kalerkantho

রবিবার । ২১ আষাঢ় ১৪২৭। ৫ জুলাই ২০২০। ১৩ জিলকদ  ১৪৪১

অতিরিক্ত সচিবের মৃত্যু : যা বললেন কুর্মিটোলা হাসপাতালের আইসিইউ প্রধান

শাহজাদ হোসেন মাসুম   

১১ মে, ২০২০ ১৩:২৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অতিরিক্ত সচিবের মৃত্যু : যা বললেন কুর্মিটোলা হাসপাতালের আইসিইউ প্রধান

ব্যাক্তিগত কারণে কিছুটা স্ট্রেসড সময় পার করছি। কথা বলার ইচ্ছা কমে গেছে। তাছাড়া আগে থেকেই অভিযোগের উত্তর দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ তা অর্থহীন। কোন লাভ হয়না। সবাই সবকিছু নিজের মতই বিশ্বাস করেন। তবু কয়েকটা কথা বলতেই হচ্ছে। কারন আমি নিজেই সরাসরি ব্যাপারটায় জড়িত।

দুইদিন থেকে একটি খবর নেটে ভাইরাল হয়েছে। অনেকেই আমাকে ইনবক্স করেছেন, নিজের টাইমলাইনে বন্ধুরাও শেয়ার করছেন। খবরটি সর্বতোভাবে সত্যি হলে আসলেই সেটা খুবই আপত্তিজনক।

সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যিনি দীর্ঘদিন থেকে কিডনি সমস্যায় ভুগছিলেন, জটিলতা দেখা দিলে তিনি এইসময়ে চেষ্টা করেও হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হতে পারেননি। সর্বশেষ কুর্মিটোলায় ভর্তি হন এবং আইসিইউতে না নেওয়ার কারণে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর কন্যা একজন সরকারি চিকিৎসক। একজন চিকিৎসকের পিতা এবং একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মৃত্যুতে আমি আন্তরিকভাবে সমব্যাথী। জীবনে এইটুকু অর্জন সহজে তিনি করতে পারেননি। রাষ্ট্রের কাছে তার প্রত্যাশা এবং প্রাপ্যতা অন্যদের থেকে বেশি।

অন্য হাসপাতালগুলোর কথা আমি জানিনা। আমি কুর্মিটোলার ব্যাপারে দুয়েকটি কথা বলতে চাই। গভীর রাতে তিনি কুর্মিটোলা হাসপাতালে পজিটিভ রোগি হিসাবে ভর্তি হন। কেবিন খালি না থাকায় তাঁকে প্রথমে ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। সেই রাত্রেই পরিচালক মহোদয় প্রাধিকারের কারনে প্রথম খালি কেবিনে তাঁকে শিফট করার ব্যাবস্থা করেন। পরদিন সন্ধ্যায় তাঁর কন্যার কাছ থেকে জানা যায়, প্রকৃতপক্ষে তাঁর কোভিড টেষ্ট করা হয়নি। পরদিন সকালে তাঁর স্যাম্পল সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠানো হয়। সেদিন ছিল শুক্রবার।

সেদিন সন্ধ্যায় রাউন্ডের সময় মেডিসিন কনসালট্যান্ট সিদ্ধান্ত নেন তাঁকে আই সি ইউতে শিফট করা প্রয়োজন। তিনি তাঁর কন্যাকে এটি জানান। এবং আই সি ইউতে কল পাঠান। একই সময় ওয়ার্ড থেকে একজন সাধারন রোগির জন্য আই সি ইউতে কল আসে যার অবস্থা খুব খারাপ। আই সি ইউতে তখন আর মাত্র একটি বেড খালি আছে। আই সি ইউর এম ও আমাকে দুটি রোগি সম্পর্কেই বিস্তারিত জানান। আমি সিদ্ধান্ত নেই ওয়ার্ডের রোগিকে নেওয়ার জন্য এবং প্রথম বেড খালি হওয়ার সাথে সাথে কেবিনের রোগিকে নেওয়ার জন্য। পাঁচ মিনিটের মাঝেই এম ও আমাকে আবার ফোন করে জানান, স্যার মেডিসিনের কনসালট্যান্ট জানিয়েছেন কেবিনের রোগিকেই নিতে, উনি একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। আমি পরিস্থিতি বিবেচনা করি। এবং মেডিসিনের কনসাল্ট্যান্টকে জানাই সিদ্ধান্ত তাঁকে নেয়ার জন্য, যেকোন একজনকে সিলেক্ট করার জন্য। আমরা যেকোন একজনকেই নিব। আমরা অপেক্ষা করছি। কিছুক্ষন পর তিনি জানান, কেবিনের রোগি আই সি ইউ তে শিফট হতে রাজি নন। তারা টেস্টের রিপোর্ট দেখে সিদ্ধান্ত নিবেন। কারণ আইসিইউর সব রোগি পজিটিভ। রোগির কন্যা রিস্কবন্ড সই করেছেন (যা রোগির ফাইলে এখনো সংরক্ষিত আছে)। পরদিন সকালে পরিচালক মহোদয় তাঁকে ডায়ালাইসিসে পাঠানোর ব্যাবস্থা করেন। কিন্তু সেখানেও সব রোগি পজিটিভ হবার কারনে তাঁরা অপেক্ষার সিদ্ধান্ত নেন। দুপুরে তাঁর অবস্থার অবনতি হয় এবং তিনি মৃত্যু বরণ করেন। সেইসময় পরিচালক মহোদয় নিজেও কেবিন প্রিমিসিসে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের আরো কিছু অভিযোগ আছে, সেসব নিয়ে কিছু বলবো না, আগে অন্যখানে বলেছি।

প্রতিটি মৃত্যুই চিকিৎসকের পরাজয়, একটি পারিবারিক, মানবিক বিপর্যয়। আমি ব্যাক্তিগতভাবে বর্তমান সময়ে গভীরভাবে বিপর্যস্ত। আমার কাছে মনে হয় চলমান এই বিপর্যয়কে ঠেকানোর জন্য আমাদের একটা জিনিষেরই প্রয়োজন ছিল, একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যাবস্থাপনা। যা তৈরির দায়িত্ব ডাক্তারদের হাতে কখনোই ছিলনা। এই বিষয়ে আর কিছু বলবো না। শুধু একটা জিনিষ জানুন। এখন পর্যন্ত আমাদের কয়েকটি কোভিড এবং কয়েকটি ননকোভিড হাসপাতাল আছে। শুরু থেকেই মধ্যবর্তী রোগিরা হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে মারা যাচ্ছেন। এই রোগির ক্ষেত্রেও শুরুতে তাই হয়েছে। আজও পর্যন্ত সাসপেক্টেড রোগিদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোন ব্যাবস্থা হয়নি। আপনারা দোষ ডাক্তারদের দিয়েই ফেইসবুকের পরবর্তী ইভেন্টে ব্যাস্ত হয়ে যাচ্ছেন। সমস্যাটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।

যান, অসুবিধা নেই। শুনেছি রাস্তায় রাস্তায় জ্যাম। বাজার জমজমাট। গতকাল আড়ংএর ম্যাসেজ পেলাম। জেনে রাখুন কোভিড হাসপাতালগুলো লড়াইএর শেষ সীমায় আছে। আমাদের চিকিৎসক নার্স ওয়ার্ডবয়রা নিজেদের ইনফেক্টেড হওয়া থামাতে পারছেন না। প্রতিটা হাসপাতাল রোগির ভারের শেষ সীমায়। গতকালের নতুন ইনফেকশানের সংখ্যা দেখেছেন। আপনারাই বলেন এই সংখ্যাটা শুধু একটা ফ্র্যাকশান। এরপর আর গালিতে হবেনা। লাঠি নিয়ে এসে ডাক্তার নার্স পিটিয়ে যাবেন। তবু যদি আর দশদিন পর হাসপাতালগুলো আপনাদের চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতায় থাকে। সারাজীবন শুধু অন্যের দোষ ধরে গেছেন নাগরিক হিসাবে নিজের দায়িত্ব পালনে চূড়ান্ত অনাগ্রহ। বাঙ্গালী লাইনে দাঁড়ালে মনে করে ইজ্জত শেষ। ফোন পেয়ে কেউ তাঁকে স্যার স্যার করে লাইন থেকে বের করে নিয়ে বিশেষ সার্ভিস দিবে, এই এ্যাটিচুড নিয়ে চলা বাঙ্গালির আজকে সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া সারাজীবনের সবচেয়ে বড় অপমান। এই অপমানের রিপার্কাশান খুব নীরব হবেনা। আমরা যারা সরকারী হাসপাতালে কাজ করি এইসব আমরা জানি।

তবু সবার মঙ্গল কামনা করি। এনেসথেশিয়া যাঁর কাছে শিখেছি, জীবনের নানা প্রয়োজনীয় দর্শন যাঁর কাছ থেকে নিয়েছি সেই প্রিয়জন কোভিড পজিটিভ। তিনি প্রিয় শিক্ষক, প্রিয় ভাই, প্রিয় স্বজন। আল্লাহর কাছে তাঁর জন্য প্রার্থনা করি। জানিনা কখন নিজেরও এই সময় আসে। ভয় কি শুধু এই দেশে ডাক্তারদেরই!

শাহজাদ হোসেন মাসুম

আইসিইউ প্রধান, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা