kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

প্রণোদনার ঋণে ঝুঁকি বাড়বে ব্যাংকের

মামুন রশীদ   

৭ এপ্রিল, ২০২০ ২০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রণোদনার ঋণে ঝুঁকি বাড়বে  ব্যাংকের

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত করোনা অভিঘাত মোকাবেলা তহবিলের প্রায় পুরোটারই বিতরণ প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষতঃ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে। রপ্তানি সহায়তা আর এক্সপার্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (ইডিএফ) টাকা বাদে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবাখাতে চলতি মূলধন যোগানো, জাহাজীকরন-পূর্ব অর্থায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থায়নের পুরোটাই বানিজ্যিক ব্যাংক-নির্ভর।      

বাংলাদেশের ব্যাংকিংখাত ইতোমধ্যেই মন্দঋন, মূলধন-স্বল্পতা, দায়- সম্পদ ব্যবস্থাপনার দূর্বলতা, কম নিট মুনাফা, সেবা-পন্যের বৈচিত্রের অভাব, দক্ষ মানব সম্পদের স্বল্পতা, ন্যুনতম প্রয়োজনীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অভাব এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম প্রযুক্তি- দক্ষতায় ভুগছিল। 

অন্যান্য দেশে ঘোষিত সহায়তা তহবিলের সাথে বাংলাদেশ ঘোষিত প্যাকেজের কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ৭২৭৫০ কোটি টাকার প্রায় পুরোটাই (৬৭৭৫০ কোটি টাকা) অনেকটা পরিশোধযোগ্য ঋণ বা তারল্য সহায়তা। তার মধ্যে ইডিএফের টাকা বাদে পুরোটারই গ্রাহক নির্বাচন, ঋন-ঝুকি, পরিচালন-ঝুঁকি এবং খাত বা বাজার ঝুকি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণপরিশোধ নিশ্চিতকরনের দায়িত্বে বাণিজ্যিক ব্যাংক।

এটাকে অনেকে 'মরার উপর খাড়ার ঘা' বলে অভিহিত করছেন। ইতোমধ্যে মন্দ-ঋণ এবং দায়- দেনা ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা সম্পর্কিত কুখ্যাতি বা সুনাম-নাশের কারনে অনেক ব্যাংক আমানত খুইয়েছে বা তাদের আমানত অপেক্ষাকৃত ভালো বা নামী ব্যাংকে চলে গেছে। নতুন লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেশীরভাগ ব্যাংক এবং নতুন-পুরাতন অধিকাংশ অ-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান তহবিল বা ব্যবস্থাপনা সংকটে জর্জরিত। 

সঞ্চয়পত্র ক্রয়ে কড়াকড়ির ফলে যদিও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমে ব্যাংকের আমানত প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে, তবে সেই বৃদ্ধির বেশীরভাগ টাকাই কিছু সরকারি এবং নামীদামী বেসরকারি ব্যাংকে। বেশকিছু বানিজ্যিক ব্যাংকে ইতোমধ্যেই মন্দঋণের পাহাড় জমেছে।  অতএব আপৎকালীন তহবিল-সহায়তা  বিতরনে সকল ব্যাংক সমানভাবে সক্ষমতা বা দক্ষতা দেখাতে পারবে না। বিতরণকৃত টাকা যদি ফেরত না আসে তখন সমস্যা আরো বাড়বে। অর্থ মন্ত্রণালয় রফতানি- সহায়তা দিলেও তহবিল বিতরন বা ব্যবস্থাপনার কোনো ব্যর্থতার দায় নিতে হবে বানিজ্যিক ব্যাংককে। এমনকি ইডিএফ বিতরণের কোনো অনিয়মের দায়ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নেবে না। প্রযোজ্য বা আরোপিত সুদের কিছুটা দায়ভার যার প্রাক্কলিত পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকা শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের । তার উপর  'ফোড়ার উপর বিষফোড়া' হিসেবে কাজ করবে বৃহৎ শিল্পের ঋনঝুকি ব্যবস্থাপনা  এবং নতুন করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণগ্রহিতা খুঁজে তাদের ঋণদান এবং ঋণের টাকা ফেরত নিশ্চিতকরন।

এবার আসি কোথায় পাবে বানিজ্যিক ব্যাংক এতো টাকা? সদাশয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যেই সিআরআর (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও)  বা নগদ সংবিধিবদ্ধ জমার হার ০.৫ শতাংশ কমিয়েছেন। যার ফলে ৬২০০ কোটি টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ফেরত আসবে বা তাদের ঋনযোগ্য  তহবিল বাড়বে। আমরা শুনেছি, প্রয়োজনে আপদ মোকাবেলার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিআরআর  আরও কমিয়ে আনবে। তাছাড়াও মোট ২ লক্ষ ১০ হাজার কোটি টাকা সিআরআর এবং এসএলআর (ষ্ট্যাটুটরী রিজার্ভ রেশিও) রাখার বাধ্যবাধকতার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সংবিধিবদ্ধ জমা রয়েছে ৩ লক্ষ ১৩ হাজার কোটি টাকা।  অর্থাৎ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো চাইলেই অতিরিক্ত জমা রেপোর মাধ্যমে বা অন্যভাবে তুলে নিতে পারবে। তবে সমস্যা হলো - এই অতিরিক্ত টাকার ভাগ শুধু ১০টি ব্যাংকের, যার বেশকটি আবার সরকারি ব্যাংক। তাছাড়াও সরকার ইতোমধ্যে যেহেতু স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত আমানতের উপরও ভাগ বসিয়েছে, তাই হয়তো তহবিলের অভাব হবে না।         

তবে মূল বিষয় হলো - মন্দ ঋণ সংস্কৃতির দেশে তহবিল সংকট ঘুচলেও ঋন পরিশোধের কোনো নিশ্চয়তা নেই। তা হোক ব্যাংকের বর্তমান বা নতুন গ্রাহক। 

তদুপরি বেশীরভাগ ব্যাংক যখন বর্তমানের গ্রাহক সামলাতেই হিমসিম খাচ্ছে, সেখানে মানসম্পন্ন  নতুন গ্রাহক খুঁজে বের করা হবে অতীব কষ্টকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ। 

তাই ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম বা ডেট ডিফল্ট সোয়াপ জাতীয় প্রোগ্রামের অভাবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পুরো দায়িত্ব বাণিজ্যিক ব্যাংকের উপর চাপিয়ে দিলে আপৎকালীন তারল্য সহায়তা বা প্রনোদনা শেষ পর্যন্ত খুব একটা কাজ না-ও করতে পারে। 

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক


মতামত লেখকের নিজস্ব; কর্তৃপক্ষের নয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা