kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

কালনীর জলে নিভে যাক যত অশুভ আগুন

শ্যামল কান্তি ধর   

২৪ মে, ২০২০ ১৬:৫১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কালনীর জলে নিভে যাক যত অশুভ আগুন

উজানধল গ্রাম এখন খুব পরিচিত একটি গ্রামের নাম। বাউল শাহ আব্দুল করিমের গ্রাম উজানধল। কালনী নদীর তীরে এই গ্রাম। এই নদীর জলে, এই গ্রামের সবুজ ছায়ায়, হাওড়ের বিস্তীর্ণ প্রান্তরের হাওয়ায় বাউল হয়েছিলেন করিম। এই গ্রামেরই তার শিষ্য রণেশ ঠাকুরের গানের ঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে। এ আগুন তো দেয়া হল বাংলার বাউল চেতনার ঘরে। কিন্তু এই চেতনা, চিন্তা কি আগুনে পোড়ে? রুহি ঠাকুর ও রনেশ ঠাকুর দুই ভাই। তারা সারা জীবনই শুদ্ধভাবে গেয়েছেন করিমের গান। রুহি ঠাকুর বেঁচে নেই। রনেশ ঠাকুর এখনো গেয়ে চলেছেন গান, করিমের গান। তাঁদের পিতা ছিলেন উজান ধলের কীর্তনীয়া। তাদের পাশের বাড়িটাই বাউল শাহ আব্দুল করিমের বাড়ি। তাই স্বাভাবিক ভাবেই গানের প্রতি তাদের অনুরাগ। গ্রহণ করেছিলেন বাউল করিমের শিষ্যত্ব। গানই রনেশ ঠাকুরের ধ্যান,সবকিছু। করিমের সেই গানেরই মত 'আর কিছু চায় না মনে গান ছাড়া'। গানই তার নেশা ও পেশা। তাই বোধহয় গানের জন্য তার আলাদা ঘর, গানঘর। সেই ঘরে রাখা ছিল তার বাধ্যযন্ত্র ও গানের বই। সেই সাধনার গানঘর কেউ জ্বালিয়ে দিতে পারে এটা ভাবাই যায় না। খবরে প্রকাশ, ঘরের একপাশে দুটো ভেড়া ছিল। এগুলো বের করে দিয়ে আগুন ধরানো হয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে যারা আগুন দিয়েছে তাদের খুব ক্ষোভ রয়েছে বাউলের বেহালায়, দোতরায়।

এই উজানধলের আকাশের নিচের কোনো মানুষ বাউলের গানঘরে আগুন দিচ্ছে, এটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যাচ্ছে না, মেনে নেয়া যায় না। বাউল করিম গানের মাধ্যামে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনা, শান্তির বার্তা। তিনি গেয়েছেন খেটে খাওয়া মানুষের গান। গানেই ছড়িয়েছেন প্রেম, ভালোবাসা। তার শিষ্য রনেশ ঠাকুর এই চেতনার ধারক, বাহক। রনেশ ঠাকুরের কণ্ঠেই প্রতিধ্বনিত হয় করিমের সেই গান 'বিপন্ন মানুষের দাবি করিম চায় শান্তির বিধান' কিংবা 'শোষক তুমি হও হুঁশিয়ার'। করিমের গান জনপ্রিয়তার পেছনের রুহি ঠাকুর ও রনেশ ঠাকুরের ভূমিকা অনেক। বাউল এবং তাদের চেতনার সত্যিকারে ধারক ও বাহক সাধারণত নির্বিবাদী মানুষ হন। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে হয় তাদের অবস্থান। রনেশ ঠাকুরকে যারা চেনেন তারা একবাক্যে তা স্বীকার করেন। এমন নির্বিবাদী মানুষের গানঘরে আগুন দিল, ওরা কারা? 

বাউলের দো-তারা, বেহালা পুড়িয়ে ফেলা যায়। জোর করে তাদের চুল কেটে ফেলা যায়। গ্রাম ছাড়া করা যায়। কিন্তু বাউল চেতনা ধ্বংস করা যায় না। বাউল করিমকে গানের জন্য উজানধল ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। কিন্ত আজ উজানধল আর বাউল করিম সমার্থক। রনেশ ঠাকুরের গানঘরে যারা আগুন দিয়েছে তারা যেন এটা ভুলে না যায়।   

উজানধল গ্রামে এখন প্রতি বছর বাউল করিম লোক উৎসব হয়। আধুনিক বাধ্য যন্ত্রে, শব্দ যন্ত্রে, আলোর ঝলকানিতে গীত হয় করিমের গান। চারিদিকে শোভা পায় কর্পোরেট বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের আড়ালে, আলোর ঝলকানিতে যেন হারিয়ে না যায় করিমের গানের মূল বার্তা।

হারিকেনের আলোয় বাউল করিমের উঠানে গানের আসরে যে সুর বার্তা ছড়িয়ে পড়ত, আমরা সেই সুর ধরতে চাই। জোনাকীর আলোয় করিমের গান গেয়ে পথ খুঁজে বাড়ি ফিরত যারা আমরা সেই পথের সন্ধান চাই। বাউল করিমের গানের মূল বার্তা যত প্রচার করা যাবে অনুভব করা যাবে, ততই রুখে দেয়া যাবে যত আশুরিক তৎপরতা। বাউল করিমের গান ছড়িয়ে আছে কালনীর জলে। সে জলে আজো নৌকা বেয়ে চলেছেন নরেশ ঠাকুর। তিনি বিচার পাবেন কিনা জানি না, কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি কালনীর সেই জলেই নিভে যাবে যত অশুভ আগুন।    

লেখক: 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা