kalerkantho

বুধবার । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৭  মে ২০২০। ৩ শাওয়াল ১৪৪১

জ্যোতির্ময়ী নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী

রোকসানা ফেরদৌস মজুমদার   

১৩ জানুয়ারি, ২০২০ ১৭:৪৫ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



জ্যোতির্ময়ী নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী

অজ্ঞানতার অন্ধকার আর কুসংস্কারের তিমির বিদার করে যে ক্ষণজন্মা জ্যোতির্ময়ীর আবির্ভাব, তিনি নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী। জ্ঞানে, ব্যক্তিত্বে এক প্রখর আলোকদীপ্তি নিয়ে তিনি যাপন করেছেন তার সময়। দানে-দাক্ষিণ্যে, স্থাপনা প্রতিষ্ঠায় তিনি যে অক্ষয় কীর্তি রেখে গেছেন তাকে ছাপিয়ে উঠেছেন ব্যক্তি ফয়জুন্নেছা। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর “শাজাহান” কবিতায় বলেছেন-
“তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ,
তাই তব জীবনের রথ
পশ্চাতে ফেলিয়া যায় কীর্তিরে তোমার বারংবার।
তাই চিহ্ন তব পড়ে আছে, তুমি হেথা নাই।”

নবাব ফয়জুন্নেছার ক্ষেত্রে একথার ব্যত্যয় ঘটেনি। কীর্তিকে ছাপিয়ে স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের প্রখরতায় শতাব্দীকে ছাপিয়ে উঠেছেন তিনি।

মোগল সম্রাট শাহ আলমের শাসনকালে শাহজাদা জাহান্দরের পুত্র আমির মির্জা আব্রু খাঁ হোমনাবাদ পরগনার জমিদারী লাভ করেন। তাঁরই অধস্তন ষষ্ঠ বংশধর আহমদ আলী চৌধুরীর প্রথম মেয়ে নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী।

ছোট বেলা থেকে ফয়জুন্নেছার জ্ঞানস্পৃহা ছিল প্রবল। তিনি গৃহশিক্ষকের সহায়তায় বাংলা, আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃত এই চারটি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। ওস্তাদ তাজউদ্দিন মিঞা ছিলেন ফয়জুন্নেছার গৃহশিক্ষক। ওস্তাদের অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন-

ফয়জুন্নেছা তাঁর ‘রূপজালাল’ কাব্যে-
“ওস্তাদের পদ বন্দি শিবের উপর,
অন্ধকে জ্যোতি দিয়ে করিল পসর।
শ্রীযুত তাএজ উদ্দিন মিঞা তাঁর নাম,
প্রভু আগে মাগি তাঁর স্বর্গে, হৈতে স্থান।”

ফয়জুন্নেছাকে সর্ব প্রকার সংকীর্ণতা ও কুসংস্কারমুক্ত করে জ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করে গড়ে তুলতে সফল হয়েছিলেন ওস্তাদ তাজ উদ্দিন মিঞা।

অনেক মনীষি যাদের সংসার জীবনে সুখের ছোঁয়া ছিলনা এতটুকু, নওয়াব ফয়জুন্নেছা যেন তাঁদেরই সমগোত্রীয়। কথিত আছে সক্রেটিসের স্ত্রী সবসময় খুব চেঁচামেঁচি করত। একদিন মনখারাপ করে তিনি বাইরে চেয়ার নিয়ে বসে আছেন। এমন সময় তার স্ত্রী একবালতি পানি তাঁর মাথায় ঢেলে দিল। এ অবস্থা দেখার জন্য রাস্তায় ভিড় জমে গেল এবং সবাই হাসাহাসি করতে লাগল। তখন তিনি রাগ করে বললেন গর্জনের পর বর্ষন তো হবেই। এতে হাসার কী আছে? আর মনে রেখো আমার স্ত্রীর জন্যই আমি দার্শনিক হতে পেরেছি। ফয়জুন্নেছাও তদ্রুপ স্বামীর অবহেলা বঞ্চনার শিকার হয়েছেন বলেই সাহিত্যিক এবং প্রখরব্যক্তিত্ব সম্পন্ন হয়ে উঠেছেন বলে আমার বিশ্বাস।

১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে পিতার মৃত্যুর পর ২৬ বছর বয়সে ১৮৬০ সালে গাজী চৌধুরীর সাথে ফয়জুন্নেছার বিয়ে হয়। গাজী চৌধুরীর এটি ২য় বিয়ে। ফয়জুন্নেছার পিতার জীবদ্দশায় গাজী চৌধুরী ফয়জুন্নেছাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বয়োঃপ্রাপ্ত না হওয়ায় বাবা আহমদ আলী চৌধুরী তখন বিয়ের প্রস্তাবে রাজী হননি। গাজী চৌধুরী ফয়জুন্নেছার দুর সম্পর্কের ফুফাত ভাই ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর ফয়জুন্নেছাকে পাওয়ার জন্য গাজী চৌধুরী আবার প্রস্তাব করলে মা আরফান্নেছা প্রস্তাবে সম্মত হন। দূর্ভাগ্যের কালো মেঘ তখন থেকেই তাঁর ভাগ্যাকাশে আসন গেঁড়ে বসে। এক লক্ষ টাকা মোহরানা দিয়ে ফয়জুন্নেছার বিয়ে হয়। একে একে দুটি সন্তানের জননী হন তিনি। বড় কন্যা আরশাদুন্নেছা এবং ছোট কন্যা বদরুন্নেছা। সতীনের ঘরে এক সময় ফয়জুন্নেছার জীবন বিষিয়ে উঠে। তিনি স্বামীর ঘর ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তাঁর জীবনের এই ঘটনা তাঁকে প্রখর ব্যক্তিত্বময়ী করে তোলে।

‘নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দিবে অধিকার?’ রবীন্দ্রনাথের এ জিজ্ঞাসা ফয়জুন্নেছার আত্ম জিজ্ঞাসারই অনুরণন যেন। তাই তিনি গাজী চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করে দেন- মোহরের একলক্ষ টাকার সম্পত্তি আদায় করেছেন। অবরোধ বাসিনী নারীদের যুগে যুগে নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের এই উদাহরণ রীতিমত মিরাকল। ঝিনুকে আঘাত লেগে ক্ষরণ হলে তার রস পুঞ্জীভ‚ত হয়ে মুক্তোয় পরিণত হয়। ফয়জুন্নেছার জীবনের এই দূর্ঘটনা তার ভিতরে যে ক্ষরণ করেছে তাই এক সময় রূপ পেয়েছে তাঁর অমর সৃষ্টি ‘রূপজালাল’ গ্রন্থে।

স্বামীর সংসার থেকে ফিরে এসে ফয়জুন্নেছা হোমনাবাদ পরগনার জমিদারীর ভার নিজের হাতে নেন। শুরু করেন নতুন জীবনসংগ্রাম, জ্ঞান-বুদ্ধি, কর্মদক্ষতা বিচক্ষণতা ও ব্যক্তিত্বের গুণে তিনি সবার শ্রদ্ধা কুড়িয়েছেন। জমিদারী লাভের পরপরই তিনি জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি গরীব দুঃখীদের পানির কষ্ট নিবারনের জন্য দীঘি বা পুকুর খনন এবং চলাচলের সুবিধার জন্য অনেক রাস্তাঘাটের ব্যবস্থা করেন। শিক্ষার জন্য মক্তব ও মাদ্রাসাও স্থাপন করেছেন। এই জনদরদী প্রজাহিতৈষিণী মহিলা জনকল্যাণের জন্য সকল ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন পরোপকারী ও একনিষ্ঠ সমাজ সেবিকা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে:

* ফয়জুন্নেছা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়। যা বর্তমানে নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে সুপরিচিত।
* জমিদারীর ১৪টি মৌজার ১৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
* ফয়েজিয়া মাদ্রাসা নামে অবৈতনিক মাদ্রাসা যা বর্তমানে নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি ডিগ্রি কলেজে রূপান্তরিত।
* পশ্চিমগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
* বি.এন.এফ.এন যুক্ত বিদ্যালয়।
* কুমিল্লার নানুয়া দীঘির পাড়ের শৈলরাণী স্কুলের প্রাথমিক শাখা।
* পশ্চিম বঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে একটি স্কুল।
* মক্কা শরীফে মাদ্রাসা-ই-সওলাতিয়া ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসার ব্যয়ভার বহনের সহায়তা।
* কুমিল্লার চর্থায় ফয়জুন্নেছা জেনানা হাসপাতাল বর্তমানে ফয়জুন্নেছা ফিমেল ওয়ার্ড নামে পরিচিত।
* পশ্চিম গাঁওয়ের নিজ বাসস্থানের পাশে স্থাপন করেন দশ গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ।
* নিজ বাসস্থানের পাশে একটি মুসাফিরখানা এবং মক্কায় রোবাত নামে মুসাফিরখানা স্থাপন।

সে সময় ত্রিপুরার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন মি. ডগলাস। তিনি জনহিতকর কাজের একটি প্রকল্প হাতে নেন। সেজন্য ধনী জমিদারদের নিকট অর্থ সাময়িকভাবে ঋণ হিসেবে চান। কিন্তু অর্থের পরিমাণ শুনে সকলেই অপারগতা জানান। এ সময়ই এল এক অপ্রত্যাশিত দান। ফয়জুন্নেছা ডগলাসের পরিকল্পনাটি পরীক্ষা করে দেখেন এবং প্রার্থিত টাকার একটি তোড়া মি. ডগলাসকে পাঠান। সাথে একটি চিঠি দেন যাতে লিখেছেন যে, ফয়জুন্নেছা যে টাকা দেয় তা দান হিসেবেই দেয়, কর্জ হিসেবে নয়। এই দান ডগলাসকে অভিভ‚ত করে। এই নারীর প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে আসে তার মাথা, তিনি এই মানবদরদী মহিলা জমিদারের সমাজসেবা, উদারতা ও দানশীলতার সকল তথ্য এবং জেলা প্রশাসক হিসেবে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বৃটিশ সম্রাজ্ঞি মহারাণী ভিক্টোরিয়াকে জানান।

বাংলার নিভৃত অঞ্চলের একজন মুসলিম মহিলা জমিদারের সমাজসেবা ও উদার হৃদয়ের পরিচয় পেয়ে বৃটিশ সম্রাজ্ঞিও অভিভূত হয়ে পড়েন। তিনি তাঁর সভাসদদের পরামর্শক্রমে মি. ডগলাসকে মহারাণীর আন্তরিক শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘বেগম’ উপাধি দিয়ে তাকে সম্মানিত করতে বললেন। কিন্তু ফয়জুন্নেছা আগে থেকেই বেগম তাই এ উপাধিটি তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর এই তেজস্বীতা মহারাণীকে ক্ষুব্ধ করে। তিনি ইংলন্ড থেকে একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল পাঠান ফয়জুন্নেছার যথাযোগ্য অবস্থান বোঝার জন্য। প্রতিনিধিদল যখন ফয়জুন্নেছার সাক্ষাৎপ্রার্থী হন, তখন তিনি জমিদারি দেখার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। সময়নিষ্ঠ জমিদার ফয়জুন্নেছা তাদের সাক্ষাৎ লাভের প্রার্থনা না মঞ্জুর করে হাতীতে আরোহন করে জমিদারি দেখতে বেরিয়ে যান। এতে প্রতিনিধি দল এতই বিমুগ্ধ ও সন্তুষ্ট হলেন যে তারা তাঁর জন্য ‘নওয়াব’ খেতাবই উপযুক্ত মনে করলেন।

১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে ও জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে কুমিল্লা সরকারিভাবে ‘নওয়াব’ খেতাব দেয়ার অভিষেক অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। এ শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানে তৎকালীন ৩৫,০০০ টাকা ব্যয় হয়। শুভেচ্ছার নির্দশনস্বরূপ তাঁকে মনোহর তারকাকৃতি হীরকখচিত একটি মহামূল্যবান পদক, রেশমী চাদর ও সার্টিফিকেট দেয়া হয়। সে সময়ের পুরুষের জমিদারগণ এ উপাধি নিয়ে অভিযোগ উত্থাপন করলে মহারাণী কর্তৃক  এ অভিযোগের জবাবে বলা হয় এটি কোনো মহিলা বা পুরুষের জন্য নয়, এটি কর্মের স্বীকৃতি।

তাঁর অন্তর্গত ক্ষরণ তাঁকে কবিত্ব যুগিয়েছে। নিজের বিদগ্ধ জীবনের রূপক চিত্র হয়ে উঠেছে “রূপজালাল” কাব্যের কাহিনী। “সঙ্গিত সার” ও “সঙ্গিত লহরী” নামে আরও দুটি কাব্যও তিনি রচনা করেছের। তিনি কোলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘সুধাকর’ ও ‘মুসলমান বন্ধু’ পত্রিকার পৃষ্ঠপোষকতা করেন।

ফয়জুন্নেছার প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় সবসময় একটা সুশৃঙ্খল নিয়ম নিষ্ঠা বিরাজ করত। তিনি শেষরাতে উঠে ওজু করে নামাজ আদায় করতেন। নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত শেষে আটটায় নাস্তা করতেন। তারপর আটটা থেকে ১১টা পর্যন্ত জমিদারির কাজকর্ম শেষ করে অন্দর মহলের পুকুরে গোসল ও সাঁতার কাটতেন। আহারাদি ও জোহরের নামাজ সেরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার জমিদারির কাজ করতেন। আছরের নামাজ পড়ে কিছু সময় সাহিত্য সাধন করতেন। ৭০ বছর বয়সে ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দের ২৩ সেপ্টেম্বর এই মহিয়ষী নারী পরলোক গমন করেন।

১৯ শতকের যে সময় মুসলমান নারীরা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন অবরোধবাসিনী, সে সময় জ্যোতির্ময়ীর মত নবাব ফয়েজুন্নেছার রীতিমত যেন অভ্যুদয় ঘটেছে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে এবং কর্মতৎপরতায় পুরুষ শাষিত সমাজের ভীতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন বেশ নিপুণভাবে। একুশ শতকে  এ জ্যোতির্ময়ী নারীর কীর্তিকে, ব্যক্তিস্বতন্ত্র্যকে দেখা হচ্ছে বহুমাত্রিক আঙ্গিকে। তাই কালের ধুলির স্পর্শ থেকে আরো বেশি দূরে সরে যাচ্ছেন তিনি। হয়ে উঠছেন জ্বলজ্বলে আলোর ঝর্নাধারা। আমরা সে আলোয় স্নাত হয়ে তার জয়গান গাই। হে জ্যোতির্ময়ী, তোমারি হউক জয়।

লেখক : প্রধান শিক্ষিকা, নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

পাঠককণ্ঠ বিভাগের লেখার মতামত একান্তই লেখকের। কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষের নয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা