kalerkantho

শুক্রবার । ১০ বৈশাখ ১৪২৮। ২৩ এপ্রিল ২০২১। ১০ রমজান ১৪৪২

মাইজধান বেলার গপ্প

আফরিনা ওশিন   

৩১ জানুয়ারি, ২০২১ ১৯:৫৮ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



মাইজধান বেলার গপ্প

আফরিনা ওশিন

পরনের লুঙ্গি কিছুটা উঁচিয়ে ভাঁজ করে হাঁটু অব্দি গুঁজে গলায় লাল রঙের গামছা ঝুলিয়ে কুচকুচে কালো বর্ণের লম্বা শরীরটা নিয়ে পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের অফিসের সামনের বারান্দায় এসে দাঁড়ালো নুরু। হাতের সিসার বালতিটাও খুব ভারী লাগছে আজ। সশব্দে বালতিটা বারান্দার মেঝেতে রেখে দেয়াল ঘেঁষে পা ছড়িয়ে বসে পড়ল। জ্যৈষ্ঠের কাঠফাটা রোদেও শীতশীত করছে একটু। মনটা যে ভালো, তা-ও ঠিক না। মনের অবস্থা খারাপ। গত রাতে লক্ষ্মীকে বেদম পিটিয়েছে মদের ঘোরে। একপর্যায়ে সহ্য করতে না পেরে লক্ষ্মী জোরেশোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল তাকে। কিন্তু নিজের শরীরের ভার নিতে না পেরে টলতে টলতে নুরু উপুড় হয়ে পড়ে গেল। তার কপাল গিয়ে পড়ল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ড্রেনের স্লাবের ওপর। এরপর আর কিছু মনে নেই। সকালে লক্ষ্মীর কান্নার সুরে ঘুম ভেঙেছে । তাকিয়ে দেখল, লক্ষ্মীর ঠোঁটের ডান কোনায় রক্ত জমে কালশিটে পড়ে গেছে। রাতের কথা মনে পড়তেই নিজের ওপর ভীষণ রাগ হলো। মনে মনে ভাবছিল, নিজের গালে নিজেই চড়াবে। জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে যে স্ত্রীকে, মাতাল অবস্থায় তাকেই কিনা মেরেছে। সে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিল লক্ষ্মীর সুর ধরে। কিছুক্ষণ পরে বুঝতে পারল, বউ তার নিজের ব্যথার জন্য কাঁদছে না। বরং তার জন্যই কাঁদছে। কারণ একই মদের ঘোরে লক্ষ্মী তাকে ধাক্কা মেরেছিল। এখন কাছে এসে কপালের কোণে রক্ত জমাট বাঁধা অংশে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর নিজের কৃতকর্মের জন্য আক্ষেপ করছে সুর করে। আবেগ সামলাতে না পেরে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে শপথ করল, এরপর আর কোনো দিন মদ ছুঁয়েও দেখবে না। এমন শপথবাক্য সপ্তাহের সাত দিনে দু-এক দিন পরেই করে থাকে তারা। এসব দায়িত্বহীনতার কথা নতুন না তাদের জন্য। একমাত্র ছেলে রবিনের কথা তো ভুলেই যায় মাঝেমধ্যে। ছেলের কথা মনে পড়তেই লক্ষ্মী বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলো। নুরু তাকে দুপুরের পর ফিরবে বলে আশ্বস্ত করে কাজের উদ্দেশে রওনা হলো।

নুরুর আসল নাম এডওয়ার্ড। জীবনের শুরুতে তার পরিবার মুসলিম ধর্মাবলম্বী ছিল। তার বাবা নহর বিরাম দেওয়ানের বাড়িতে কাজ করত। পূর্বপুরুষের কারো আর্থিক অবস্থা কখনো ভালো ছিল বলে জানা নেই নুরুর। তার দাদাও বিরামের বাবা আরাম দেওয়ানের খেদমত করত। অর্থের অভাবেই দাদা এখানে এসেছিল। আর কখনো ফেরা হয়নি। পূর্বপুরুষের বাড়ি পশ্চিম দিকে- এটাই জানে সে। পশ্চিম অনেক বড়, তাই আর খুঁজতে বের হয়নি কেউ। তবে কোনো এক সাঁওতাল অঞ্চল থেকেই তারা এখানে এসেছিল- এটা বোঝা যায়। এ অঞ্চলেও সাঁওতালদের বসতি আছে প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ ঘর। হয়তো সে কারণেই এখানে আসা। আরাম দেওয়ান বাড়ির পাশে ছোট একটা ঘর তুলে দিয়েছিলেন নহরের বাবাকে। সরল-সোজা নহর ও তার বাবা মালিকের জন্য যেমন ছিল নিয়োজিতপ্রাণ, তেমনি বিশ্বস্ত। অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়েছিল নহর। তাই বলে দেওয়ানরা তাকে ঘরছাড়া করেনি। বরং বাবার জায়গায় ছেলেকে চাকরি দিয়ে নিজের কাছেই রেখেছিলেন।

নিয়ামতপুরে দেওয়ান পরিবারকে টক্কর দেওয়ার মতো প্রতাপ একমাত্র চৌধুরীদেরই ছিল। এককালে দুই পরিবারের মধ্যে বেশ যাতায়াত ছিল। যেকোনো অনুষ্ঠানে গাছের ফল, হাঁড়ির খাবার দেওয়া-নেওয়া হতো। দুই বাড়ির খানকায় বসত জমজমাট মজলিস। অনেক জ্ঞানীগুণীর আসা-যাওয়া ছিল সেসব মজলিসে। এত কিছুর পরও ধর্মের দ্বন্দ্ব জমাট বেঁধেছিল কোথাও না কোথাও। তবে তা কখনো প্রকট হয়নি। চৌধুরীদের পূজা-পার্বণে সবার আগে নিমন্ত্রণ পৌঁছে যেত দেওয়ানবাড়িতে। আবার দেওয়ানবাড়ির ঈদের সেমাই চৌধুরীদের কেউ মুখে দেয়নি এমনটা হয়নি ভুল করেও। কিন্তু পরবর্তীকালে বিরাম দেওয়ানের সঙ্গে আদিত্য চৌধুরীর বড় মেয়ে মিনুর প্রেমই দুই পরিবারের সুসম্পর্কের কাল হয়ে দাঁড়াল।

দেওয়ানবাড়ির এমন কোনো গোপনীয়তা নেই, যা নহর জানে না। কিন্তু জীবন গেলেও যে তার পেট থেকে একটা কথাও বের করা যাবে না, তা সবাই জানে। আরাম তার স্ত্রী আতিকা বেগমের থেকেও বেশি বিশ্বাস করতেন নহরকে। অনেকটা সন্তান সমতুল্যই মনে করতেন। তাই হয়তো সিন্দুকের চাবিও নহরের হেফাজতেই রাখতেন। আতিকা বেগমও সন্তানসম গৃহকর্মীকে নিয়ে মনে সন্দেহ পোষণ করেননি। বরং নিজেই পছন্দ করে বউ এনেছেন নহরের জন্য। তবে নহরের একটা বিষয় পছন্দের হলেও অপছন্দের ছিল অনেকের। তা হলো, নহর চরম বিপদে বা খুব দায়ে পড়লেও মিথ্যা বলত না। এতে কারো জীবন গেলেও যেতে পারে। তবু সে মিথ্যা বলবে না। একবার এক মজার ঘটনাও ঘটেছিল নহরের মিথ্যা না বলা নিয়ে।

চৌধুরীবাড়ির পূজার অষ্টমীতে নাটকের আয়োজন করা হলো । উপলক্ষ জেলার ব্রিটিশ কর্মকর্তা জনসন সাহেবকে খুশি করা। জনসন উদার এবং একই সঙ্গে একজন ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী হিসেবে পরিচিত। তাঁর কাছে জাত, ধর্ম, বর্ণ-নির্বিশেষে সবাই সমান। তাই জনসন সাহেবের আগমনকে কেন্দ্র করে চৌধুরী এবং দেওয়ান পরিবার এলাকার বিভিন্ন জাত ও ধর্মের মানুষকে এক করল। ঠিক হলো, তাঁদের মধ্য থেকে বাছাই করা কয়েকজনকে দিয়ে নাটক মঞ্চায়ন করা হবে। নাটক লিখবে চৌধুরীর বড় ছেলে প্রদীপ বাবু। আর মঞ্চ-অধিকর্তা বিরাম দেওয়ান। একপর্যায়ে বিরাম নহরের নাম জুড়ে দিল একজন চোরের ভূমিকায়, যে অন্যের ক্ষেতে শসা চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। এমন চরিত্র পেয়ে নহর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত। যে কখনো মিথ্যা বলে না তাঁকে কিনা হতে হবে চোর। অনেক কষ্টে তাঁকে এটা বুঝিয়ে মানানো গেল, চুরি করতে হবে না। নিছক চোরের অভিনয় করতে হবে। শিখিয়ে পড়িয়ে নহরকে অবশেষে মঞ্চে উপস্থিত করা হলো। বিপত্তি ঘটল এইবার। প্রায় হাজারখানেক সাধারণ মানুষ এবং জনসন সাহেবকে দর্শকের সারিতে বসে থাকতে দেখে নহরের আত্মমর্যাদাজ্ঞান হঠাৎ করেই উদয় হলো। সে তার চোর পরিচয় ঢাকতে গিয়ে –

জমির মালিক : তুই আমার ক্ষেতের শসা চুরি করেছিস কেন?
নহর : (উত্তেজিত কণ্ঠে) হামি কেন তুর জমির শোসা চুরি করিবো?
জমির মালিক : (হকচকিয়ে, নহরের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে) বল কেন চুরি করেছিস?
নহর : (চিৎকার করে) কুন শালা কলো রে হামি শোসা চুরি করেছি!
পেছন থেকে অধিকর্তা বলল, বল চুরি করেছিস।
নহর : হামি শোসা চুরি করিনি।
অধিকর্তা : এটা নাটক।
নহর : হামি তুর লাটকের গুষ্টি কিলাই। মিছামিছা চুর বলছিস হামাকে।

একপর্যায়ে খেপে গিয়ে জমির মালিককে ধাক্কা দিয়ে মঞ্চ থেকে ফেলে দিল সে। মিথ্যা চুরির অপবাদের লজ্জায় মঞ্চ থেকে নেমেই কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির দিকে ছুটল। পরে জনসন সাহেব সমস্ত বিষয়টা বুঝতে পেরে হাসতে লাগলেন বাকিদের সাথে। তার ভালো মানুষীর কদরও করেছিলেন সেদিন।

নহর জ্ঞানত কখনো চায় না মনিবের ক্ষতি হোক। আর সেখানে যদি আসে মনিবের মান-সম্মানের প্রশ্ন। মিনু আর বিরামের সম্পর্কের বিষয়টি তাকে মনে মনেই ভীষণ পীড়া দেয়। সে বেশ কয়েকবার আকার-ইঙ্গিতে মালিকপুত্রকে বোঝাতেও চেষ্টা করেছে, এতে দুই পরিবারের মাঝে কী কী অন্তর্দ্বন্দ্ব হতে পারে । এসবে ভ্রূক্ষেপ করার সময় নেই বিরামের। সে রীতিমতো মিনুতে মজে আছে তখন। কিন্তু মিনুর বড় দাদা প্রদীপ যেদিন জানতে পারল, বিষয়টি আর সবার অগোচরে থাকল না। একদিন পথে বিরামকে খুব করে শাসিয়ে দিল। সঙ্গে এটাও জানাল, খুব তাড়াতাড়ি মিনুর বিয়ের ব্যবস্থা করবে অন্যত্র। এখানেই ক্ষান্তি দিল না। বাড়ি গিয়ে সবার সামনেই মিনুকে ক’টা চড়ও কষিয়ে বসল রাগের মাথায়। অপমান সহ্য করতে না পেরে মিনু নিজের ঘরে ঢুকে দরজায় খিল দিল। পরদিন দরজা ভেঙে তাঁর বিষে ভরা বরফ শীতল শরীর উদ্ধার করা হয়েছিল। প্রদীপ চৌধুরী বোনের মৃত্যুশোক সহ্য করতে না পেরে একটা বাঁশের খুঁটি নিয়ে ছুটল দেওয়ানবাড়ির দিকে। বিরামবাড়ির দোতলার বারান্দা থেকে ক্ষিপ্ত ষাঁড়ের বেগে আসা প্রদীপকে দেখতে পেল। সঙ্গে সঙ্গে সে সদর দরজায় থাকা দারোয়ান মৃধাকে নির্দেশ দিল প্রদীপকে ওখানেই থামাতে। বিরামের কণ্ঠ শুনে প্রদীপের রাগ আরো চড়ে গেল। সে হাতে থাকা খুঁটি দিয়ে মৃধার পায়ে এক ঘা বসিয়ে দিল । মৃধা আর নিজেকে দমিয়ে না রেখে প্রদীপের কাঁধ বরাবর লাঠির আরেক ঘা লাগিয়ে দিল। প্রদীপ সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। নহর বাড়ির উঠান থেকে সবটা দেখে বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ।

সেদিনের পর থেকে প্রদীপ আর কথা বলেনি। শুধু বিছানায় শুয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। তাতে কোনো রাগ বা ক্ষোভের ভাষা আছে কি না আন্দাজ করা যায় না। আদিত্য চৌধুরী দেওয়ানবাড়ির ছেলেকে জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়বেন বলে প্রতিজ্ঞা করেছিল। সে বিরাম দেওয়ানের নামে কোর্টে মামলা করল। তার আগেই পুলিশ এসে হাতে মোটা দড়ি বেঁধে ধরে নিয়ে গিয়েছে মৃধাকে। বেচারা মৃধার মা জোয়ান ছেলের দুঃখে সারা দিন থানার সামনে বসে কাঁদে। তাড়িয়ে দিলে আবার যায়। এর মধ্যে দেওয়ানবাড়িতে ডাক এলো কোর্টে হাজিরা দিতে হবে। প্রধান সাক্ষী নহর। নহর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শপথ করল, সে যা দেখেছে তা-ই বলবে, মিথ্যা বলবে না।

উকিল : বলো, তুমি কী দেখেছ?
নহর : হে, আমি দিখেছি। উও উহাকে খুন্টি দিয়া পিতাইয়েছে।
জজ : খুন্টি কী?
নহর : খুন্টি মানে খুন্টি।
উকিল জজকে খুন্টির অর্থ যে খুঁটি তা বুঝিয়ে বললেন।
উকিল : ঘটনাটা কোন সময়ে ঘটেছে?
নহর : তোখন হবে ধোর মাইজধান বিলা।
জজ : মাইজধান বিলা মানে?
নহর : মাইজধান বিলা, মাইজধান বিলা! (রাগান্বিত স্বরে) এ উকিল বাবু ই কি জজ লিয়ে এসেছিস।
(জজের দিকে তাকিয়া) তু তো জজের চিয়ারটাকে লষ্ট করবু। মাইজধান বিলাই বুঝে না। ই হামি তুর কাছে সাক্ষী দিবো না!

জজ প্রচণ্ড রেগে গিয়ে পাগল অপবাদ দিয়ে নহরকে আদালত থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি আর কারো কথা না শুনে এবং বাকি সাক্ষীদের না ডেকেই রায় শুনিয়ে দিলেন। রায়ে মৃধার পাঁচ বছরের জেল হলো। মৃধার মা প্রলাপ বকতে বকতে নহরকে নানা অভিশাপ শুনিয়ে দিল। নহর কিছু না বলে বোবার মতো তাকিয়ে রইল আরাম সাহেবের দিকে। সে মাথা নিচু করে কোর্ট প্রাঙ্গণ ছেড়ে চলে গেল। নহর তো মিথ্যা বলেনি। শুধু সত্যিটা সামনে আসল না। সেদিনের পর সে আর কোনো দিন দেওয়ানবাড়ির পথ মাড়ায়নি। প্রায় সাত দিন এখানে সেখানে ঘুরে, না খেতে পেয়ে নহর ও তার পরিবারের বেহাল দশা। মা, স্ত্রী আর সদ্যোভূমিষ্ঠ নুরুকে নিয়ে অবশেষে একটি খ্রিস্টান মিশনারিতে তাদের ঠাঁই হলো। তবে এখানে থাকতে হলে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বন করতে হবে। তাহলেই সব সুবিধা ভোগ করা সম্ভব। গরিবের ক্ষুধা ঈশ্বর আর ধর্মই সচরাচর মিটিয়ে থাকে। নহরের ক্ষেত্রেও তেমন অভিন্নতাই ঘটল। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর নহরের নাম হলো পিটার সরেন। সরেন তার পূর্বপুরুষের পদবি। পিটার চার্চের বাগানে মালির সহকারী হিসেবে কাজ পেয়ে গেল। এখানে খাওয়া-পরার কোনো অসুবিধা নেই। চার্চে আসার বছর দুই পর পিটারের মা গত হলো। স্ত্রী আর সন্তান নুরুকে নিয়ে তাদের ছোট সংসার। নুরুর এলবার্ট নামটা উচ্চারণ করা পিটার এবং তার স্ত্রীর জন্য অনেকটা দুরূহই বটে। তাই তারা ছেলেকে লুরু বলেই ডাকে। শুধু চার্চের অন্যরা তাঁকে ডাকে এলবার্ট নামে।

একটু বড় হওয়ার পর থেকেই নুরু বাবার সঙ্গে কাজ করে বাগানে। কিন্তু বয়স নয়-দশ বছর হলে অন্য খ্রিস্টান ছেলেদের মতো তার মনেও শখ জাগে স্কুলে যাওয়ার। কিন্তু তার বাবার বিশ্বাস কাজের লোকের ছেলে কাজের লোকই হয়। তাই স্কুলে গিয়ে সময় নষ্ট না করে ছোট বয়স থেকেই কাজ শিখে নেওয়া ভালো। ভবিষ্যতে কাজে আসবে। এর মধ্যেই একদিন মিশনারি স্কুলের ফাদার এসে জানালেন, গির্জার সব কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু পিটার কিছুতেই নুরুকে স্কুলে যেতে দেবে না। তার সব চেষ্টা অগ্রাহ্য করে ফাদার একদিন নুরুকে স্কুলে নিয়ে গেলেন। স্কুলের নতুন জামা, বই আর মজার মজার খাবার দেখে প্রথম প্রথম খুব মজা পেল নুরু। কিন্তু মাস্টার মশাই আর অন্য সহপাঠীরা তার উচ্চারণ শুনে হেসেই মরে যায় যেন। শুরুতে পড়তে ভালোই লাগত। কিন্তু হাসির পাত্রে পরিণত হওয়ার পর থেকে তার আর পড়তে ভালো লাগে না। ছোটজাত বলে তার সঙ্গে কেউ বসতেও চায় না। সে ধীরে ধীরে শেষ বেঞ্চের এমন স্থানে গিয়ে বসতে আরম্ভ করে, দেয়াল না থাকলে যেকোনো সময় ছিটকে পড়লেও পড়ে যেতে পারে শ্রেণিকক্ষ থেকে। স্কুলে যেতে একেবারেই ইচ্ছা করে না। তার চেয়ে বাবার সঙ্গে কাজ করাই ভালো।

বছরের শেষে যেদিন পরীক্ষার ফলাফল বের হলো, সেদিন সব ছেলেই মুখে হাসি নিয়ে ফিরে আসছে। শুধু নুরুর চোখেই জল। ছেলের চোখের জল সহ্য করতে না পেরে পিটার স্কুলে গেল মাস্টার মশাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে। মাস্টার মশাই নুরুর বাবাকেও ছোটজাত বলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল।

মনঃকষ্ট চেপে রাখতে না পেরে পিটার শুধু অসহায়ের মতো বলল, 'তোহারাই পড়াইলু, তোহারাই ফেল করাইলু!' সেদিন মাস্টার মশাই তার কথার তাৎপর্য আদৌ বুঝতে পেরেছিলেন কি না জানা হয়নি। তাৎপর্য খুঁজেই বা তার কী লাভ। গরিবের শিক্ষক শুধু প্রকৃতি আর দুর্যোগই হতে পারে । ওই দিনের পর নুরু আর কখনো স্কুল যাওয়ার কথা বলেনি।

পিটারের বউ পিটারের আগেই মরে গেল চার দিনের জ্বরে। মৃত্যুশোক বেশিদিন সইতে হয়নি তাকে। একদিন দুপুরে বাগানের স্থলপদ্ম গাছটির নিচে তার শীতল শরীর পেয়েছিল চার্চের মালি। পিটারের মৃত্যুর পর তার চাকরিটি নুরুর ভাগ্যে জুটেছিল। বাবার কথামতো সে গরিবের সন্তান গরিবই হয়েছে। বাবা-মা গত হওয়র পর বেশ কিছুদিন একা ছিল সদ্য কুড়ি পেরোনো ছেলেটি। কোন এক বাহাপরব-এ সাঁওতালপাড়ায় গিয়ে হিন্দু ডোমের মেয়ে লক্ষ্মীকে ভালোবেসে বিয়ে করে এনেছিল। বিয়ের পর নুরু একই সঙ্গে চাকরি এবং ঘরছাড়া হলো। এরপর গিয়ে উঠেছিল শ্বশুরবাড়িতে। এখনোর ওখানেই থাকে। সনাতন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। স্বামী-বউতে মিলে উপজেলা কমপ্লেক্সে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করে। তাদের একমাত্র ছেলে রবিন গত মাঘ মাসে পাঁচ পেরিয়েছে। শ্যামবর্ণ হলেও টানাটানা ডাগর চোখ জোড়া ভীষণ মায়াবী। উপজেলার পল্লী বাবু রবিনকে খুব আদর করে। মাঝে মাঝে গাড়িতে চড়িয়ে ঘুরতে নিয়ে যায়, এটা-সেটা কিনে দেয়। কদিন আগে রবিনকে একটা ছবির বই কিনে দিয়ে বলেছেন, পরিষ্কার জামাকাপড় পরে বিকেলে বই নিয়ে তার বাসায় আসতে। রবিন বাবুর কথামতো বই নিয়ে গিয়েছিল। বাবুর বসার ঘরের সোফায় বসে রবিন যখন পড়তে শিখছিল , তখন বাবু তাঁকে জিগ্যেস করলেন, 'রবিন, তুই পড়াশোনা শিখে বড় হয়ে কী করতে চাস?' রবিনের চোখ জোড়া তখন আনন্দে চিকচিক করে উঠল। যেন আর কদিন পরেই সে বড় হতে চলেছে। সে উত্তর দিল, 'বড় হয়ে হামি ডাক্তার হব। (কিছুক্ষণ থেমে) গু-ও সাফ করব।' বাবু হেসে দিলেন রবিনের কথা শুনে। তবে এটাও জানেন, কথাটা বাবার সমান বড় হওয়ার মতোই চিরন্তন। পল্লী উন্নয়ন অফিসের দোতলার সিঁড়ি বেয়ে নেমে বারান্দা দিয়ে হেঁটে আসছিলেন বাবু। নুরুকে দেখে গতি শিথিল করলেন। নুরু মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কপালে হাত তুলে সালাম করল তাঁকে। বাবু জিগ্যেস করলেন, নুরু খেয়েছে কি না। নুরু নিরুত্তাপ। তিনি ওকে দেখেই বুঝেছেন সে অসুস্থ , সারা দিন কাজ করতে পারেনি। তাই পকেট থেকে এক শ টাকার একটা নোট বের করে দিয়ে, কিছু খেয়ে নিতে বললেন। নুরু তার কাছাকাছি এসে হঠাৎ হাত জোড় করে দাঁড়াল। মুখ থেকে তখনো সস্তা মদের গন্ধ আসছে। সে পিটারের মতোই সরল কণ্ঠ বাবুকে বলল, 'বাবু, হামার ছিলেটাকে ভাল ভাষা শিখাবেন,বাবু।' বাবু তাঁকে আশ্বস্ত করে সামনের দিকে এগোলেন। ভালো ভাষার অর্থ তার জানা নেই। অথচ তিনি ভালো ভাষা জানেন বলেই হয়তো এই চেয়ারে বসতে পেরেছেন। না জানি পৃথিবীতে কত জাতি ভালো ভাষা না জেনেই হারিয়ে গেছে, যাচ্ছে। মানুষ বড্ড বিচিত্র প্রাণী। ভাষাকেও কেমন জাত-কুলের নাম দিয়ে ছেড়েছে। পোশাক আর মুখের গড়নেই ভাষার সম্মান। ভাষার নিজেরই যেন কোনো ভাষাই নেই। বাজারি নারীর মতো যৌবনে ভালো আর বয়সকালে অভাবীর মতো শেষ পর্যন্ত কোনোক্রমে টিকে যেতে চায়, কখনো ছোটজাতের সঙ্গে আবার কখনো বড়লোকের মুখে।

লেখক :
আফরিনা ওশিন, শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা