kalerkantho

শুক্রবার । ১১ আষাঢ় ১৪২৮। ২৫ জুন ২০২১। ১৩ জিলকদ ১৪৪২

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে এই প্রাপ্তি?

মাহজাবিন নাফিসা

২২ মে, ২০২১ ১২:২৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে এই প্রাপ্তি?

প্রতীকী ছবি

একজন সাংবাদিক তার পেশার খাতিরে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে চরমভাবে অপমান, অপদস্ত হচ্ছেন- আমাদের দেশের এ এক অতিপরিচিত দৃশ্য। এইবার এতে যোগ হলো নতুন মাত্রা।

সাংবাদিকতার একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। এখানে প্রতিবেদক লুকানো বা গোপন তথ্য সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরেন। এই কাজ অনেক সময় অনেক ঝুঁকিপূর্ণ হলেও আমাদের সাংবাদিকরা এ বিষয়ে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু পেশার ধরনের কারণে তারা মাঝেমাঝেই পড়ছেন ঝুঁকিতে। কারণে অকারণে হেনস্থা হলেন দেশের প্রথম সারির একজন সিনিয়র সাংবাদিক।

কিন্তু কেনো সাংবাদিকরা এই আক্রমণের শিকার হচ্ছেন? খবর বা ছবি সংগ্রহ করাই তো তাদের কাজ। সাংবাদিকদের কাজই হলো মানুষকে তথ্য জানানো। এই জন্যই তারা কাজ করেন। তাহলে কেনো খবর প্রকাশের পর সাংবাদিককে মার খেতে হয়, নির্যাতিত হতে হয়?

রোজিনা ইসলাম গত অনেকদিন থেকেই  স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন করে যাচ্ছিলেন। করোনার সময় টিকা ও ওষুধে বরাদ্দ অর্থ নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সময়ের অর্থ আত্মসাৎ- এই ছিল তার বিষয়। এই ব্যাপারেই ছিল তার অনুসন্ধান। গত সোমবার তিনি এই কাজেই গিয়েছিলেন। সেখানে তাকে প্রায় ছয় ঘণ্টা আটক রাখা হয় এবং তাকে অসুস্থ অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিলো পুরোটা সময়। এই রকম ব্যবহার কতোটা যৌক্তিক?

এর আগেও অনেক সাংবাদিক তাদের অনুসন্ধানের কারণে অপমানিত হয়েছেন, হেনস্থা হয়েছেন, এমনকি জীবনও দিতে হয়েছে। ফটো সাংবাদিক কাজল যিনি প্রায় তিপ্পান্ন দিন নিখোঁজ ছিলেন। খুঁজে পাওয়ার পরেও তাকে বিভিন্ন মামলায় ফাঁসিয়ে প্রায় নয় মাস আটক রাখার পর তিনি মুক্তি পান। এছাড়াও নির্যাতনের মতো ভয়াবহ ঘটনা আমরা দেখেছি। চট্টগ্রামের গোলাম সরওয়ার, নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর তাকে যখন পাওয়া যায় তখন তিনি বলছিলেন, 'আমারে আর মাইরেন না, আমি আর নিউজ করবো না।' এছাড়াও কয়েকদিন পর পর সাংবাদিকদের নির্যাতন করা এখন সাধারণ ঘটনামাত্র। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়ও আমরা সেখানে একই ঘটনা দেখেছি। সেখানে উপস্থিত একজন সাংবাদিক বলেন তারা 'মার শালারে মার' বলে তাকে পেটাচ্ছিল। বাংলাদেশের গণমাধ্যম যে কতটা স্বাধীন সে প্রশ্ন অনেক পুরোনো, কিন্তু একজন খবর সংগ্রাহককে যেখানে সেখানে অপমান অপদস্থ করা, এটা কতোটা যৌক্তিক? 

উন্নয়নশীল একটি দেশ যেখানে জনগণ নিজের মত প্রকাশ করতে পারে না, সাংবাদিক তার খবর প্রকাশ করতে পারেন না, করলেও হয় যেতে হয় জেলে নয়তো গুম। ফোনে আসে একের পর এক হুমকি। মত প্রকাশের এই বাধা কেনো আসছে? দেশের অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখতে গেলেই যদি হয়রানি হতে হয় তাহলে আসলে কি গণমাধ্যম স্বাধীন? যেখানে হওয়ার কথা ছিলো গণমাধ্যম স্বাধীন ও দ্বিধাহীনভাবে সবরকম খবর প্রকাশ করবে। বেশিরভাগ সাংবাদিকই তাদের সাথে হওয়া অন্যায়ের বিচার পান না বা বিচার পাবেন না জেনে অনেকেই অভিযোগও করেন না। অথচ জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমপক্ষে ২৪৭ জন সাংবাদিক গত বছর নানা সময়ে বিভিন্ন ভাবে উচ্চপদস্থ লোকদের দ্বারা অপমানিত, নির্যাতিত এবং লাঞ্ছিত হয়েছেন। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই জীবন বিপন্ন করে তাদের খবর সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন তাদের আরো ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। কেউ চাইলেই খবর প্রকাশের জন্য যে কারো বিরুদ্ধে মামলা করে দিতে পারেন। গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশ নেমে এসেছে ১৫১ থেকে ১৫২-তে। মাত্র ১৮০টি দেশের মধ্যে আরএফএস এই  জরিপটি করে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেও এরকম অবস্থান আসলে অত্যন্ত লজ্জাজনক। এদেশে এর আগেও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ বা সাময়িক বন্ধের ঘটনাও ঘটেছে। 

রেজিনা ইসলামের মতো সাহসী সাংবাদিকেরা যদি এইভাবে লাঞ্ছিত হন, তাহলে খুব দ্রুতই সাংবাদিকদের আর হয়তো প্রয়োজনই হবে না! ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মত গণমাধ্যম স্বাধীনতা বিরোধী আইন বাতিল না হলে ক্রমাগত মার খেয়ে প্রাণের ভয়ে হয়তো শুধু সেবা নয়, পেশা হিসেবেও এর বিলুপ্তি ঘটবে।

লেখক: গণমাধ্যম শিক্ষার্থী, ব্লগার



সাতদিনের সেরা