kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ কার্তিক ১৪২৭। ২২ অক্টোবর ২০২০। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই দশক মুসলিমদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

মো. রবিউল ইসলাম বাঁধন   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১৬:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই দশক মুসলিমদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

মো. রবিউল ইসলাম বাঁধন।

বিগত দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি তার গতিপথ পরিবর্তন করেছে ‘আক্রমণাত্মক সাম্প্রদায়িকতা’ নামক এক অনাকাঙ্ক্ষিত চলকের মাধ্যমে এবং পরিণাম স্বরূপ বিশ্ব উপনিত হয়েছে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার অনিবার্য পরিণতি ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা’র দ্বারপ্রান্তে। মুসলিমদের জন্য এই দশক কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা অনুধাবনের জন্য এই দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চালকের আসনে থাকা কয়েকটি বিশেষ ঘটনাকে খানিকটা ভিন্ন অঙ্গিকে বিবেচনা করতে হবে। 

১। গত ১৩ আগস্ট ২০২০-এ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের মধ্যে সম্পন্ন হলো “ইসরায়েল-আমিরাত” শান্তি চুক্তি। চুক্তিটিকে “ঐতিহাসিক” আখ্যা দিয়ে বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্টই উল্লেখ করেছেন, “চুক্তির মাধ্যমে দখল অভিযান বাতিল হয়নি, স্থগিত হয়েছে মাত্র” এবং আরব আমিরাতও এই ‘স্থগিত’ শব্দটির বিষয়ে অবগত আছে। সুতরাং দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলা যায় যে, কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থপনের যে গোপন প্রচেষ্টা ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের মধ্যে এতোদিন চলমান ছিল, এই চুক্তির মাধ্যমে তা বৈধতা পেল, “অবৈধ দখল অভিযান স্থগিত”র মতো খোঁড়া যুক্তিতে। 

এদিকে “ইসরায়েল-আমিরাত শান্তি চুক্তি”র রেশ কাটতে না কাটতেই ডোনাল্ড ট্রাম্প, গত ১১ সেপ্টেম্বর আবারও ঘোষণা করলেন “ইসরায়েল-বাহরাইন শান্তি চুক্তি”। যার মানে দাঁড়ালো, ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে কতিপয় আরব দেশের মাঝে চক্ষুলজ্জার যে বরফ এতোদিন জমে ছিল, তা গলতে শুরু করেছে দ্যা গল্ফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের সদস্য দেশগুলোর মাধ্যমে। ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু নিঃসন্দেহে এই কূটনৈতিক সাফল্যগুলোকে আসন্ন নির্বাচনে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন। আর বাড়তি প্রাপ্তি হিসেবে “ইসরায়েল-আমিরাত শান্তি চুক্তি” ইস্যুতে ড্রোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে মনোনয়ন পেয়েছেন ২০২১ সালের নোবেল পুরস্কারের তালিকায়। পুরস্কার ঘোষণা পর্যন্ত কোনো বিশেষ মিরাকল না ঘটলে নোবেলটা তিনি পেয়েও যেতে পারেন। যেভাবে ৩৯তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার পেয়েছিলেন “ইসরায়েল-মিশর” ইস্যুতে। 

যাইহোক সাম্প্রতিক এই শান্তি চুক্তি দুটি যে বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে সেটি হলো “ফিলিস্তিনের আর কতোটুকু ভূমি নিজস্ব রয়েছে?” সহজ সরল উত্তর, মাত্র ১৫ শতাংশ। সুতরাং প্রশ্ন হলো দখল অভিযান আবার শুরু হলে ফিলিস্তিনের নিকট আর কতোটুকু অবশিষ্ট থাকবে এবং আগামী দশকে ফিলিস্তিনি কি জাতিসংঘের কাছে সদস্যপদের জন্য ধর্ণা দেবে, নাকি নিজেদের অবশিষ্ট ১৫ শতাংশ ভূমি রক্ষায় জীবন দেবে? 

আবার এদিকে “আইজেন হাওয়ার ডকট্রিন” যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবকে পরিণত করেছে ঘনিষ্ঠ মিত্রে, ওদিকে ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল’ পুরোনো বন্ধু। সুতরাং সৌদি আরব ও তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্ররা চাইলেও “বন্ধুর বন্ধুকে” তেমন কিছু বলতে পারছে না। বিলাসিতার আতিশয্যে থাকা আরব বিশ্ব এখন “যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল” ব্লকের যেকোনো সিদ্ধান্তকে “সহমত ভাই” বলে শত্রুর ছায়ায় নিজেদের সাময়িকভাবে নিরাপদ ভাবার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে। 

২। সম্প্রতি হায়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরের পর থেকে এরদোয়ানকে নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। উদ্যোগটিকে “সাম্প্রদায়িক” উল্লেখ করে বিশ্লেষকরা বলেন, “আগামী নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক চেতনাকে কাজে লাগাতে এরদোয়ান এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই সাথে মিডিয়া ও কলামিস্টগণ এরদোয়ানের সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ড, দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নানা রকমের বিশৃঙ্খলাকে তুলে ধরছেন। 

তবে এসব লেখালেখি ও গবেষণাতে যে বিষয়টি দৃষ্টিকটু হচ্ছে তা হলো, তুরস্কে “গণতন্ত্র বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে রয়েছে” ধাঁচের বুলিতে পশ্চিমা মিডিয়ার অতি উৎসাহী হয়ে ওঠা। কারণ পশ্চিমা মিডিয়ার এই অতি উৎসাহ একদিকে তুরস্কের বিরুদ্ধে “বৈশ্বিক জনমত” গড়ে তুলছে, আরেকদিকে এটি যুক্তরাষ্ট্রকে সুযোগ করে দিচ্ছে তুরস্কের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে। এরই মধ্যে আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এগিয়ে থাকা ডেমোক্রেট প্রার্থী জো বাইডেন সম্প্রতি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তাঁর তুরস্কবিষয়ক পরিকল্পনাকে চতুর্যপূর্ণ কূটনৈতিক ভাষায় তেমন ইঙ্গিতের মাধ্যমেই প্রকাশ করেছেন। এবং যুক্তরাষ্ট্র এভাবেই মিডিয়াকে ব্যবহার করে টার্গেটেড দেশের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক জনমত গড়ে তোলে। লিবিয়াকে বিধ্বস্ত করার পূর্বেও মিডিয়া গাদ্দাফির বিরুদ্ধে এমন জনমত গড়ে তুলেছিল। একই ধরনের উদাহরণ ইরাকের ক্ষেত্রেও প্রণিধানযোগ্য। কিন্তু গাদ্দাফি বা সাদ্দাম হত্যার পর বর্তমান লিবিয়া ও ইরাক সুখে আছে বা সেখানে গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে এমন প্রমাণ মিডিয়া দিতে পারেনি। 

যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরাক ও লিবিয়ার মতো করুণ পরিণতি তুরস্কের সাথেও ঘটাতে, কারণ সাবেক এই অটোম্যান এম্পায়ারের গলার কাঁটা “লুজান চুক্তি”র মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২৩ সালে। চুক্তিটি শেষ হওয়ার সাথে সাথে তুরস্ক আবারও পরিশক্তি হিসেবে আন্তপ্রকাশ করতে পারে। পরাশক্তি হওয়ার লক্ষণ হিসেবে বসফরাস প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ (লুজান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর), কৃষ্ণসাগরে ৩২০ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাসের মজুদ (উত্তোলন করতে পারবে লুজান চুক্তি শেষ হওয়ার পর), জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য পদে নিজেদের প্রার্থিতা চাওয়া, আফ্রিকায় ব্যাপক বিনিয়োগ, জাতীয় চেতনাকে জাগ্রত করার প্রয়াস ইত্যাদি বিশেষভাবে বিবেচিত হচ্ছে। এ ছাড়াও তুরস্ক যে আবারও মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম, সে বিষয়টিও নিশ্চয়ই যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনার বাইরে নয়। কাজেই “ফিলিস্তিনি দখল” ও “গ্রেটার ইসরাইল” প্রতিষ্ঠায় কোনরূপ বাঁধা পেতে না চাইলে এবং সম্ভাব্য এই পরাশক্তিকে দমাতে হলে সাম্প্রতিক “গ্রিস-তুরস্ক” উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে অথবা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নামে সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই তুরস্কের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করতে চাইবে।

উল্লিখিত ঘটনাগুলো নিরবে ঘোষণা দিচ্ছে যে, ২০২০-২০২৯ দশকটি হবে মুসলমানদের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং একটি দশক। একদিকে ইয়েমেন, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, চীনের উইঘুর, অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু তুরস্ক। এবং দু’দিকেই অবধারিত পরিণতি ‘নির্যাতন’। সামুয়্যেল পি হান্টিংটনের “ক্লাশ অব সিভিলাইজেশন” এ উল্লেখ করা ‘ক্লাশ’ এবং ‘সিভিলাইজেশনগুলো হয়তো সময়ের সাথে দুটো অসমান্তরাল সরলরেখায় চড়ে একই বিন্দুতে মিলিত হওয়ার জন্য ছুটে চলেছে। 

তবে এতো কিছুর ভিড়েও নির্যাতিত এসব মুসলমানদের জন্য ইতিহাস অন্তত দুটি ইতিবাচক ব্যাপার রেখেছে। প্রথমত ইতিহাস কখনো কোনো সম্প্রদায়কে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে একেবারে মুছে ফেলেনি। দ্বিতীয়ত একটু দেরিতে হলেও বিজয়ের পতাকা সবসময় নির্যাতিত গোষ্ঠীই উড়িয়েছে। তা নাহলে পারমানবিক অস্ত্রের এই যুগে ভিয়েতনাম এবং বাংলাদেশ কখনো স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে পারতো না, আমেরিকা কখনো আফগানিস্তানের সাথে সমঝোতায় বসতে বাধ্য হতো না।

লেখক:
মো. রবিউল ইসলাম বাঁধন
লোক প্রশাসন বিভাগ (সাবেক শিক্ষার্থী)
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল: [email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা