kalerkantho

রবিবার  । ১৫ চৈত্র ১৪২৬। ২৯ মার্চ ২০২০। ৩ শাবান ১৪৪১

এলাকার কিপ্টে চাচাও বাড়ি ভাড়া মওকুফ করে দেয়

হায়দার আলী   

২৬ মার্চ, ২০২০ ২১:০৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এলাকার কিপ্টে চাচাও বাড়ি ভাড়া মওকুফ করে দেয়

সারা পৃথিবীর মতো করোনাভাইরাস তাণ্ডবে কাঁপছে আমাদের দেশটিও। করোনার ভয়ংকর তাণ্ডবে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধসহ সারাদেশেই কার্যত লকডাউন হয়েছে, আইনশৃংখলা বাহিনীর পাশাপাশি মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনীও। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে দরিদ্র এবং অতিদরিদ্র পরিবারের খেটে খাওয়া মানুষগুলো। দিনমজুর, রিকশা চালকসহ নিম্ন আয়ের যারা দিন আনে দিন খায় মানুষগুলো। তাদের নিয়েই সরকার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও দুশ্চিন্তা করছে। কিভাবে বাড়ি ভাড়া দিবে, পরিবারেরর ভরণ পোষণ কিভাবে করবে? এইসব মানুষের পাশে সরকারই বা কিভাবে লাখ লাখ দরিদ্র এসব মানুষের পাশে থাকবে, কিংবা দেশের বিত্তশালীরা এগিয়ে আসার কথাও অনেকেই বলছেন। 

মিডিয়াসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার মধ্যেই ঢাকার এক বাড়িওয়ালা সকল ভাড়াটিয়াদের মার্চ মাসের বাড়ির ভাড়া মওকুফ করার ঘোষণা দেন। কালের কণ্ঠ পত্রিকায় এমন নিউজটি প্রকাশিত হওয়ার পর সারাদেশে ভাইরাল হয়ে যায়, উনার এমন উদ্যোগ দেখে অনেকেই বাড়ি ভাড়া মওকুফের ঘোষণা দেয় এবং দিচ্ছে। এরইমধ্যে বাড়ি ভাড়া মওকুফ করলেও নিম্ন আয়ের মানুষগুলো খাবে কি, এভাবে টানা ১৫ দিন কিংবা পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে কি হবে এই দুশিচন্তার মধ্যেই গাজীপুর মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কামরুল আহসান সরকার রাসেল দুই শতাধিক পরিবারের জন্য এক মাসের খাবার কিনে দিলেন। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত সিকদারো কয়েকশ মানুষের জন্য খাবার বিতরণ করলেন গোপনে।  

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই নিরবে চলছে দরিদ্র মানুষের জন্য কিছু একটা করার, বাড়ি ভাড়া মওকুফ, খাবার বিতরণ, মাস্ক-স্যানিটাইজার দেয়া, রাস্তা-ঘাট, পাড়া মহল্লায় হাত ধোয়ার বেসিন বসানো,সহ নানাভাবেই দরিদ্র মানুষের পাশে দাড়াচ্ছেন, দিন রাত মাইিকং করে সচেতনতায় কাজ করছেন আন্তিরকতর সঙ্গে। দলমত নির্বিশেষে জাতীয় এমন দুর্যোগে নিরবেই কাজ করে যাচ্ছেন, যা দেখে আমি নতুন স্বপ্ন দেখি, আশায় বুকবাধি। বাংলার মানুষ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যেভাবে পাকবাহিনীকে পরাজিত করেছিল, ঠিক সেভাবেই করোনার ভাইরাসের অন্ধকার ভেদ করে আলো আনবেই আমাদের দেশের মানুষ। 

করোনার আতংক কেটে গিয়ে আবার বাংলাদেশের মানুষ এবং এই দেশ তরতর করে এগিয়ে যাবে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশ নিয়ে দেশের মানুষ নিয়ে, বাঙালি জাতি নিয়ে অনেকে হতাশার গল্প বলছেন, নানাভাবে কটাক্ষ করে কথা বলছেন। এইসব হতাশার মধ্যেই নিরবে ঘটছে শতশত ভালো কাজ, করোনা দুর্যোগে কি করতে হবে সেটা যেন আমাদের দেশের মানুষ কিছু বলার আগেই গোপনেই  করে যাচ্ছে। আমার জানা দুটো ঘটনা বলি,  মোহাম্মদপুরে আমার বন্ধুর এক প্রতিবেশি  চাচা, যিনি এলাকায় কিপ্টে চাচা হিসেবেই পরিচিত। উনার বাড়ির ভাড়া যিনি বছরে বছরে বাড়িয়েছেন, একশত টাকা কম নিবে দূরের কথা, বাসার কোনা কিছু ভাঙ্গলেও যিনি জরিমানা ধরতেন, সেই চাচাটিও আজ করোনার কারণে পাল্টে গেছেন! সেই চাচাই তাঁর টিনশেড বাড়ির মার্চ মাসের ভাড়ার অর্ধেক দিতে হবে না বলে ভাড়াটিয়াদের জানিয়ে দিয়েছেন, এমন খবর শুনে নিম্নবিত্ত পরিবারের মানুষগুলো অবাক হযেছেন, শুধু তারাই নয়-এমন খবরে আশপাশের প্রতিবেশরীরাও বেশি অবাক হয়েছেন, যারা এতোদিন তার কিপ্টামির জন্য আড়চোখে তাকাতো, সেই মানুষগুলোই যেন চাচাকে নিয়ে গর্ব করে উদাহরণ দিচ্ছেন। 

এমন ঘটনা করোনা জয়ে আমাদের সাহস জোগায়, এই চাচার মতো অনেকেই  অতি দরিদ্র আর নিম্নবিত্ত মানুষের পাশে দাড়াচ্ছে ,যার যার সাধ্য অনুযায়ি।  আর একজনের কথা বলছি, যে নিজের পরিবার নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন তাদের চেয়ে কম উদ্বিগ্ন নয়- করোনা ঝুকিঁতে থাকা মানুষদের নিয়ে। আমারই ছোট বেলার বন্ধু জ্যোতি প্রকাশ বড়ুয়া। ওর বাবা মানে আমাদের আংকেল ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ফটোগ্রাফার। খুবই উদার মনের মানুষ বন্ধু জ্যোতি। এখনো বিপদে-আপদে একে অপরের পাশে থাকি। হঠাৎ গত বুধবার ফোন দিয়ে জ্যোতির অস্থিরতা। ডাক্তার, নার্স পুলিশসহ অনেকেই পার্সোনাল প্রটেকটিভ ইকুউপমেন্ট (পিপিই) পাচ্ছে। আমাদের জন্য ৫০টি ম্যানেজ করে দিতে পারবি। আমি শুনেই হাসতে হাসতে বলি, তোরা এগুলো দিয়ে কি করবি, এগুলো তো সাধারণ মানুষ পরার জন্য নয়।  

জ্যোতি বললো, আমাদের জন্য নয়- আমাদের এলাকাটি হাসপাতাল পাড়া, এখানে কয়েকশত এম্বুলেন্স গাড়ি আছে, চালক এবং সহকারি আছে অন্তত কয়েকশত, এইসব চালকদের সেফটির জন্যই বিনামূল্যে বিতরণ করবো। কারণ মানুষ অসুস্থ্য হলে প্রথমেই ডাক পড়ে এম্বুলেন্সের। তাৎক্ষনিক ছুটে যায় চালক ও সহকারি। কে করোনা রোগী? আর কে হার্টের রোগী সেটা তো আর এম্বুলেন্স চালক আর সহযোগীরা বুঝে না। এরা বিভি্ন্ন এলাকা থেকে রোগী নিয়ে যাচ্ছে হাসপাতালে। ওইসব  ঝুঁকিতে থাকা এম্বুলেন্সের চালক ও সহযোগীদের জন্যই দোস্ত তুমি পিপিই এর খোঁজ পেলে জানাও। পরে জানলাম, নিজের বাড়ির ভাড়াও দুই মাসের জন্য মওকুফ করে দিয়েছে আমার বন্ধুটি। 

ফোনে কথা কথা বলার পর থেকেই ভাবছি, যাদের কথা রাষ্ট্র কিংবা কোন সংস্থা ভাবছে না, জ্যোতি বড়ুয়া। যে ছাত্রলীগের চোদ্দগোষ্ঠী উদ্ধারকারি ব্যাক্তিটিও এখন ছাত্রলীগের কাজে সহায়তা করছে। যে কিপ্টা চাচা কিছু বলার আগেই ভাড়া মওকুফ করছে। যেন করোনা ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ জয়ের জন্য কাধেঁ কাধঁ মিলিয়ে মাঠে নামছে, ধীরে ধীরে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা সৈনিকদের সংখ্যা করোনর চেয়ে পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলবে। বাংলার মাটি থেকে করোনা ভাইরাস পরাজিত হবেই। আমি আশাবাদি মানুষ, সেই আলোর অপেক্ষায় আছি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা