kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৯ বৈশাখ ১৪২৮। ২২ এপ্রিল ২০২১। ৯ রমজান ১৪৪২

করোনা মহামারি ও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য

স্বপন নাথ   

১৫ এপ্রিল, ২০২০ ১৪:২৯ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



করোনা মহামারি ও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য

করোনা মহামারি চিন থেকে শুরু হয়ে গোটা মানবসমাজকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। যে খবরগুলো আমরা দেখতে দেখতে হা হুতাশ করছিলাম। এখন আমরাও সেই বিপর্যয়ের অংশীদার। রোগ-ব্যাধী, মহামারি পৃথিবীতে এর আগেও কয়েকবার এসেছে। বিভিন্ন সময়ে মানুষকে বিচ্ছিন্ন ও সঙ্গহীন থাকতে বলা হয়েছে।কিন্তু কখনও এত দ্রুত আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যু মানুষ দেখেছে বলে মনে হয় না।এ পর্যন্ত সকল মহমারি থেকে করোনা (Covid 19) ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া ব্যতিক্রম। অন্য যে কোনো ভাইরাসের চরিত্র, এর গতিপ্রকৃতি বিজ্ঞানীরা নির্ণয় করতে পেরেছেন; করোনাকে মোটেও নাগালে আনতে পারেননি। হতবাক করে দিয়ে তা বিস্তৃত হয়ে গোটা মানবজাতিকে নাকাল বানিয়ে দিয়েছে। 

এ নিয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে ব্যাপক তর্ক বিতর্ক চলমান। যা জল্পনা কল্পনা হোক না কেন এর বৈশিষ্ট্য কেউ ধরতে পারছেন না এটাই বড় কথা। করোনা প্রতিরোধে শুধু এটুকু বলতে পেরেছেন যে সঙ্গনিরোধ, সামাজিকতাহীন অবরুদ্ধ থাকতে হবে। এর ফলে, কোনো ব্যক্তি আক্রান্ত হলে অপরকে সংক্রমণ করার সুযোগ থাকবে না। এজন্য বিশেষ ব্যবস্থায় বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। 

সাধারণত, পশ্চিমাবিশ্বে সামাজিকতা বলতে কিছু নেই। ওরা এসবের ধারও ধারে না। কিন্তু বাঙালি এত বেশি সামাজিক, এ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলে, এ বিচ্ছিন্নতা মানতে চাইবে না এটাই স্বাভাবিক। তবে এখন করোনো ইস্যু সামাজিকতা বিষয়ে বাঙালি ও বাংলাদেশের মানুষকে নতুন করে ভাববার সুযোগ করে দিয়েছে। আরেকটি বিষয় হলো আইসোলেশন, কোয়ারেনটাইন, সেলফ-কোয়ারেনটাইন, সোস্যাল ডিসট্যান্স, লকডাউন এসব শব্দ অভিধানে থাকলেও এদেশের জনসমাজে এর আগে ব্যাপকভাবে প্রচলিত নয়। প্রথমে এসব শব্দ নিয়ে কিছুটা ঝামেলাও তৈরি হয়েছিলো।আস্তে আস্তে করোনা মহামারি ব্যবস্থাপনা ও পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে সকলে। 

সামাজিক দূরত্ব, কোয়ারেনটাইন ব্যবস্থাপনা এ সময়ের উপযোগী হলেও এর ফলে মানুষ আর মানবিক জায়গায় থাকছে না। কারণ, বেঁচে থাকার বিষয়টি সামনে চলে আসায় সকলে সেভাবেই সামাজিক আচরণ নির্ধারণ করছেন।আইসোলেশন, সামাজিক দূরত্ব বাস্তবায়ন ও পালন করতে অন্য দেশসমূহের মতো বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হয়েছে। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী ১৯০টি দেশের ১.৫ বিলিয়ন শিক্ষার্থী এখন প্রতিষ্ঠান বিচ্ছিন্ন ও বাড়িতে অবস্থান করছে।এর ফলে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ঘরে থাকতে হচ্ছে। তারা এখন খেলার মাঠে বা বাইরে যেতে পারছে না। কোনো বন্ধু বা সহপাঠীর সাথে সময় কাটাতে পারছে না। ক্ষেত্র ও অবস্থা বিবেচনায় শুধু ভার্চুয়াল যোগাযোগ চলমান রয়েছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার সাথে সংস্কৃতিচর্চা, আড্ডা, হৈচৈ, খেলাধুলা করে আনন্দের সাথেই শিক্ষার্থীদের সময় কাটতো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বন্ধুদের সাথে আড্ডা থেকে বঞ্চিত হওয়ার সাথে বাইরের কার্যক্রম থেকেও তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ঘরে থাকতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে, ইচ্ছে হলে বা সুযোগ থাকলেও একটু সময়ের জন্য ঘরের বাইরে যাওয়া যাচ্ছে না। মোটকথা কোনো সংযোগই রাখা যাচ্ছে না। এখন একমসাত্র ভরসা আছে টেলিফোন ও ইন্টারনেট। তবুও মানুষের মূর্ত উপস্থিতি যখন না থাকে তখন কত আর ভাব বিনিময় করা যায়। ফলে ভাবের আদানপ্রদানও বন্ধ হয়ে গেছে।

এখন শিক্ষার্থীদের কাছে বিনোদন, আনন্দ বলে কিছু নেই।মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত হলে গণমাধ্যমের বদৌলতে সময় পার করে দেবে। যারা হতদরিদ্র, যোগাযোগের সমস্যায় গণমাধ্যম বা কোনো প্রাযুক্তিক সুযোগ সুবিধা যাদের নেই, তারা এসময়ে কি করবে? 

এ সংকটে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘকালিন ক্ষতির সম্ভাবনা বিবেচনায় অনলাইন পাঠদান শুরু হয়েছে। যেটুকু জানা যায় শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে গ্রহণ করেছে ও উপকৃত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থীর অভিমত আমরা শুনেছি। তারা ইতিবাচক কথা বলেছেন। 

তবে আমরা সবাই জানি, শিক্ষা, জ্ঞান অর্জন শুধু পাঠদানের উপর নির্ভর করে না। পরস্পর মিথষ্ক্রিয়া বলে একটা কথা আছে। এখন এটা হচ্ছে না। বাইরের আলোবাতাসে তারা দৌড়াদৗড়ি করছে না। ক্লান্ত হচ্ছে না। যা-কিছু শিক্ষারই অংশ। গৌণ কাজগুলোই মূল শিক্ষাকে প্রণোদিত করে এবং রাষ্ট্র ও সমাজে দায়বদ্ধ হতে শেখায়। মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনে নিজের প্রস্তুতিকে সহায়তা করে। লক্ষণীয়, বহির্জাগতিক নানা বিষয়ে কোনো না কোনো শিক্ষার্থীকে প্রায় প্রতিদিন নানারকম দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হতে হয়। যা কিছু মোকাবেলা করতে করতে তারা সমাজবৈশিষ্ট্যের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়। ফলে, আমরা যা প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন থেকে শিখি এর চেয়ে বেশি শিখি বহির্জাগতিক বাস্তবতা ও প্রকৃতি থেকে।

করোনা সমস্যার কারণে তারা এ জীবনবাস্তবতা ও প্রকৃতি থেকে এখন বিচ্ছিন্ন। তা দীর্ঘ হচ্ছে বলেই সমস্যা। ভাইরাসজনিত ছুটির ফলে শিক্ষার্থীদের অপ্রত্যাশিত ঝামেলা অবলোকন ও অতিক্রম করতে হচ্ছে।স্বভাবতই এসব শিশু-কিশোর-তরুণরা ট্রমায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পৃথিবীর মহামারির বাস্তবতা, মানুষের দুঃখ, কষ্ট, দহনের দৃশ্যাবলি দেখে অনেকে হতাশায় নিমজ্জিত হতে পারে। আমরা লক্ষ করেছি- পীড়াদায়ক ঘটনার চাপে সাধারণ ব্যক্তি-মানুষের মধ্যে মনোদৈহিক যন্ত্রণা তৈরি হয়। তবে সকলের পক্ষে একইভাবে ঘটনার ঘাত সামলানো সম্ভব হয় না। যেক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি গভীর বাস্তবতায় মানসিক যন্ত্রণা অনুভব করে। এবং এ থেকে সৃষ্টি হয় উদ্বেগ, বিমর্ষতা, ক্রোধ, অপরাধবোধ, বিষণ্নতার। ফলত, সে তার চারপাশে কোনো কিছুতে বিশ্বাস রাখতে পারে না। নিজেকে ভাবে অবনমিত এক সত্তা।এ থকে শারীরিক কিছু অসংগতিও শুরু হয়। এ বিষয়কেই আমরা বলি ট্রমা। 

এ ট্রমা ছাড়াও মনোবিজ্ঞানী ও আচরণবিজ্ঞানীরা সংগনিরোধ ও সামাজিক দূরত্ব থেকে সৃষ্ট বিষণ্নতা, ভয় আতঙ্ক, বিরক্তিবোধ, ক্রোধ, বিচ্ছিন্নতা, নৈঃসঙ্গ, অবহেলা, অবনমন, নিরর্থকতা ভাবনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। যা থেকে মানুষের মধ্যে অনিদ্রা, অনীহা, বিরোধ, অবসন্নতা, অসুস্থতা ইত্যাদি তৈরি হয়। ট্রমাসহ এ-সবই হতে পারে এ কারণে যে, করোনা মহামারি মানবসভ্যতাকে অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে গেছে। এ থেকে সকলের মনেই প্রশ্ন জেগেছে যে, মানবগোষ্ঠী ধ্বংস হতে যাচ্ছে কি না। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিদ্যমান পরিস্থিতি ও বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করছে শিক্ষার্থীরা। 

কেউ কারোনায় অসুস্থ হলে এমনিতেই চিকিৎসা পদ্ধতি অনুযায়ী তাকে আলাদা করা বাধ্যতামূলক। আপনজন বা কোনো শুভার্থী রোগীর কাছে যাবারও সুযোগ নেই। শুধু সুস্থ হলে আবার ফিরে আসবে আপনজনের কাছে। কিন্তু মারা গেলে আর কেউ দেখারও সুযোগ থাকে না। এমন নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি এখন আমরা। 

চারদিকে শুধু সংক্রমণ আর মৃত্যু। এসব মানুষ এখন সংখ্যায় পরিণত হয়েছে।কারও মনে শুভ বিবেচনাবোধ থাকলেও মানবতা দেখাতে পারছে না। রাস্তায় মানুষের লাশ পড়ে থাকছে কেউ কাছে আসছে না, রীতি অনুযায়ী দাফন করা হচ্ছে না। আত্মীয়-স্বজন কেউ মৃত্যুভয়ে লাশের কাছে আসে না।মা বাবার প্রতি সন্তান আর সন্তানের প্রতি বাবা-মা কেউই ভালোবাসা দেখাতে পারছে না।বাস্তবতা এমন জায়গায় নিয়ে মানুষকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। 
এ অনিশ্চিতি ও নিরাপত্তাহীনতায় শিশু কিশোর তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকির পর্যায়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। যা আমরা এ দুঃসময়ে হয়তো খেয়াল করছি না। এর মধ্যে জানা গেছে-করোনার আঘাত দুনিয়াতে অনেক পরিবর্তনের সূচনা করবে। একইসাথে করোনার প্রভাব কতদূর কীভাবে থাকবে তা কিন্তু কেউ বলতে পারছে না। করোনায় প্রচুর প্রাণহানি ঘটছে এবং ব্যবসা বাণিজ্য, একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রচুর মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে।সকল রাষ্ট্র সর্বশক্তি নিয়োগ করেও কোনো কূলকিনারা করতে পারছে না। 

জীবনের প্রয়োজনেই সামাজিক দূরত্ব, বিচ্ছিন্নতা ইত্যাদি আরোপ করা হয়েছে বিশ্বব্যাপী। এ সামাজিক দূরত্ব থেকে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আবেগীয় ও মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি হয় কি না এ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকেই। তারা সংশয় প্রকাশ করেছেন এবং আগেও তারা লক্ষ করেছেন-সামাজিক বিচ্ছিন্নতা থেকে মানুষের সাধারণ উপলব্ধি, আবেগ, অনুভূতি ও সমমর্মিতাবোধ হ্রাস পায়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতেও এসব হতে পারে। ওই ভাবনা থেকেই আমরা বলতে চাই- করোনা প্রতিরোধের সাথে আগামী প্রজন্মের ক্ষেত্রে যত্নবান হওয়া রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের এখন দায়িত্ব। এজন্য সংগনিরোধকালে শিক্ষার্থীদের প্রতি আলাদা নজর রাখা প্রয়োজন। তাদের সাথে ভাববিনিময়ে সময়  দেওয়া, কথা বলার চেয়ে বেশি শোনা এবং যৌক্তিকভাবে বিদ্যমান পরিস্থিতি অবহিত করা। বাড়িতে সকলকে নিয়ে ইতিবাচক চিন্তার কৌশল বারবার চর্চা করা। 

পরিবারের সদস্যদের প্রতি দয়া ও মর্মবোধ প্রকাশ, যে কেনো কাজে সহযোগী হওয়া, শুভ বিবেচনা বিনিময় করা, পরিবারের সকলকে নিয়ে অপরের মঙ্গলচিন্তা আলোচনা, এবং সমমর্মিতার বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসা। এ ছাড়াও আমাদের দৈনন্দিন চাহিদাগুলো পুনঃনির্ধারণ করা। বাইরে থেকে আসা তথ্য বুঝে শুনে অন্যদের সাথে বিনিময় করা। এক্ষেত্রে একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষাচিন্তা ও এসডিজি-৪ বাস্তবায়নে যেসব নমনীয় দক্ষতার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো আমরা বাড়িতে চর্চা করতে পারি। 

এগুলো হলো : যোগাযোগ (communication), আত্মপ্রণোদনা (self-motivation), বিশ্বাসযোগ্যতা (trustworthiness), শৃঙ্খলা (discipline), সৃজনশীলতা ও গাঠনিক চিন্তা (creativity and critical thinking), উপযোগিতা (adaptability), দায়িত্ববোধ (accountability), ও সমমর্মিতা (empathy)।

উপর্যুক্ত বিষয়গুলো সামাজিক ও আবেগীয় শিক্ষা (social-emotional learning)-র অন্তর্ভুক্ত বটে।ইউনেস্কো ২০১৯ সালে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছে যে, ট্রমার কারণে মানবমন ও শরীরের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এজন্য স্ট্রেস ও ট্রমা ব্যবস্থাপনায় ইউনেস্কো সামাজিক ও আবেগীয় শিক্ষার কৌশলসমূহ ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। 

যেমন : আত্মপ্রণোদনা, আত্মমূল্যায়ন, আত্মসংবেদন, ধ্যান, সমমর্মিতা, উপযোগীকরণ ও শারীরিক ব্যায়াম ইত্যাদি। এসব বিষয় মানুষের আবেগ ও উদ্দীপনকে ইতিবাচক দিকে বিকশিত হতে সহায়তা করে। তা ছাড়াও  সৃজনশীল ভাবনা, মনোদৈহিক কার্যক্রম, সামাজিক সহযোগিতামূলক কর্ম, জ্ঞানমূলক আচরণ চর্চা ও কৌশল মানুষের মানসিক সংবেদনকে স্বাভাবিক রাখতেও সহায়ক বলে প্রমাণিত। মূল লক্ষ হলো জীবনের স্বস্তি ও ইতিবাচক সংবেদনশীলতায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা অর্জনের ধারাকে স্বাভাবিক রাখা।

লেখক : উপপরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন), নায়েম, ঢাকা


মতামত লেখকের নিজস্ব, কর্তৃপক্ষের নয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা