ফল ধরে এবং তিন বার ফল সংগ্রহ করে তা রফতানি করা হয়।’ 

মনিরুজ্জামান আরো বলেন, ‘ওই ফলের ব্যাপক চাহিদা এবং আইভরি কোস্টে ফলটির ব্যবসায় এখন পর্যন্ত আমি অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকার কারণে আমার ফার্মটি আরো বড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া বাগানের একিজ গাছগুলো যত বড় হবে, তত উত্পাদনও বাড়বে। বর্তমানে বছরে আয় প্রায় ৫০ হাজার ডলার। তবে কয়েক বছর পর ওই আয় আড়াই লাখ ডলারে পৌঁছে যাবে বলে আমি আশাবাদী।’

মনিরুজ্জামান মনিরের আইভরি কোস্টে বসবাস  সেময় ১০ বছর পূর্ণ হলেও তার আগে  আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে আরো ৫ বছর কাটিয়েছিলেন । মাতৃভাষা বাংলাসহ ইংরেজি, ফ্রান্স , হিন্দি, উর্দু, সোহেলি এবং আইভরি কোস্টের জুলা ও তাগবানা ভাষায় কথা বলতে পারেন তিনি। দেশটির উত্তরাঞ্চলের যে এলাকায় তিনি ফার্মটি গড়ে তুলেছেন, সেই এলাকায় তাগবানা ও জুলা গোত্রের বসবাস। এলাকাটি তখন  সরকার বিরোধী সশস্ত্র দল ফোর্স নুবেলদের নিয়ন্ত্রণে। সেখানে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অবস্থানান ও তাদের প্রশংসিত কার্যক্রমের জন্য মনিরুজ্জামানের জনপ্রিয়তা আরো বাড়ে।
ফোর্স নুবেলকে চাঁদা দিতে হয় কি না—এ প্রশ্নে মনির বলেন, এখানে চাঁদাবাজির বিষয়টি ততটা ব্যাপক নয়। ফোর্স নুবেলের কমান্ডাররা আমার ফার্মে আসেন। কোনো উত্সব-অনুষ্ঠান থাকলে সহযোগিতা করতে বলেন। কিন্তু তাদের চাহিদা খুবই কম থাকায় আমার সমস্যা হয় না।

এত দূরের  একটি দেশে কেন স্থায়ী হলেন—এ প্রশ্নে মনিরুজ্জামানের জবাব—‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টাার্স করার পর আমরা দুই বন্ধু সিদ্ধান্ত  নিয়েছিলাম দেশে চাকরির আশায় বসে না থেকে বাইরের কোনো দেশে চলে যাব। ১৯৮৯ সালে দেশ ছাড়ি। প্রথমে কেনিয়াতে আসি। আমার ওই বন্ধুর এক আত্মীয় কেনিয়া ছিলেন। সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। সে সময় কেনিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের পরামর্শে চটের ব্যাগসহ বাংলাদেশি অন্যান্য পণ্যের ব্যবসা শুরু করি। উগান্ডা এবং তাঞ্জানিয়াতেও ওই ব্যবসার চেষ্টা  করি প্রায় আড়াই বছর। এরপর জায়ারে মিল্লাত শরীফ নামে বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত এক বৃদ্ধ ব্রিটিশ নাগরিকের মেডিসিন ও গার্মেন্টস ব্যবসার হাল ধরি। বাংলাদেশ থেকে পোশাক এনে সেখানে বিক্রি করতাম। কিন্তু ১৯৯৫ সালের শুরুত জায়ারে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে ওই ব্যবসা গুটিয়ে চলে আসতে হয় আমাকে। এরপর ভারতীয় বংশোদ্ভুত কানাডার এক বন্ধুর পরামর্শে তার  শ্বশুরের সঙ্গে যোগাযোগ করি । ওই ভদ্রলোকের একিজ ফলের ব্যবসা রয়েছে। তিনিই আমাকে পরামর্শ দেন পশ্চিম  আফ্রিকায় একিজ ফলের অনুসন্ধাান করতে। আমি এখন নিজেও অবাক হয়ে যাই একটি অচেনা দেশে, অচেনা একটি ফল খুঁজে বের করে তার ব্যবসা করতে কীভাবে সফল হলাম।’

মনির আরো জানান, তার ফার্মে স্থানীয় বহুলোকের কর্মসংস্থান হওয়ার  কারণে ওই এলাকার অধিবাসীদের কাছে তিনি প্রিয়পাত্র। নিজের ব্যবসায় সহযোগিতা করার জন্য ছোটভাই কামরুজ্জামান ও ভাগ্নে নাসিরুদ্দিন যোগ দিয়েছেন তার সঙ্গে। ভাই-ভাগ্নেসহ স্ত্রী রাশিদা খানম হ্যাপী ও ৭ বছরের একমাত্র কন্যা ইভানা মনির জুঁইকে নিয়ে তিনি সেখানে সুখেই বসবাস করছেন। জুঁই স্থানীয় একটি ফরাসি স্কুলে পড়ার কারণে এবং সহপাঠীদের সঙ্গে মিশে ইতোমধ্যেই ওই ভাষায় অভ্যস্থ । তবে বাড়িতে তাকে কথা বলতে হয় বাংলা ভাষাতেই। 

মনিরের বক্তব্যের সূত্র ধরে তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ক্যাপ্টেন ব্লিগ নামে এক ভদ্রলোক পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ওই ফলটি জামাইকাতে নিয়ে যান ১৭৭৮ সালের দিকে। সেই ফল থেকেই সে দেশে একিস ফলের চাষাবাদ এবং উত্পাদন শুরু । একিসের গাছ প্রায় ৩০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। 

লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, কালের কণ্ঠ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা