kalerkantho

রবিবার । ২১ আষাঢ় ১৪২৭। ৫ জুলাই ২০২০। ১৩ জিলকদ  ১৪৪১

যুক্তরাষ্ট্রে করোনার সাথে আমাদের এ কেমন যুদ্ধ?

সারিকা দেব, ইলিনয়, যুক্তরাষ্ট্র   

১০ এপ্রিল, ২০২০ ২২:০১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



যুক্তরাষ্ট্রে করোনার সাথে আমাদের এ কেমন যুদ্ধ?

আমি কখনও যুদ্ধ দেখিনি, বাবা-মা আর বড়দের কাছ থেকে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প শুনেছি। বই পড়ে, ইন্টারনেট ঘেঁটে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সর্ম্পকে জেনেছি। আমার বাবা কে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে তারা তো যুদ্ধ দেখেছেন, তখন কি রকম অবস্থার মধ্য দিয়ে তারা গিয়েছেন, তখন কি আজকের মতো অবস্থা হয়েছিল? আমার বাবা আমাকে জানালেন, ওই সময় তারা যুদ্ধ করেছেন চেনা শত্রুর সাথে, শত্রু কোথায় আছে, কখন আক্রমণ করবে, তারা জানতেন। কিন্তু আজ সারা পৃথিবীর মানুষ যুদ্ধ করছে এক অজানা, অদৃশ্য শত্রুর সাথে।

আমাদের কোনই ধারণা নেই, শত্রু কোথায় আছে, আমাদের থেকে কত দূরে আছে, কখন আমাদের আক্রমন করবে? এমনকি এখন শোনা যাচ্ছে, এই ভাইরাস সায়েলেন্ট কেরিয়ারের মাধ্যমে ছড়াতে পারে, তার মানে কে এটা বহন করছে আর কে করছে না সেটাও জানার কোন উপায় নাই। সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব মানুষ কে যে কখনও এই রকম একটা অদৃশ্য আর ভয়াবহ শ্ত্রুর সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে কেউ কী কখনও কল্পনা করেছিল?

আজ এপ্রিলের ১০ তারিখ। সারা পৃথিবীতে এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে  ৯৫ হাজার মানুষ। চীন ছাড়া বাকি সব দেশে আক্রান্তের সংখ্যা আর মৃতের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে আমেরিকার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। শুধু আজ আমেরিকাতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১৭০০ লোক। এই যদি হয় পৃথিবীর অন্যতম সভ্য দেশের পরিসংখান, তাহলে এই ভাইরাস আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে বা বিশ্বের অন্যান্য অনুন্নত দেশে ছড়িয়ে পড়লে কী অবস্থা হবে মনে করে আমার গাঁ শিউড়ে উঠছে।

আমেরিকার মধ্যে নিউইউর্কের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে এই কয়েকদিনে এখানে করোনাভাইরাসে ৭ হাজার মানুষ মারা গিয়েছে। আমেরিকার অন্যান্য বড় শহর গুলার অবস্থা দিনে দিনে খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমেরিকার প্রতিটি প্রদেশে সেই মার্চ থেকেই সামাজিক দূরত্বে থাকার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, মানুষ যাতে মানুষের সংস্পর্শে কম আসতে পারে সেজন্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, অনলাইনে চলছে সব ধরনের ক্লাস, অফিস। কিন্তু কোনভাবেই এই সর্বনাশা ভাইরাসের উর্ধগতি আয়ত্বের মধ্যে আনা যাচ্ছে না। যেহেতু কল-কারখানা, ফার্মে লোকজন আসতে পারছে না তাই নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষ থেকে শুরু করে খাদ্য-দ্রব্যের ও ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। 

অনেক নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষের দাম প্রচুর বেড়ে যাচ্ছে, কারন এদের যোগান কমে যাচ্ছে, কিছু জিনিষ তো একদম পাওয়া ই যাচ্ছে না। কিছু লোক হয়তো মজুদ করে রেখেছিল, তারা হয়তো কিছুদিন ভালোভাবে কাটাবে, কিন্তু বেশিরভাগ লোক ই সেটা করেনি, আর এখন অতিরিক্ত দামে সামর্থ অনুযায়ী নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কিনতেও পারছে না। এভাবে চলতে থাকলে, অর্থাৎ, কল-কারখানা, ফার্ম ধীরে ধীরে যদি বন্ধ হয়েযেতে শুরু করে, তাহলে ফুড সাপ্লাই চেইন বন্ধ হয়ে যাবে। কেউ কী ভাবতে পারছে তখন পৃথিবীর এই অন্যতম সভ্য দেশের মানুষ কী পরিমাণ বিপদের সম্মুখীন হবে?

আমেরিকান সরকার এই দুর্যোগকালীন সময়ে আয়ের ওপর ভিত্তি করে নাগরিকদের অর্থ সুবিধা দিচ্ছে, কিছুদিনের মধ্যেই নাকি বেশ ভালো অংকের চেক আসবে ঘরে ঘরে। আরে বাজারে যদি খাবার না থাকে, মানুষ টাকা ব্যাংকে রেখে কী করবে? আমরা থাকি ইলিনয়ের স্যাম্পেন শহরে, যেটা শিকাগো থেকে মাত্র দুই ঘণ্টা ড্রাইভিং দূরত্বে। শিকাগোর অবস্থা ও দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। 

আজ এপ্রিলের ১০ তারিখ, এই প্রদেশে করোনাতে আক্রান্ত হয়েছে হাজার হাজার লোক আর এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারাও গিয়েছে অনেক। বেশির ভাগই মারা গেছে শিকাগো শহরে। প্রতিটা মানুষ দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিন যাপন করছে। আমাদের এই ছোট শহরের জন্য সব নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস আর খাদ্য-দ্রব্য আসে শিকাগো থেকে।

জানা গেছে, ডেলিভারি প্যাকেটের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে এই ভাইরাস। আমরা এতদিন ধরে ডেলিভারি করে শুকনো খাবার এনেছি, প্যাকেট গুলা খুলতে গিয়ে যে কতধরনের সাবধানতা নিয়েছি সেটা বলার মত না, প্যাকেটগুলো ডিসিইনফেকটিং উয়াইপ দিয়ে যে কতবার মুছেছি আর হাত যে কতবার ধুঁয়েছি তার হিসাব নাই, কিন্তু নিরাপত্তার জন্য হয়ত এভাবে খাবার আনাটাও এখন বন্ধ করে দিতে হবে। এভাবে আর কত যুদ্ধ করব আমরা এই অদৃশ্য শত্রুর সাথে?

আমরা একটা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেস্কে থাকি, তাদের মেইন অফিস বন্ধ হয়ে গেছে সেই মার্চ মাসের মাঝামাঝিতেই, তবে ভাড়াটিয়াদের সাথে সবসময়ই যোগাযোগ রাখছে অনলাইনের মাধ্যমে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আমাদের কমপ্লেস্কে এখনও কেউ করনায় আক্রান্ত হয়নি। তাই এতদিন আমরা বিকেলে একটু ছেলে-মেয়েকে নিয়ে হাঁটতে যেতাম।

আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেস্কে কোনো বাউন্ডারি নাই, আমাদের বিল্ডিং এর সাথেই মেইন রাস্তা, আর রাস্তার ওপর পাশে অনেক গুলা সিঙ্গেল বাড়ি। কিছুদিন আগে একটা বাড়িতে একটা এম্বুলেন্স এসেছিল, তখন কিছুটা ভয় পেয়েছিলাম, ভয়টা আরও প্রগাড় হল যখন গতকাল দেখলাম, ওই বাড়ির মহিলাটা বাড়ি থেকে অনেক ফার্নিচার বের করে মুছামুছি করছে আর পরিস্কার করছে। আমার হাসবেন্ড বলল আর বিকেলে বাইরে হাঁটতে যেও না। এত ভয় নিয়ে তো আর চলা যায়না। 

আমরা আবার কবে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারব কেউই জানিনা। এই করনার সাথে যুদ্ধ করতে করতে আমাদের নিশ্চই এতদিনে বোধগম্য হয়েছে যে এই পৃথিবীতে সবকিছুই মানুষের করায়ত্ত নয়। আমরা যে শুধু সবসময় আমি আমি করি আর নিজেদের শ্রেষ্টতা প্রমাণ করার জন্য হন্যে হয়ে থাকি, একটা জায়গায় গিয়ে পৃথিবীর প্রতিটা মানুষকেই নতি স্বীকার করতেই হয়, আর সেটা হল প্রকৃতি। প্রকৃতির কাছে ধনি-গরিব, সাদা-কালো, উচু-নিচু সবাই সমান, কোনো ভেদাভেদ নাই।

এই ভাইরাস আমাদের মনে করিয়ে দিল আমরা সবাই একে অপরের সাথে সংযুক্ত, আমরা মানবজাতি কোনো বিচ্ছিন্ন সত্তা নই। তাই এখন সময় এসেছে সমষ্টিগত ভাবে কাজ করার, আর নিজেদের কথা না ভেবে এই পুরো মানবজাতিকে নিয়ে ভাবার। একমাত্র সমষ্টিগতভাবেই আমরা এই যুদ্ধ মোকাবেলা করতে পারব। শুধু নিজেকে নিয়ে চিন্তা করলে এই দূর্যোগের ব্যাপ্তিকাল শুধুই বাড়বে, কমবে না। 

এই মুহূর্তে এই সর্বগ্রাসী করোনার সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন আমাদের সাইন্টিস্টরা, প্রতিনিয়ত তারা চেষ্টা করে যাচ্ছে এই প্রাণঘাতি রোগের প্রতিষেধক বের করার। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানীগুলো নানাধরণের আশার বাণী শুনিয়ে যাচ্ছে, আমরাও তীর্থের কাকের মতো বসে আছি কোনো একটা সুখবরের অপেক্ষায়। কিন্তু এটা সবার জানা উচিত যে, প্রতিটা ভাইরাসের ভেকসিন আবিস্কারের কয়েকটা পর্যায় আছে, প্রথমে অন্য কোনো প্রাণীর উপর ভেকসিনটা প্রয়োগ করা হয়, এর সফলতা বা বিফলতা দেখে তা মানুষের উপর প্রয়োগ করে হয়, আর প্রতিটা পর্যায় সম্পন্ন হতে প্রচুর সময়ের প্রয়োজন, হঠাৎ করে একটা ভেকসিন মার্কেটে ছাড়া যায় না। তেমনি এই করনা ভাইরাসের ভেকসিন আমাদের হাতে এসে হয়তো পৌঁছবে এই বছরের শেষের দিকে। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত আর কত মৃতদেহ আমাদের দেখতে হবে?

প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছে চিকিৎসক, নার্স, ফার্সরেসপন্ডাররা। তারা করোনায় আক্রান্ত ঝুঁকিপূর্ণ রোগিদের মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে আনার জন্য জীবন বাজি রেখে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা ঘরে বসে নেই, নাওয়া-খাওয়া ভুলে তারা এই করোনার সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে।

আর আমরা সাধারন মানুষ আজ যুদ্ধ করে যাচ্ছি নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। আমরা নিজেদের ‘সামাজিক জীব’ পরিচয় ভুলে গিয়ে ঘরের মধ্যে দিনের পর দিন আবদ্ধ হয়ে বসে আছি, লড়াই করে যাচ্ছি ক্ষুদ্র, চোখে দেখা যায়না এমন একটা শত্রুর সাথে। সব যুদ্ধেরই তো অবসান হয়, কিন্তু এই সর্বগ্রাসী করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধের অবসান কবে হবে, কেউ কি বলতে পারবে?

 

মতামত লেখকের নিজস্ব, কর্তৃপক্ষের নয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা