kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৯ বৈশাখ ১৪২৮। ২২ এপ্রিল ২০২১। ৯ রমজান ১৪৪২

সোশ্যাল মিডিয়া : বন্ধু নাকি শত্রু?

অনলাইন ডেস্ক   

১২ নভেম্বর, ২০২০ ১৬:৫৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সোশ্যাল মিডিয়া : বন্ধু নাকি শত্রু?

বর্তমানে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই আমরা স্মার্টফেনের দিকে চোখ রেখে বিভিন্ন আপডেট ও আমাদের বন্ধুদের কাছ থেকে আসা নোটিফিকেশনগুলো দেখে নেই। সকালের প্রথম কাজ হিসেবে এ কাজটা জরুরি হয়ে ওঠে আমাদের কাছে। সকালে নোটিফিকেশনগুলো না দেখলে মনে হয় আমরা পিছিয়ে পড়ছি, অনেক কিছু থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছি। এ প্রেক্ষাপটে বলা যায়, বিগত দশকটি আমাদের সবার জীবনে জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। এ সময়ের মধ্যেই কানেক্টেড থাকার বিষয়টি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনের তালিকায় চলে এসেছে। ধারাবাহিকভাবে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। আর এ কারণে বর্তমান সময়কে অনেকেই ‘সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ’ হিসেবে অভিহিত করছেন। বহু বছর ধরে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম এবং পরবর্তীতে পিন্টারেস্ট, রেডিট এবং টুইচ -এর মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীরা খুব স্বাভাবিকভাবেই এসব প্ল্যাটফর্মের বিভিন্ন কার্যকারিতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন।

বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের সিংহভাগই তরুণ। এ তরুণেরা পরস্পরের সাথে যুক্ত থাকতে এ টুলগুলোর বিভিন্ন দিক উন্মোচনের মাধ্যমে ব্যবহার রপ্ত করছেন। যার ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর ইতিহাসের পথে নানা বাঁক পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১০ সালে আরব বসন্তের কথা।

বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক মানুষ বিনোদন লাভের জন্য সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করছেন। গ্লোবালস্ট্যাটসের তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী ৯৫ শতাংশেরও বেশি মানুষ সাইবার পরিসরে যোগাযোগের জন্য ফেসবুক ব্যবহার করেন; টুইটার ব্যবহারকারী রয়েছেন ২.৪৫ শতাংশ ও পিন্টারেস্ট ব্যবহারকারী রয়েছেন ০.৪৫ শতাংশ। তবে বর্তমানে ব্যবহারকারীদের মাঝে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দ্বিমুখী সক্রিয় মাধ্যম হিসেবে মানুষ সোশ্যাল মিডিয়াকে প্রয়োজনীয় টুল হিসেবে ব্যবহার করছেন। নিজেদের বন্ধু-স্বজন ছাড়াও দেশের এক প্রান্তের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী অন্য প্রান্তের এক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর ভাবনা, সৃষ্টিশীলতা সম্পর্কে জানতে পারছেন; নানাভাবে নিজেকে ঋদ্ধ করছেন। একইসাথে নিজের ভাবনাকেও তুলে ধরছেন অন্য সবার সাথে। নিজের কর্মকাণ্ডকে মানুষের কাছে তুলে ধরতে অনেক ব্যবহারকারী এখন লাইকি, টুইচ, লাইভস্ট্রিম, স্ট্রিমনাউসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন।

সোশ্যাল মিডিয়ার ধরনের প্রতিনিয়ত পরিবর্তন আসছে এবং এ পরিপ্রেক্ষিতেই ছোট দৈর্ঘ্যের ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলোর আবির্ভাব ঘটছে এবং এগুলো জনপ্রিয়তাও লাভ করছে। লাইকি, টিকটক ও ট্রিলি’র মতো অ্যাপগুলোতে বিশ্বজুড়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ সক্রিয় রয়েছেন এবং সম্মিলিতভাবে এ প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবহারকারীর সংখ্যা শত কোটি  ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে তরুণরা নিজেদের সৃষ্টিশীলতা প্রকাশের জন্য ছোট  দৈর্ঘ্যের ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রতি ঝুঁকছেন। এ প্ল্যাটফর্মগুলোতে তারা সৃজনশীলতার দক্ষতা কিংবা তারা যে বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিক মনে করেন সে বিষয়গুলো তুলে ধরতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ইউটিউবের মতোই বিপুল সংখ্যক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী এ প্ল্যাটফর্মগুলোতে কন্টেন্ট তৈরির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছেন। ফলে কনটেন্ট তৈরিকারীরা এখন ইনফ্লুয়েন্সারে পরিণত হচ্ছেন এবং অনেক মানুষ তাদের অনুসরণ করছেন।

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইনফ্লুয়েন্সার ধারণাটি আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরালো হয়েছে। বিপুল সংখ্যক তরুণরা তাদের পছন্দানুযায়ী ব্যক্তিদের অনুসরণ করছে; যা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন ট্রেন্ড তৈরির পেছনে ভূমিকা রাখছে। এ ট্রেন্ডগুলোর মাঝে রয়েছে ফ্যাশন ও ফুড সংক্রান্ত বিষয়; এমনকি বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার বিষয়ে সরব থাকাও এর অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়গুলো তাদের জীবনধারায়ও প্রভাব ফেলছে। কিছু ক্ষেত্রে এ প্ল্যাটফর্মগুলো নেতিবাচকভাবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে অনেক ব্র্যান্ড, ইনফ্লুয়েন্সার ও সাধারণ ব্যবহারকারীরা ইতিবাচকভাবে এ প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবহার করছে, যা নতুন ব্যবহারকারীদের জীবনধারার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

২০১৮ সালে ঢাকার এয়ারপোর্ট রোডে সড়ক দুর্ঘটনায় দুই জন শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘটলে সড়কে নিরাপত্তার দাবিতে তরুণরা সরব হয়, যার সূত্রপাত হয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়া থেকেই। এ ছাড়াও শাহাবাগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তরুণদের হাত ধরে যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল সেখানে সোশ্যাল মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। যে কোনো জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি উঠে এসেছিল। ফেসবুকের #RageAgainstRape কিংবা লাইকির #NoMeansNo ক্যাম্পেইনগুলো এগুলোর ধারাবাহিকতা স্বরূপ। এ বিষয়গুলোই সোশ্যাল মিডিয়াকে শক্তিশালী রূপ দিয়েছে এবং সামনের দিনগুলোতে এ প্ল্যাটফর্মগুলো কলেবর বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

তরুণদের পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার এমনি সাধারণ ব্যবহাকারীরা যখন তুলনামূলকভাবে তরুণদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করবেন তখন তারা যেনো এ মাধ্যমগুলোর নেতিবাচক বিষয়গুলোকে সামনে না নিয়ে এসে ইতিবাচক বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সোশ্যাল মিডিয়াগুলো আইডিয়া শেয়ার কিংবা নিজেকে প্রকাশ করার মাধ্যম। এ প্ল্যাটফর্মগুলোতে কোনো ধরনের বিষয়গুলো শেয়ার করা হবে তা প্ল্যাটফর্মের চেয়ে ব্যবহারকারীর ওপরই নির্ভর করে। পাশাপাশি এ প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে সমাজের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডগুলোকে ও সুস্থ বিনোদনের বিষয়টিকে নিশ্চিত করা।

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর সংখ্যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তরুণরা এ প্ল্যাটফর্মগুলোতে নিজেদের সৃজনশীলতা আগের চেয়ে বেশি করে প্রদর্শন করছেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এ প্ল্যাটফর্মগুলোতে বাংলাদেশের তরুণদের সৃজনশীলতার বিষয়টি খুব স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরুণদের এ প্ল্যাটফর্মগুলোর ইতিবাচক ব্যবহারের বিষয়টি বাংলাদেশের রূপান্তরের পথকে সুগম করবে।

লেখক: রুম্মান আহমেদ, ফ্রিল্যান্সার।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা