kalerkantho

শুক্রবার । ৭ অক্টোবর ২০২২ । ২২ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পথশিশুদের স্বপ্নের মৃত্যু

পার্থ বণিক   

২৯ আগস্ট, ২০২১ ১৩:৪৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পথশিশুদের স্বপ্নের মৃত্যু

বয়স দশ কি বারো। কারো কারো হয়তো এর চেয়ে একটু বেশি। এলোমেলো চুল। কারো গায়ে নোংরা জামা-কাপড়, নেই একটিও বোতাম।

বিজ্ঞাপন

চোখে-মুখে দুরন্তপনার ছাপ স্পষ্ট। একদিকে দুরন্ত শৈশবের একচ্ছত্র হাতছানি, অন্যদিকে মগজভর্তি স্বপ্নের পসরা। কারো ইচ্ছা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার, কারো ইচ্ছা শিক্ষক হওয়ার। কেউ হতে চায় ডাক্তার, কেউ বা ইঞ্জিনিয়ার।  

বলছিলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে খেটে খাওয়া একঝাঁক শিশুশ্রমিক ও পথশিশুদের স্বপ্নের কথা। অঙ্কুরে  বিনষ্ট হয়েছে যাদের স্বপ্ন তাদের কথা। বিশ্ববিদ্যালয় দূরে থাক, বিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নও ধূলিসাৎ হয়েছে যাদের। শৈশবের সব আবেগ-অনুভূতিকে বাক্সবন্দি করতে বাধ্য হয়েছে যারা। জীবনসংগ্রামে টিকে থাকতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাদের এই বয়সে বাড়ি ছেড়ে আসতে হয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে। এসব স্বাপ্নিক শিশুর দল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমিয়েছে নিজেদের স্বপ্নপূরণে নয়, বরং নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে। তাই পাহাড় ঘেরা চিরসবুজ ক্যাম্পাসের একমাত্র বিস্ময় যেন এসব শিশুর সারা দিনের কর্মব্যস্ততা।  

কেউ বিশ্ববিদ্যালয় হলের ও অনুষদের ক্যান্টিনে কাজ করে, কেউ ঝুপড়ির চায়ের দোকানে, কেউ কেউ কাজ করে হোটেলে। কাউকে দেখা যায় পত্রিকা বিক্রি করতে, কেউ চালায় ভ্যান, কেউ কুড়ায় শুকনো পাতা কিংবা লাকড়ি, কেউ কেউ দিনমজুরের কাজও করে। কেউ কাজ করে পেটেভাতে, কেউ আবার মাসে মাইনে পায় দুই থেকে তিন হাজার টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন একটি দোকান খুঁজে পাওয়া কঠিন, যেখানে নেই ১৮ বছরের নিচে কর্মরত কোনো শিশু। আইন-কানুন, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা দূরে থাক, মালিকদের কম টাকায় খাটাতে পারার মানসিকতা বদলায়নি এতটুকুও । নির্মূল হয়েছে ন্যূনতম মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।

খেটে খাওয়া মা-বাবার অভাবের সংসারে একটু স্বস্তি এনে দিতে অনেককে দেখা যায় বস্তা কাঁধে ঝাড়ু হাতে গাছের পাতা কুড়াতে, লাকড়ি টোকাতে। যে বিদ্যাপীঠে জ্ঞানের আলো কুড়াতে আসে হাজারো শিক্ষার্থী,  সেখানে সংসারে উনুনে আগুন জ্বালাতে কুড়াতে হয় শুকনো পাতা। শুধু দরিদ্রতার কারণেই নয়, বরং পরিবারের অন্য সদস্যদের অবহেলার কারণেও তাদেরকে যুক্ত হতে হচ্ছে এসব কাজে। এসব কারণে দিনের পর দিন ক্যাম্পাসে বাড়ছে শিশুশ্রমিক ও পথশিশুদের সংখ্যা।

১৪ বছরের ছোকরা মো. আসিফ। দেশের বাড়ি বরিশাল। উজিরপুর উপজেলার ১০ কিলোমিটার এলাকা বিলীন হয়ে গেছে নদীভাঙনে। সেই সঙ্গে ভেঙে গেছে আসিফের স্বপ্নও। তবু মুখে একগাদা হাসি। দুই বছর ধরে কাজ করছে এ. এফ. রহমান হলের ক্যান্টিনে। প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টার নিয়মমাফিক কাজ। নেই কোনো অবসর। থাকারও নেই সুব্যবস্থা। এই শিশুটাকে তার কী করা উচিত ছিল জানতে চাইলে সে এককথায় জানান দেয়, লেখাপড়া করার ইচ্ছা আছে, কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে সম্ভব হয়নি।  

একই ক্যান্টিনে আসিফের মতো কাজ করে শাওন (১৪)। সুযোগ হয়েছে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার। বাবা মারা যাওয়ার পর চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় শাওন পড়াশোনা ছেড়ে গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর থেকে কাজ করতে চলে আসে ক্যান্টিনে। এ কাজ করে পরিবারের সবার মুখে দুই বেলা তুলে দেয় দুই মুঠো ভাত। তবে গত প্রায় দুই বছর ধরে করোনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই শিক্ষার্থীদের আনাগোনা। তাই এখন নুন আনতে পান্তা ফুরায় বলেও জানায় সে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থীর 'ক্যাকটাস’ নামের একটি সংগঠন কাজ করছে এসব শিশুকে নিয়ে। তারা বিশেষ দিবসগুলোতে এসব ছিন্নমূল শিশুদের নিয়ে করে থাকে বিশেষ আয়োজন। এ বিষয়ে সংগঠনটির সমন্বয়ক সিফাত হিমেল বলেন, 'আমাদের মূল লক্ষ্য শিশুশ্রমিক ও পথশিশুদের মুখে একটু হলেও হাসি ফোটানো। ' বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীন আখতার জানালেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশুশ্রম মেনে নেওয়া যায় না। দরিদ্র ও ছিন্নমূল শিশুদের পড়াশোনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উষ প্রাইমারি স্কুল রয়েছে, যেখানে ওরা অল্প খরচে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে। তা ছাড়া ওদের জন্য একটি নৈশ বিদ্যালয়ের পরিকল্পনাও আছে বলে জানান তিনি।

এ তো শুধু আসিফ আর শাওনের জীবনের গল্প। শিশু থেকে শিশুশ্রমিক বনে যাওয়ার গল্প। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আসিফ কিংবা শাওনের মতো আরো শত শত শিশু দিন-রাত কাজ করছে। এখানকার সব আয়োজনই যেন ব্যর্থ এসব শিশুশ্রমিক আর পথশিশুর কাছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষার আলোর নিচেই যেন চাপা পড়ছে এই শিশুরা।  

লেখক : ফ্রিল্যান্সার 



সাতদিনের সেরা