kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৪ জুন ২০২০। ১১ শাওয়াল ১৪৪১

করোনা মোকাবেলায় শনাক্তকরণই কি আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ?

ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন   

১১ মে, ২০২০ ১৪:২২ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনা মোকাবেলায় শনাক্তকরণই কি আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ?

দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে করোনা মহামারির পাগলা ঘোড়া! চীনের উহান থেকে অতি সন্তর্পণে এক পা দু পা করে যাত্রা শুরুর পর অল্প সময়ের মধ্যে সারা দুনিয়ায় মরণ-জাল বিস্তার করে সবাইকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে, দুনিয়ার তাবত্ মোড়লদের নাকের পানি চোখের পানি একাকার করে ছেড়েছে। শত্রুকে কখনো হালকাভাবে নিতে নেই। সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়, বিশেষ করে যুদ্ধবিগ্রহে। গত জানুয়ারিতে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা যখন প্রথম করোনা ভাইরাস নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করেন, তিনি বিষয়টিতে অতটা গুরুত্ব দেননি। ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, আমেরিকায় যখন করোনা সবেমাত্র তার থাবা বসাতে শুরু করেছে, ১২ জন রোগী এরই মধ্যে করোনায় আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছে, ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নরদের সঙ্গে এক প্রশাসনিক বৈঠক শেষে বলেন, ‘অনেক মানুষই মনে করছেন এপ্রিল মাসের গরমে ভাইরাসের প্রকোপ চলে যাবে। এপ্রিল মাসে গরম আসে। স্বাভাবিকভাবে এপ্রিল মাসে তা চলে যাওয়ার কথা।’ সেদিন নিউ হ্যাম্পশায়ারে এক সমাবেশে এবং ফক্স নিউজে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারেও ট্রাম্প তাঁর এই ‘গরম তত্ত্বের’ পুনরাবৃত্তি করেন। এর আগে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা করোনাভাইরাসের আক্রমণ মোকাবেলায় প্রেসিডেন্টের সজাগ দৃষ্টি প্রত্যাশা করলে তখনো তিনি নির্দিষ্টভাবে এপ্রিল মাসের কথাই উল্লেখ করে একই রকম আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু, বিধি বাম, মিথ্যা আশা কুহকিনী। এসব অবাস্তব প্রত্যাশা কাজে আসেনি। পরিস্থিতির সময়োচিত ও যথাযথ মূল্যায়নে ব্যর্থতা দেশ ও জাতির জন্য যে কত মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনতে পারে, তা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে ট্রাম্পের আমেরিকা। 

South China Morning Post-এর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি তথ্য সম্ভারের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বর চীনের হুবেই প্রদেশের ৫৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি সর্বপ্রথম এ রোগে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হন। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে চায়না কর্তৃপক্ষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে হুবেই প্রদেশের উহান শহরে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব ঘটছে বলে সতর্কবাণী দেয়। ১১ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে চীনে করোনা সংক্রমণে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। জানুয়ারির শেষের দিকে রোগটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ও আমেরিকায় শনাক্ত হতে শুরু করে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর দিক থেকে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র, ২৩ জানুয়ারি ফ্রান্স, ২৬ জানুয়ারি জার্মানি, ৩০ জানুয়ারি স্পেন, ৩১ জানুয়ারি ইতালি ও যুক্তরাজ্য এবং ১১ মার্চ তুরষ্কে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। তবে, দেশগুলোতে করোনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে মার্চে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশগুলোতে করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ের পর এক থেকে দেড় মাসের মাথায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যায় ব্যাপক উল্লম্ফন ঘটেছে। চীনে যখন উথাল-পাতাল চলছে, ইউরোপ-আমেরিকা প্রস্তুতির জন্য ঢের সময় পেয়েছিল। কিন্তু, নেতৃত্ব আসন্ন বিপদের মাত্রাটা আঁচ করতে ব্যর্থ হয়। উনারা ভেবেছিলেন, এটা ওই চায়নিজদের ব্যাপার-স্যাপার। আমাদের অত গা না করলেও চলবে। দেখুন, এই খামখেয়ালিপনা ও আত্মপ্রসাদের কি চড়া মূল্যটাই না আজ তাদের দিতে হচ্ছে!
ইউরোপ-আমেরিকার তুলনায় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় এখনো পর্যন্ত রোগটির বিস্তার সীমিত। তবে এখনো শেষ কথা বলার সময় আসেনি। রোগটি এখানে এসেছে চায়না থেকে ইউরোপ ঘুরে। হতে পারে, এ দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ভাইরাসটি কিছুটা দুর্বল হয়ে গেছে। এমনও হতে পারে যে এখানকার এ মুহূর্তের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া ভাইরাসটির বিস্তারের জন্য খুব উপযোগী নয়। তবে, অনেকেই আমাদের টেস্টিং সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতার প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করছেন। তাঁদের ধারণা, আক্রান্তের যে সংখ্যা গণমাধ্যমে আসছে তা প্রকৃত চিত্রের প্রতিফলন নয়। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, টেস্টের পরিধি বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্তের সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা যেটুকু বুঝতে পেরেছেন, এ রোগটি খুবই সংক্রামক এবং সংক্রমণের বাহন হিসেবে কাজ করে মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি কিংবা কথা বলার সময় তাঁর শ্বাসযন্ত্র থেকে বেরিয়ে আসা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জলকণা (respiratory droplets)। আপনি যদি তখন ধারে-কাছে থাকেন, এসব droplet শ্বাস নেওয়ার সময় আপনার শ্বাসযন্ত্রে ঢুকে পড়তে পারে। ভাইরাসবাহী জলকণা যদি মেঝে, কাপড়চোপড়, টেবিল-চেয়ার কিংবা অন্য কিছুর ওপর পড়ে, আর আপনি তা হাতে স্পর্শ করেন এবং পরে আপনার নাক, মুখ বা চোখে হাত লাগান, তাহলে এভাবেও আপনি সংক্রমিত হতে পারেন। যেহেতু, এখন পর্যন্ত রোগটির কোনো কার্যকর ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি, এর সংক্রম্যতা অত্যন্ত তীব্র এবং সংক্রমণের পর প্রচুর ভোগান্তি ছাড়াও উল্লেখযোগ্য হারে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে; বিশেষজ্ঞরা এর প্রতিরোধের ওপরই সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করছেন। এ জন্য তাঁরা মূলত দুটি কর্মপদ্ধতি নির্দেশ করেছেন : ঘনঘন সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া (নিদেনপক্ষে, স্যানিটাইজার ব্যবহার করে হাত জীবাণুমুক্ত করা) এবং social/physical distancing অর্থাত্ জনসমাগম পরিহার করা এবং অন্যজনের কাছ থেকে কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখা। একজন করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তি যদি নির্বিবাদে সাধারণ্যে মেশেন, তাহলে তাঁর একজনের কাছ থেকে অনেকেই আক্রান্ত হতে পারেন, তাঁরা আবার আরো অনেককে সংক্রমিত করবেন, পরের জনেরা আরো অনেককে—এভাবে এটি একটি chain reaction-এর মতো চলতেই থাকবে। ফলে, দেখা যাবে, একজন মাত্র ব্যক্তি থেকে শত-সহস্র জনের মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। 
বাংলাদেশ একটি জনবহুল এবং বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। বিশ্বের বাঘা বাঘা দেশগুলো, যেখানে স্বাস্থ্যব্যবস্থা অনেক শক্তিশালী, যখন করোনা সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর তা মোকাবেলা করতে নাকানিচুবানি খাচ্ছে, তখন আমরা তেমন পরিস্থিতিতে এটি সামাল দিতে পারব, তেমনটি আশা করা বাতুলতা মাত্র। উন্নত দেশগুলোয় ভেন্টিলেটরের স্বল্পতা উচ্চ মৃত্যুহারের অন্যতম প্রধান কারণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। এখানে আমাদের technical hand, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও স্থাপনা সব কিছুরই বিপুল ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে এ দেশে mass level-এ যদি সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হতে পারে। বহু মানুষ বিনা চিকিত্সায় ধুঁকে ধুঁকে মরবে। কাজেই, আমাদের সামনে যেকোনো মূল্যে সংক্রমণের বিস্তার ঠেকানোর কোনো বিকল্প নেই। 
করোনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তা manage করা আমাদের জন্য দুরূহ হয়ে দাঁড়াবে। এ জন্য ঠেকানোই আমাদের জন্য একমাত্র এবং উত্তম বিকল্প। এতদুদ্দেশ্যে, সরকার যে স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং প্রয়োজন মতো বিভিন্ন এলাকা লকডাউন করছে তা যথার্থ। কিন্তু, আমাদের মতো একটি দুর্বল অর্থনীতির দেশে, যেখানে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী দিন আনে দিন খায়, এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। অনেকেই হয়তো ভাবছেন, মাসখানেকের মধ্যে সংক্রমণের প্রকটতা স্তিমিত হয়ে আসবে; খোদা করুন, তেমনটি হলে ত আমাদের সবার জন্যই আনন্দের বিষয় হবে। কিন্তু, আমাদের বিবেচনায় রাখা দরকার, বাস্তবে তেমনটি নাও হতে পারে। সুতরাং, আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, ব্যাপক testing-এর মাধ্যমে করোনায় সংক্রমিত প্রতিটি ব্যক্তিকে শনাক্ত করা। এটি একটি দুরূহ লক্ষ্য এবং বর্তমানে RT-PCR-এর সাহায্যে যে পদ্ধতিতে testing হচ্ছে তাতে এ লক্ষ্য অর্জন প্রায় অসম্ভব। আমাদের RT-PCR-এর সংখ্যা ও test সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাবের স্বল্পতা আছে, sample collection ও testing-এর জন্য দক্ষ জনবলেরও অপ্রতুলতা আছে। যদিও এ মুহূর্তে IEDCR ছাড়াও বেশ কিছু হাসপাতালে test হচ্ছে এবং দেশের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ও সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছে, তথাপি বিভিন্ন জায়গায় sample-এর স্তূপ জমছে বলে রিপোর্ট আসছে। Testing-এর sample হিসেবে nasopharyngeal swab collection-এর বিষয়টিও জটিল ও নিপুণ হাতের কাজ। Collection-এর সময় সংগ্রাহক নিজেরও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। Sample collection-এর পর যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা না হলে ভুল রিপোর্ট আসতে পারে। সর্বোপরি test সময়সাপেক্ষ। এসব কারণে এই testing procedure যতই নির্ভুল ও কার্যকর হোক না কেন, সারা দুনিয়ায় তুলনামূলকভাবে সহজ ও কম সময়সাপেক্ষ পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য কাজ চলছে। গত কিছু দিনে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় এ ধরনের প্রচেষ্টার রিপোর্ট এসেছে, তা নিশ্চয়ই আপনাদের দৃষ্টি এড়ায়নি। 

লেখক : অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, জাবি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা