kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অক্টোবর ২০১৯। ৩০ আশ্বিন ১৪২৬। ১৫ সফর ১৪৪১       

ডাকসু, জাকসু-কে কেন ঢাবিকেছাস, জাবিকেছাস বলা হবে না?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৬ মার্চ, ২০১৯ ১৮:৩২ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ডাকসু, জাকসু-কে কেন ঢাবিকেছাস, জাবিকেছাস বলা হবে না?

আমরা জানি ডাকসু, জাকসু বা চাকসুর মতো নির্বাচন থেকেই নেতা তৈরি হয়, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এখান থেকেই উঠে আসে। ঢাকসু, জাকসু নিয়ে অনেক আলোচনা হয়, সংবাদপত্রে পড়ি, টেলিভিশনে খবর শুনি, রাতের বেলায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা টেলিভিশনে আলোচনায় মেতে উঠেন এমনকি হাটে-বাজারে, রাস্তায়, গাড়িতে যখন সাধারণ মানুষদেরকে ডাকসু নিয়ে কথা বলতে দেখি বারবার আমার মনে প্রশ্ন জাগে এরা কি আসলে সবাই জানে ডাকসুকে কেন তারা ডাকসু বলেন বা জাকসুকেই বা কেন জাকসু বলা হয় ! তাদের কেউ কেউ জানলেও বেশীরভাগেরই হয়তো এ বিষয়টি অজানা! আমি ছোটবেলা থেকে ডাকসু, জাকসু শুনে আসলেও কখনো জানার চেষ্টা করিনি এই শব্দগুলো কিভাবে আসলো। শুধু জানতাম এটি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের একটি নির্বাচন যেখানে সকল শিক্ষার্থীরা ভোট দিতে পারে, ভোটে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারে। এককথায় এটাকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নির্বাচন বলেই আমি জানতাম। এটাও জানতাম ডাকসু বা জাকসু হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মন জয় করা না গেলে জীবনেও  নির্বাচনে পাশ করা যায়না। যাইহোক কথা সেটা নয়, কত বড় মাপের নেতা তৈরি হয়, কিভাবে পাশ করা যাবে কি যাবেনা, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে কি হয়নি সেটি নিয়ে আমি আলোকপাত করতে চাইনা! আমার কথা হলো ডাকসু/জাকসুর নাম নিয়ে!

আমি যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম তখন ভেবেছিলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই জাকসু নামটি হয়েছে, কারণ জাহাঙ্গীরনগর শব্দটির অদ্যাক্ষর   বর্গীয়-জ-আকার (জা) থাকার কারণেই ভেবে নিতাম এখান থেকেই জাকসু নামটি এসেছে। "জা" এর পরে "ক" এবং "সু" কিভাবে আসলো আগে কখনো এভাবে ভাবা হয়নি। কিন্তু মনের মধ্যে খটকা লাগলো জাহাঙ্গীরনগর এর আগে "জা" আছে এজন্য যদি জাকসু হয় তাহলে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তো "ঢা" দিয়ে শুরু, তাহলে সেটি ডাকসু হলো কিভাবে! ঢাকসু হলোনা কেন? ডাকসু/জাকসু শুনতে শুনতে নামটি আসলে এতো পরিচিত হয়ে গেছে যে ভালোমতো খেয়াল করে দেখা হয়নি কখনও। কিন্তু যখন মিলাতে গেলাম, মিলাতে গিয়ে দেখি আর পারিনা! আমাদের সময়ে যদি জাকসু নির্বাচন পেতাম তাহলে হয়তো আমার এই খটকা নাও লাগতে পারতো!

পত্রিকা উল্টাই সেখানেও পাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ এর পর প্রথম বন্ধনীর ভেতরে লিখা থাকে ডাকসু। যেমন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) ইত্যাদি। অবশ্য ইংরেজি পত্রিকার কথা আলাদা! তাদেরতো আর বাংলা লিখতে হয়না।

একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে এটি কাউকে জিজ্ঞাসা করতেও মনে মনে লজ্জা বোধ করছিলাম। আমি জানিনা এ লেখার পর আমাকে আবার কেউ লজ্জা দেয় কিনা যে এতোদিন পরে আমি ডাকসু, জাকসু কি এটা জানলাম। কিন্তু আমার কাছে এর চেয়েও বড় লজ্জা হলো আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ এর পরে ডাকসু লিখা নিয়ে ! আপনারা লক্ষ করলে দেখবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ভবনের গায়েই একপাশে বাংলায় লিখা আছেঃ  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু), এর নিচে ইংরেজিতে লিখা আছে  Dhaka University Central Students' Union (DUCSU) অন্যপাশে বাংলায় লিখা ডাকসু সংগ্রহশালা নিচে ইংরেজিতে DUCSU COLLECTION CENTER। সেইদিক দিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ভবনের লিখাটা আমার দৃষ্টিতে পুরোপুরি সঠিক। সেই ভবনে লিখা "কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ ভবন", জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,  স্থাপিত-১৯৭১-৭২ সন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ ভবনের লিখাটা সবচেয়ে অদ্ভুত। সেই ভবনটিতে সরাসরি মোটা কালিতে লিখা  "চাকসু ভবন"!

ভাষার জন্য যুদ্ধ করেছে পৃথিবীর একমাত্র দেশ আর তা আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। ২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।  কিন্তু এই দিবসটির সম্মান আমরা কতটুকু দেই বা দিতে পেরেছি? ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিতে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই ভাষার জন্য জীবন দিয়েছিলেন নিশ্চয়ই বাংলা ভাষাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে তার সংক্ষেপ নামে ডাকার জন্য বা লিখার জন্য নয়! এটা কি আমাদের জন্য লজ্জার নয়? আপনার সন্তান যদি জিজ্ঞাসা করে ডাকসুর পুরো নাম কি তাহলে আপনি কি জবাব দিবেন? নাকি উল্টো বলবেন তুমি জানো না! ডাকসু মানে ইয়ে ইয়ে, ডাকসু হলো ঐযে শুনেছ না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৮ বছর পর যে ইলেকশনটি হলো সেটিইতো ডাকসু!

এই লিখা লিখতে গিয়ে চিন্তা করলাম টেলিফোনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ও বর্তমান কিছু শিক্ষার্থীরদের নিয়ে একটা জরিপ করি, কে কিভাবে এর উত্তর দেয়। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হয় আমি যে কয়জনকে জিজ্ঞাসা করেছি কেউই এর উত্তর দিতে পারেননি। কেউ হয়তো বলবেন আমার নমুনা বাছাইয়ে ভুল ছিল, কেউ হয়তো বলবেন আমার নমুনার আকার ছোট ছিলো। যে যা কিছুই বলুক তার চেয়েও বড় কথা হলো আমার চিন্তার জায়গাটা সঠিক কিনা এটা আপনারা মন্তব্য করতে পারেন! শুনলে অবাক হবেন, অনেক হাস্যকর হাস্যকর উত্তর আমাকে শুনতে হয়েছে। চাইলে আপনিও আপনার পরিচিত কাউকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক শিক্ষার্থী আমাকে বললেন আগে ঢাকা বানান Dacca ছিলো সেখান থেকেই হয়েছে। জাবির একজন প্রথমে বলেন রাকসু, ডাকসু এর মতো করেই জাকসু হয়েছে! আচমকা আমার প্রশ্নে অনেকে বিব্রত হয়েছেন, কেউ কেউ না পেরে লজ্জিত হয়েছেন, কেউ বলেছেন এই নামটি শুনতে ভালো লাগে তাই হয়তো রাখা হয়েছে। আবার কেউ কেউ উল্টো আমাকেই প্রশ্ন করেছেন আমি পারি কিনা! আমি বিনয়ের সাথে উত্তর দিয়ে ধন্যবাদও পেয়েছি কারো কারো কাছ থেকে। সাধারণ এই কাজটি করতে গিয়ে আমি অনেক আনন্দও পেয়েছি।

সরকারি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশকিছু অনুজ, বন্ধু ও অগ্রজদের কাছে থেকে ভুল উত্তর পেয়েও আমি সামান্যতম অবাক হইনি! কিছুদিন আগে এটি আমার নিজেরও অজানা ছিলো। তাছাড়া এমন একটি উদ্ভট সংক্ষেপ নাম না জানাই ভালো যা কিনা বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে আবার সেই বাংলাই লিখতে হয়। তাহলে কিভাবে ডাকসু হলো সেটি এবার জানা যাক। 

Dhaka University Central Students' Union কে সংক্ষেপ করলে DUCSU হয়। আর এটাকে অনুবাদ করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ হয় । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ কে সংক্ষেপ করলে ঢাবিকেছাস হয়। সক্ষেপে যদি বলতেই হয় "ঢাবিকেছাস" বললে বা লিখলে কি ভুল হয়ে যাবে? আমাদের মান সম্মান কমে যাবে?

আমরা Jahangirnagar University  কে সংক্ষেপে JU বলি, লিখিও তাই; আর বাংলায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কে জাবি বা জাঃবিঃ লিখি। তদ্রূপ Dhaka Universityকে সংক্ষেপে DU লিখি আর বাংলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সংক্ষেপে ঢাঃবিঃ বা ঢাবি লিখি এটা কারো অজানা নয়। তাহলে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকে সংক্ষেপে  ঢাবিকেছাস বলতে বা লিখতে সমস্যা কোথায়? বরঞ্চ আমার মতে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ এর সংক্ষিপ্ত নাম ডাকসু লিখা ভুল! এভাবে সরাসরি ভুল বলা ঠিক হচ্ছে কিনা ভাষা বিশেষজ্ঞরা আরো ভালো বলতে পারবেন বলে আমি মনে করি। তবে আমার যুক্তিতে কোনোভাবেই ডাকসু /জাকসু/চাকসু/রাকসু খাটেনা। তবে মুখে বললে ভুল হবেনা এই যুক্তিতে যে Dhaka University Central Students' Union কে সংক্ষেপ করলেতো DUCSUই হয়।

এমনও যদি হতো আমরা বড় বাংলা নামের সংক্ষেপ একদম করিনা তাহলেও একটা কথা ছিলো। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি বাকৃবি লিখতে পারি ,  হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি হাবিপ্রবি লিখতে পারি,  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় যদি বশেমুরকৃবি লিখতে পারি, বলতে পারি তাহলে আমি মনে করি  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকে অবশ্যই  ঢাবিকেছাস বলা যেতে পারে। শুধু বলা যেতে পারে বললে ভুল হবে আমার মতে অবশ্যই বলা উচিত। 

তেমনিভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকে অবশ্যই জাবিকেছাস বলা উচিত বলে আমি মনে করি। এরমকম আরো অনেক সরকারি অফিসের উদাহরণ আমি দিতে পারবো।

লেখক: মো. ওয়াহিদুজ্জামান
জনসংযোগ কর্মকর্তা, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)

(এ বিভাগে প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নয়)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা