kalerkantho

রবিবার । ২১ আষাঢ় ১৪২৭। ৫ জুলাই ২০২০। ১৩ জিলকদ  ১৪৪১

‌প্রণোদনা দিয়ে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোকে বাঁচান

জিএম নিজাম উদ্দিন    

১ মে, ২০২০ ২০:৪৭ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‌প্রণোদনা দিয়ে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোকে বাঁচান

করোনা মহামারিতে সঙ্গনিরোধে থাকার এই সময়ে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের অভিভাবক, ছাত্র/ছাত্রী, শিক্ষক ও মালিক পক্ষ একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি! শিক্ষা বর্ষের শেষপ্রান্তে এসে স্কুলগুলো সিলেবাস শেষ করা, বার্ষিক পরীক্ষা নেয়া, ফলাফল ঘোষণা করা, শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নীত করা এবং নতুন সেশন শুরু করার জন্য ব্যাপক প্রস্তূতি নিয়ে ভালোভাবে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু করার মতো এক বিরাট একাডেমিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অন্যদিকে বাড়ি ভাড়া ও শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন দেয়ার জন্য স্কুলগুলো আর্থিক সঙ্কটে পড়ার কারণে এক অগ্নি পরীক্ষার সম্মুখীন।  

একাডেমিক চ্যালেঞ্জটা শিক্ষক ও অভিভাবকদের কর্মতৎপরতা ও আন্তরিকতার কারণে ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলো বেশ ভালোভাবেই সামলে নিয়েছে; কিন্তু আর্থিক সমস্যাটা সবাইকে বেশ ভালো বিপদে ফেলেছে। এর কারণ হচ্ছে বেশিরভাগ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল চলতি আয়ের ওপর নির্ভরশীল।

কয়েক বছর আগের এক সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলো মাসিক বেতন ছাড়া অন্য কোন ফি যেমন বার্ষিক বা উন্নয়ন খাতের কোন ফি নিতে পারছে না। এর ফলে এই জাতীয় বিদ্যালয়গুলোর কোনো সঞ্চয় নেই। অনেকটা দিন আনে দিনে খায় অবস্থা। সরকারি ও স্বায়ত্ব শাসিত সংস্থা, সেনাবাহিনী বা কোন কর্পোরেট হাউজ পরিচালিত স্কুল ছাড়া বাকিরা ছাত্র ছাত্রীদের দেয়া মাসিক বেতন না পেলে চলতে পারে না। বাংলা মাধ্যম স্কুলে যেমন শিক্ষকের বেতন ও উন্নয়ন খরচ সরকার বহন করে কিন্তু এসব ব্যক্তি খাতের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর সব খরচ বহন করার একটাই উৎস - আর তা হচ্ছে ছাত্র ছাত্রীদের দেয়া মাসিক বেতন।

করোনা মহামারীর কারণে গত মার্চ মাসে সরকারি সিদ্ধান্তে হঠাৎ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেলে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো কম পক্ষে দুইমাস ধরে ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে মাসিক বেতন নিতে পারছে না। কিন্তু অনলাইন ক্লাস নিয়ে সিলেবাস শেষ করে দিচ্ছে, শিক্ষকরা রাতদিন খেটে টেকনোলজির ব্যবহার শিখে নতুন নতুন কৌশলে ছাত্র ছাত্রীদের পড়াচ্ছে এবং মে বা জুন মাসে শিক্ষা বর্ষ শেষ করে জুলাই মাসে নতুন সেশন শুরু করার প্রস্তূতিও বেশ ভালো ভাবেই নিচ্ছে। কিন্তু বিদ্যালয়গুলো শিক্ষকদের বেতন দিতে পারছেনা বা দিতে দেরি হচ্ছে। এতে করে শিক্ষক ও কর্মচারীরা পড়েছে বেশ বিপদে। 

প্রাইভেট ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষকরা মাত্রারিক্ত ভাবে বেতন নির্ভর। তার কারণ বেশিরভাগ স্কুল থেকে তারা বেতন ছাড়া প্রভিডেন্ট ফান্ড বা অন্যকোনো ভাতা পায় না। আবার তাদের মাসিক বেতনটাও যে খুব উল্লেখ করার মতো ভালো কিছু তাও না। সে কারণে অনেক শিক্ষক প্রাইভেট পরিয়ে ঘাটতি পুষিয়ে নিতেন। এখন শিক্ষকদের বেতন আর প্রাইভেট টিউশন থেকে আসা আয় দুটোই একসাথে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা বেশ বিপদের মধ্যে পড়েছেন। কিন্তু অনলাইন স্কুল চালু থাকায় তাদের পরিশ্রম কমেনি বরং বেড়েছে । বাড়ি ভাড়া আর সংসারের খাবার খরচ মেটাতে তারা কারও কাছে এই মুহূর্তে হাত পাততেও পারছেন না। ধার দেনা পাওয়ারও কোন সুযোগ নেই এই দুর্যোগময় সময়ে। ফলে শিক্ষক কর্মচারীরা অভাবে ঘিরে ধরা বর্তমানের ধাক্কায় এবং অন্ধকারময়  এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত আর বিভিষিকাময় দিন গুণতে শুরু করেছেন এরই মধ্যে।

এই বিপদের দিনে শিক্ষকদের পাশে থাকার জন্য স্কুলগুলো অভিভাবকদের শরনাপন্ন হলে শুরু হয় বিপত্তি। অনেক অভিভাবক এই আপদকালে স্কুলের বেতন দিতে দ্বিধা বা অসস্থি বোধ করছেন। অবশ্য এর পেছনে কিছু কারণও আছে। যেহেতু ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলো শুধু মাত্র অভিভাবকদের দেয়া বেতনের ওপর নির্ভরশীল কাজেই এসব স্কুলে বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলো থেকে মাসিক বেতন একটু বেশিই দিতে হয়। আবার এই দুর্যোগময় মুহূর্তে অনেক অভিভাবকের (চাকরীজীবি, পেশাজীবী বা ক্ষুদ্র কিংবা মাঝারি ব্যাবসায়ী) আয় বন্ধ হয়ে গেছে; কিন্তু ব্যয় কমেনি। এসব স্বল্প আয় বা চলতি আয়ের উপর নির্ভরশীল অভিভাবকগণ এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অজানা আশংকায় তাদের সঞ্চয় থেকে পরিবারের ভরণপোষণের বাইরে আর অন্য খরচ করতে চাচ্ছেন না। 

করোনা মহামারী যদি আরও প্রলম্বিত হয় তাহলে জীবন ধারণের বিপরীতে সন্তানের শিক্ষার খরচটা অনেক অভিভাবকের কাছে বিলাসিতা এখন হয়তো মনে হচ্ছে। স্বল্প আয়ের অনেক অভিভাবকের কাছে স্কুলের বেতন চাওয়াটা এই সময়ে বেশ বিরক্তিকর, অযোক্তিক, বাড়তি যন্ত্রনা বা ভীতিকর কিংবা অমানবিক বলেই মনে হচ্ছে।

এই অস্বস্তিকর অনিশ্চিত যাত্রা থেকে বাঁচার পথ এখন দুটি। এক. বিত্তবান বা স্বচ্ছল অভিভাবকদের এগিয়ে এসে নিয়ম অনুযায়ী বেতন ভাতা পরিশোধ করা। দুই. বেতন ভাতা ও বাড়ি ভাড়া পরিশোধের জন্য স্কুলগুলোকে সরকারি সহায়তা বা প্রণোদনা প্রদান করা।  

দেশের এই দুর্যোগ কালে সবাইকে মানবিক ও সহনশীল আচরণ করতে হবে। অন্তরকে উদার করে খোদার উপরে ভরসা করে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে হবে। সন্তানের শিক্ষক না খেয়ে মারা যাক, বাড়িওয়ালার কাছে সম্মান হারাক কিংবা অসহায় মানবেতর জীবন যাপন করুক এটা কোন অভিভাবকের কাম্য হতে পারে না। একইভাবে পাওনা টাকা আদায়ের জন্য দুর্যোগকালে স্কুলগুলোকেও কসাই বা কাবুলিওয়ালা হলে চলবে না।

প্রাইভেট সেক্টর এডুকেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে অভিভাবকগণ ও বিদ্যালয়গুলো সরকারের ওপর থেকে শিক্ষাব্যয়ের চাপ কমিয়ে দিয়েছেন। তাই দেশের এই আপদকালে সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে অভিভাবক ও স্কুলগুলোর পাশে দাঁড়ানো; তাদের বোঝা লাঘব করে দুশ্চিন্তা দূর করা। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা একজন অসীম সাহসী বিশাল হৃদয়ের বিচক্ষণ সরকার প্রধান; একজন বিজ্ঞ ও মানবিক রাজনীতিবিদ; মমতাময়ী মা, মানবতার জননী ও আপদকালীন সময় দক্ষতার সাথে পাড়ি দেয়ার জন্য পারঙ্গম একজন চৌকষ বিশ্বনেতা। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সকল ছাত্র/ছাত্রী, তাদের অভিভাবক, শিক্ষক ও পরিচালকদের পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবিনয় অনুরোধ, এই দুঃসময়ে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোকে আর্থিক সহায়তা বা প্রণোদনা প্রদান করুন। যাতে শিক্ষক কর্মচারীরা সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন আর  আমাদের কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ শিক্ষা জীবন চলমান থাকে। 

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল অ্যাসোসিয়েশন (বেমসা); হেড অব স্কুল, গ্রিন জেমস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ঢাকা।

 

*** মতামত লেখকের নিজস্ব, কর্তৃপক্ষের নয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা