kalerkantho

সোমবার । ৭ আষাঢ় ১৪২৮। ২১ জুন ২০২১। ৯ জিলকদ ১৪৪২

করোনা মানবসৃষ্ট নাকি প্রাকৃতিক দুর্যোগ?

কে এন এন লিংকু    

৮ জুন, ২০২১ ১৭:১১ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনা মানবসৃষ্ট নাকি প্রাকৃতিক দুর্যোগ?

করোনাভাইরাস বায়োলজিক্যাল অস্ত্র নাকি প্রকৃতির সৃষ্ট একটি মহামারি? বর্তমান সময়ে এই বিষয়টি নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে। আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প কিছুদিন আগে জোর দিয়ে বলছেন, এটি উহান ল্যাবরেটরিতে প্রস্তুতকৃত। এর জন্য চীনকে প্রাথমিকভাবে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ট্রাম্পের এই বক্তব্য অতিরঞ্জিত বলে অনেকেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। 
 
তবে বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে গত ২৭ মে। ওইদিন বর্তমান মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন, কভিড-১৯ এর উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধান প্রতিবেদন বের করতে একটি অর্ডার জারি করেন। ৯০ দিনের মধ্যেই এই প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। 
 
এখানে উল্লে­খ্য, ২০০৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক কমিটি একটি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসূচক তৈরি করেছে। এই সূচকে উলে­খ আছে, পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে বিশেষ কোন রোগ বা সংক্রমণের অস্তিত্ব পাওয়া গেলে সংস্থাটিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জানাতে হবে। কিন্তু চীন কোভিড-১৯ শনাক্তের প্রায় এক মাস পরে ডাব্লিউএইচও চীনার অফিসের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে বিষয়টি উন্মোচন করে। এসময় সংক্রমণ বন্ধ করার জন্য কয়েকটি শহরে লকডাউন জারি করলেও সব ধরণের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু রাখে চীন। ফলে সারাবিশ্বে এই ভাইরসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। 
 
একটু পিছনে ফিরে দেখা যাক। এইচটেনএনথ্রি ভাইরাসটি বার্ড ফ্লু নামেই পরিচিত। প্রথমবার চীনের এক ব্যক্তি এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। পরে তা সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বার্ড ফ্লুর অন্য ধরণ এইচসেভেনএননাইন ভাইরাসটিকে বিপদজনক আখ্যা দেয় ডাব্লিউএইচও। এ ভাইরাসে আক্রন্তদের ৬০% মানুষ মারা যায়। সেখানে কোভিড-১৯ এ মারা যাচ্ছে মাত্র ৩.৪%। সেদিক থেকে কিছুটা রক্ষা। এর আগে সার্স ভাইরাস চীনের হুবেই প্রদেশ থেকে ছড়ায়। প্রথমে এটি একটি বাঁদুড় বা কোন প্রাণির দেহে আবিষ্কৃত হয়। পরবর্তী সময়ে উহান ল্যাবরেটরির গবেষণাগার থেকে ছড়িয়ে পড়ে। যেহেতু সার্স এসেছে বাঁদুড় থেকে; তাই ধারণা করা হচ্ছে একই গোত্রের ভাইরাস কোভিড-১৯ ভাইরাসও একই প্রাণির দেহ থেকে এসেছে। 
 
পৃথিবীজুড়ে প্রচুর ভাইরোলজি ল্যাব নিত্য নতুন ভাইরাস নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত আছে। কিন্তু প্রতিটি ল্যাবেই রয়েছে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা। কারণ, একটু অসাবধানতাই ঘটাতে পারে অনেকে প্রাণহানি। তাহলে কভিড-১৯ কী এই অসাবধনতার ফল? তবে এ নিয়েও মতভেদ আছে। কারণ ডাব্লিউএইচও-র পরিদর্শক দল উহান ল্যাব পরিদর্শন করে জানায়, এই ল্যাব কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় সাবধানতার অভাব ছিল।
 
কোভিড-১৯ ছড়ানো নিয়ে চীনকে দোষারপ করার আরও কারণ আছে। এ ভাইরাসে চীনে আক্রন্ত কিংবা মৃত্যুর হার অনেক কম। চীনের রাজধানী বেইজিং বা বাণিজ্যিক শহর সাংহাইয়ে—এ ভাইরাসের কোন প্রভাব পড়েনি। সে দেশের কোন উচ্চপদস্থ নেতা কিংবা সামরিক ব্যক্তি আক্রান্ত হননি। স্রষ্টার এত কৃপা তারা কিভাবে অর্জন করল? 
 
এদিকে করোনাকালে চীনের জিডিপি ১৬.৩৮% বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০২০ সালে সারাবিশ্বে চাকরি হারিয়েছেন ১৪৪ বিলিয়ন মানুষ। কিন্তু চীনে এর কোন প্রভাব পড়ছে না। বরং চীনা সরকার পৃথিবীব্যাপী তাদের মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য আরও চাইনিজ নাগরিক খুঁজছেন। 
 
চাইনিজ ভাইরোলজিস্ট ড. লি মেঙ্গ ইয়ান (হংকং স্কুল অব পাবলিক হেলথ) জানান, তাঁর কাছে প্রমাণ রয়েছে—কিভাবে এই ল্যাব থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, এটা অবশ্যই মানবসৃষ্ট। এটি মোটেও মাংসের বাজার থেকে বা অন্য কোন উৎস থেকে ছড়ায়নি। এরপর ডাব্লিউএইচও একটি প্রতিনিধি দল অনুসন্ধানে পাঠায় চীন। কিন্তু তাঁদের অনেক ভবন, ল্যাব বা হাসপাতালে স্বাধীনভাবে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। 
 
আলোচনা সাপেক্ষে যদি আমরা ধরে নিই, এটা একটি বায়োলজিক্যাল অস্ত্র। আর এই অস্ত্রের দ্বারা চীন অঘোষিত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নীরবে ঘটিয়ে দেওয়ার প্রয়াস চালিয়েছে, তবে এটি পৃথিবীর জন্য অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয়। সামনে আমাদের জন্য অবশ্যই খারাপ সময় অপেক্ষা করছে। এতে এক পরাশক্তি অন্য পরাশক্তির ওপর প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠবে। ইতোমধ্যেই এর আঁচ পাওয়া যাচ্ছে। ইতিমধ্যে সারাবিশ্বে ভূরাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন ব্লকে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে দেশগুলো। নানা রকম নতুন নতুন জোট প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর থাবা বসাতে চাচ্ছে। সাগরে-আকাশে সর্বত্র চলছে সামরিক মহড়া। চীনও তার পক্ষের শক্তিগুলোকে একত্রিত করতে বড় বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে আকৃষ্ট করে দলে ভিড়াচ্ছে। পশ্চিমা অর্থনীতিবিদরা এটাকে বলছে, ঋণের জালে আটকে পুরানো মধ্যযুগীয় ঔপনিবেশিক মনোভাবের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে চীন। 
 
চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যাদের সঙ্গে চীনের উচ্চ পর্যায়ের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ রয়েছে সেই সব দেশ কাকতালীয়ভাবে করোনা থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত। সারাবিশ্বের কারখানা বলে খ্যাত চীন যে পরিমাণ পিপিই প্রস্তুতে মনোযোগী ছিল, ভ্যাকসিন তৈরিতে তাদের তেমন কোনো অগ্রগতি বা উৎসাহ চোখে পড়েনি। সেই সূত্র ধরেই চীনের সুপারপাওয়ার হওয়ার স্বপ্নের সঙ্গে অনেক কিছুই সন্দেহের সৃষ্টি করছে। 
 
অতি দ্রুত কভিড-১৯ তার ধরণ বদলে আরও ভয়ঙ্করভাবে মানবদেহের সেলকে অকার্যকর করে ফেলছে। একটার পর একটা দেশের নামের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে নতুন নতুন ভয়াবহ নিউ স্ট্রেন। প্রথম দিকে এটি বয়স্ক, পরের বার যুবক, বর্তমান ভেরিয়েন্ট শিশুদের দ্রুত সংক্রমিত করছে। প্রতিটা প্যান্টার্ন দেখে মনে হচ্ছে, কেউ ঠাণ্ডা মাথায় এর ডিজাইন করেছে। সম্প্রতি তার ওপর ভর করেছে কালো ফাংগাস। এখন কভিড-২৩ ও কভিড-৩০ এর কথা শোনা যাচ্ছে। এগুলো কী কভিড-১৯ থেকেও অনেক ভয়াবহ?
 
বিজ্ঞানীদের মতামত হচ্ছে, আমাদের অবশ্যই অতি দ্রুত কভিড-১৯ এর মূল ভাইরাসের রহস্য ও উৎপত্তিস্থল  (নতুন রূপ নেওয়ার আগে) বের করতে হবে, যাতে এটিকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। দিন শেষে যদি এটি প্রমাণিত হয়, সত্যি সত্যিই চীন তার ল্যাব ব্যবহার করে একটি বায়ো অস্ত্র তৈরি করতে চেয়েছিল, তবে তাদের এর দায়ভার অবশ্যই নিতে হবে। 
 
আমরা ভাবতে চাই, এটা চীনের সৃষ্ট নয়, দুর্ঘটনাবশত এটি ছড়িয়ে পড়েছে; দ্রুত এর হাত থেকে সবাই মুক্তি পাবে। তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি দরকার চীনকে সত্যিটা উপস্থাপন করা। একইসঙ্গে এটি নিয়ন্ত্রণে আমেরিকাসহ উন্নত রাষ্ট্রগুলোকে সহযোগিতা করা। তাহলেই কেবল মানবসভ্যতা বড় ধরণের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে। 
 
কে এন এন লিংকু 
লেখক, কলামিস্ট   
knnlinku(at)gmail.gmail.com


সাতদিনের সেরা