kalerkantho

শনিবার । ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩০  মে ২০২০। ৬ শাওয়াল ১৪৪১

ধানমণ্ডি লেকের দূষিত জল ও একজন সন্তানহারা মায়ের আকুতি

তৃষ্ণা সরকার   

১২ মার্চ, ২০২০ ১২:০৭ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ধানমণ্ডি লেকের দূষিত জল ও একজন সন্তানহারা মায়ের আকুতি

বাবু, আজ তোকে নিয়েই পড়ে থাকতে ইচ্ছে করছে, বোনকে স্কুলে পাঠিয়ে তোর ঘরে একা। অনেকদিন ভাবছিলাম লিখবো, এখনও অনেকে তোর চলে যাওয়াটার রহস্যটুকু খুঁজে বেড়ায়, মা হয়ে এই চার মাস ১০ দিনে আমি যা জেনেছি, উপলব্ধি করেছি সেদিনের ঘটনার- তাই লিখলাম।

খুব মনে পড়ছে বাবু, তোর যখন ৪ বছর তোকে অরণি বিদ্যালয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে আমি মায়েদের কাউন্সিলিং করতাম। এমনি একদিনে বোনকে বাড়িতে রেখে আমি আর লাকী মাসী ধানমণ্ডি লেকের সুধা সদনের পাশের ব্রিজের কোণায়  বসে গল্প করছি। মেডিনোভার পাশে জাহাজ বাড়ি ঘেঁষে একজন মানুষ ছিপ দিয়ে মাছ ধরছেন। তার বিপরীতে ঘাটে একজন মানুষ গায়ে সাবান মেখে সাঁতার কাটছেন। কিছুক্ষণ পর বাঁচাও বাঁচাও বলে চিতকার শুনলাম। দুই পাড় থেকে মানুষ নেমে তাকে তুলে আনলেন। আমি দৌড়ে গিয়ে তার পালস ধরে দেখলাম- নেই সে আর। পরে জানতে পারলাম লোকটি সিকুউরিটি গার্ড হিসেবে চাকুরী পেয়েছে ৬/৭ দিন হল। কেউ বললো, জ্বীনে ওকে টেনে নিয়ে গেছে। লোকটি নাকি আসন গেড়ে মাটিতে বসেছিলো, যারা তুলেছে তারা বলছিল। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান দিয়ে বুঝেছিলাম, লেকের পানিতে বিষাক্ত পদার্থ বেশি থাকাতে অক্সিজেন কম ছিলো। তাই হয়তো দম নিতে পারেনি। প্যানিক ডিজঅর্ডার এট্যাক্ট হয়েছে হয়তো!

সেদিন ছুটি শেষে বাড়ি ফিরে তোকে সব গল্প বলেছিলাম। আর এই লেকে নামতে নিষেধ করেছিলাম। তুই নামতিস না কখনোই। আস্তে আস্তে বড় হয়ে উঠলি,,,,তোকে নিয়ে কত স্মৃতি এই লেক ঘিরে। লাল শাপলা, জলে খাপড়া ছুঁড়ে ব্যাঙ লাফানো শিখিয়েছি। সেপ্টেম্বরের ওই বৃষ্টিস্নাত পরিবেশে কেন এতো আকুল হয়ে গিয়েছিলি বাবা!

প্রকৃতি পছন্দ বলে মা'কে সাথে করে কেন গেলি না বাবা। আমিইতো তোকে ওই সিঁড়ি ঘাটে জলে পা ভিজিয়ে রাখতে শিখিয়েছিলাম। মাছরাঙা পাখি ওড়া আর হিজল ফুল ভেসে যাওয়া আমিইতো দেখিয়েছিলাম। ৮ নং ব্রিজের ছবিটা যেদিন তুই  এঁকেছিলি - মনে পড়ে, একটা পথশিশুর জলে ঝপাং ঝপাং লাফ দেখে তাকেও এঁকেছিলি। আবার লেকের জলে কোন হাঁস নেই বলে কৃত্রিম কাল্পনিক হাঁসও এঁকেদিলি দু'টো ওই ছবিতে। অথচ দেখ তুই চলে যাওয়ার পর মনের মাধুরী দিয়ে কেউ কেউ অবলীলায় লিখে দিলো যে, তুই চলে যাবার আগে নিজেই এসব ইচ্ছেকরে এঁকে রেখেছিস হয়তো! অবাক হইনি একটুও। বৃষ্টিতে অতক্ষণ ভিজে ঠাণ্ডায় তোর পায়ের মাসেল ক্রাম করেছিলো সেদিন। প্রকৃতির প্রেমে মত্ত হয়ে জলকেলির নেশায় সাঁতারে মেতে উঠেছিলি তুই। ভুলেই গেছিলি তোর এক নাক আংগুরের মতো এক পিণ্ড মাংসের দলা দিয়ে বন্ধ। তোর নাকটা একটু বাঁকা। ভারতের ভেলরের ডাক্তার তোকে ২২ বছর বয়স হওয়ার আগে অপারেশন করতে মানা করেছিলেন। কারণ ছেলেদের শরীর বাড়ে এই সময়ে। অপারেশন করলে এটা আবারও বড় হতো, তোকে কেন আমি বারবার কষ্ট দেবো- তাই ডক্টর মানা করেছিলেন। সাধারণত মানুষের নাকে সর্দি জমে ব্যাকটেরিয়া ৩০০ টি, তোর নাকে নর্মাল ব্যাকটেরিয়া ছিলো ৩০০০ টি। ভেলরে নিয়মিত চিকিৎসা চলছিলো তোর। জন্মাবার সময় নিজের পটি নিজে খেয়ে ফেলেছিলি বলে এজমা ছিলো খানিকটা। পকেট ওয়ালা প্যান্ট ছিলো তোর ভীষণ প্রিয়। এমন প্যান্ট পরে কেউ জলে নামে পাগল! তার উপর ওপারে গিয়ে রিক্সায় বাসায় ফিরবি বলে পকেটে স্যান্ডেল ঢুকিয়ে নেমেছিলি। সেদিনও এই খাকি রংয়ের প্যান্ট আর ব্রেসলেট পড়েছিলি তুই। এমন করে শরীরের এমন অবস্থায় মা'কে না জানিয়ে কেউ জলে নামেরে পাগল! 

তোর এই বয়সের নাম দিয়েছি অদম্য শ্রেণি। তার উপরে তুই জিম করতিস নিয়মিত। অদম্য এক নেশায় পায় তোদের এই শ্রেণির বয়সের প্রায় সকলকে। সবকিছু জয় করতে পারবি তোরা- এমন এক মনোভাব নিয়েই তুই সেদিন জলে নেমে জলকেলির নেশায় এপার ওপার করতে করতে যখন বাঁচাও বাঁচাও বলে চিতকার করছিলি। আতংকে তোর প্যানিক ডিজওর্ডার হয়েছিলো সেদিন। এমনিতে তুই বাটারফ্লাই সাঁতার পারতিস, সেদিন সেটাই কেটেছিলি। মাসেল ক্রাম করলে চিত সাঁতার কেটে শরীরটা ভাসিয়ে রাখতে হয় কিছুক্ষণ। তুই সেটা পারতিস না, আর জানতিও না। তাই সেদিন তোর সাথের পথশিশুরা তোর চিতকার শুনে ভেবেছিল তুই দুষ্টামি করছিস, পরে দেখে সত্যিই তুই ডুবে যাচ্ছিস। তোর সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়া শরীর এতো ভারী হয়ে যাওয়াতে ওরা তোকে বাঁচাতে গিয়ে ধরে রাখতে পারছিলো না। তাই ওরাও ভয়ে বলে উঠেছিলো- এই ভাগ ভাগ, ওরে জলপরী টেনে নিয়ে যাচ্ছে! এমন দেখে পাড়ের দুইজন ছেলে তোকে শেষ চেষ্টা করেছিলো বাঁচাতে কিন্তু খুঁজে পায়নি।

লেকের অব্যবস্থাপনা, মসজিদ কমিটির নির্বিকার আচরণের জন্য অনেক দেরি হয়ে গেছিলো সেদিন ৩২ নং পুলিশ ফাঁড়ি হতে থানা পর্যন্ত খবর পৌঁছাতে। তারপর দু দু'বার ডুবুরি এসে তবেই তোকে খুঁজে পায়। মাগরিবের আযানের আগে ঘটনা শুরু, এশার আযানের পর তোকে খুঁজে পায় ও প্রাণহীন অবস্থা সনাক্ত করে। পরে জেনেছি তোকে পেয়ে ধানমণ্ডি লেকে মাইকিং করেছে পুলিশ। আমি সারারাত বন্ধু, আত্মীয়স্বজন খুঁজে বেড়িয়েছি। সারারাত থানা, বন্ধু-বান্ধব, বিভিন্ন জায়গায় ফোন। রাত ১২ টায় জেনেছি তুই ফোন নিয়ে বের হসনি। রাতে যাবো জিডি করতে, আদাবর থানা বলল- সকালে আসুন, ১৭ বছরের ছেলে কোথাও যায়নি। তাই ভোরবেলা তোর জন্ম নিবন্ধন কপি আর ছবি নিয়ে জিডি করে অফিসারকে বললাম, আমার কি কাজ শেষ? আরো বললাম আমার বাবুতো লালমাটিয়া আর ধানমণ্ডিতে বেশি থাকতো। তখন তিনি বললেন এই জিডির কপি নিয়ে গিয়ে থানাগুলোতে ইনফর্ম করুন। সেটা করতে গিয়ে সকাল ৯.৩৫-৪০ মিনিটে সব বুঝলাম আমার সব শেষ হয়ে গিয়েছে। তুই প্রকৃতির মাঝেই চিরতরে তলিয়ে গেছিস।

এই লেকে পর্যাপ্ত অক্সিজেন নেই, হাসপাতালের বর্জ্যও মাঝে মাঝে ফেলা হয়। ডাক্তার তো তোকে বলেছিলেন কখনো জলে একা নামবে না। তুই সেটা মেনেছিলি নিয়মিত। কিন্তু এই অদম্য বয়সে সব জয় করতে পারিস এমন আত্মবিশ্বাস তোকে ভুলিয়ে দিয়েছিলো আমায় একবার জানাবার কথা। একবার আমায় বলে গেলে আমি তোকে নিশ্চয়ই মনে করিয়ে দিতাম ধানমণ্ডি লেকের এই দুরাবস্থার কথা।
অদম্য বয়সের সকল কিছু ভালোরে বাবা। শুধু একটা অনুরোধ, এমন বাধা নিষেধ যাদের আছে, তারা একটু মাকে জানিয়ে সব কাজগুলো করতে যাস- বাবা সোনারা। আমি জানি তুই ভালো আছিস, ভালো থাকিস ওপারে আমার বোকা, পাগল বাবাসোনাটা!! 

আমি বেঁচে আছি আমার সমস্ত কাজ বাদ দিয়ে তোকে আর বোনকে ঘিরেই। তোর নামে "ঋদ্ধ ফাউন্ডেশন " ঘিরেই আমার যাবতীয় ব্রত, অন্য সব ঋদ্ধদের যদি খুঁজে পাই সেই ভরসায়।

গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর ধানমন্ডি লেকে ডুবে ঋদ্ধ নামের এক কিশোর মারা যায়। সে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল। তাঁকে স্মরণ করে মা তৃষ্ণা সরকার লিখেছেন।  

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা