kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১                       

বিজিবি যেভাবে তাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানায়

মু. আব্দুল আউয়াল মুছুল্লী   

২৫ মার্চ, ২০১৯ ১৭:১৩ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



বিজিবি যেভাবে তাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানায়

মুক্তিযোদ্ধারা বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনকে করেছে গৌরবোজ্জ্বল ও মহিমান্বিত। দেশের আপামর সকল নাগরিকের কাছে এই মুক্তিযোদ্ধাদের গুরুত্ব অপরিসীম। বাঙালি জাতি এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জন্য গর্বিত এবং তাঁদের নিকট চিরকৃতজ্ঞ। তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি এবং শ্রদ্ধানিবেদন প্রত্যেক বাহিনীর কাছে তাই কিংবদন্তির অহংকার। 
 
এ দেশের মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায় এবং শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এঁর আহ্বানে এ দেশের আপামর জনতা মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দেশের মুক্তিকামী জনতার সাথে বিজিবি (তৎকালীন ইপিআর) মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে। মুক্তিযুদ্ধে এই বাহিনীর অকুতোভয় সদস্যরা অসীম মনোবল আর সামান্য সংখ্যক সাধারণ মানের অস্ত্র সম্বল করে যে অগাধ দেশপ্রেম, বীরত্ব ও সুমহান আত্মত্যাগের ইতিহাস রচনা করেন তা বিজিবি তথা বাঙালি জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে হানাদার বাহিনী আক্রমণ করে ঢাকার পিলখানাস্থ ইপিআর সদর দপ্তর। তৎকালীন ইপিআর বাহিনী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ওয়্যারলেসযোগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেয়। নিজস্ব ওয়্যারলেসযোগে প্রচারের এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করেন শহীদ সুবেদার মেজর (সিগন্যাল) শওকত আলী। 
 
বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা কয়েকজন ছাত্রনেতার মাধ্যমে পিলখানার ২ নম্বর গেটে তৎকালীন ইপিআর এর সুবেদার মেজর শওকত আলীর নিকট পৌঁছে। সুবেদার মেজর শওকত আলী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি পিলখানাস্থ ইপিআর ওয়্যারলেসযোগে টেলিগ্রাফিক মেসেজ এর মাধ্যমে কোম্পানি হেড কোয়ার্টার, চট্টগ্রামে প্রেরণ করেন। চট্টগ্রামে ইপিআরের কর্তব্যরত সিগন্যালম্যান মোঃ আবুল খায়ের মেসেজটি গ্রহণ করেন এবং ইপিআর এর বাঙালি এ্যাডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন রফিক এর নিকট হস্তান্তর করেন। স্বাধীনতার ঘোষণা-বার্তাটি প্রেরণের অপরাধে সুবেদার মেজর শওকত আলীকে পিলখানাস্থ বাসা থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আটক করে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা-বার্তা প্রেরণকারী এই দুঃসাহসী বীরযোদ্ধাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষা কলেজে নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত অমানুষিক নির্যাতন করে এবং পরবর্তীতে তাঁকে হত্যা করা হয়। সুবেদার মেজর শওকত আলীর প্রেরিত বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি ইপিআর সিগন্যাল সেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে যায় সারা দেশের সীমান্ত বিওপিতে। যা ইপিআর সদস্য ছাড়াও মুক্তিকামী জনতাকে সংগঠিত হতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 
 
১৯৭১ সালের ২৩ শে মার্চ বঙ্গবন্ধু ৩২ নম্বর ধানমণ্ডির বাড়িতে মুক্তিকামী উৎফুল্ল জনতার মাঝে স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলে ধরেন। একই দিনে তৎকালীন ইপিআর (বর্তমান বিজিবি) সদর দপ্তরে মুক্তিকামী জোয়ানরাও স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। ইপিআর এর বাঙালি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদাপূর্ণ সাহসী এ কাজের জন্য এ বাহিনীর (বিজিবি) প্রত্যেক সদস্য আজ গর্বিত। 
 
মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে ইপিআর এর বাঙালি সদস্যরা রণকৌশলগত কারণে বুড়িগঙ্গা নদীর অপর তীরে জিঞ্জিরায় প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তৎকালীন ইপিআর এর বাঙালি সৈনিকেরা ১১টি সেক্টরে ৯ মাস যুদ্ধে নিয়োজিত থাকেন। ইপিআর এর প্রায় ৮ হাজার বাঙালি সদস্য সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, যশোর, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, রংপুর ও সিলেটে ইপিআর এর বাঙালি সদস্য ও পাক বাহিনীর মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। ইপিআর এর বাঙালি সৈনিকদের এ বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা বাংলাদেশের জনগণকে অধিকতর সংঘটিত হয়ে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মধ্যদিয়ে রণাঙ্গনে লড়াই করার সাহস যুগিয়েছে। দেশের প্রতিটি সেক্টর ও উইং হেডকোয়ার্টারের বাঙালি অফিসার, জেসিও এবং বিভিন্ন পদবির সৈনিকেরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধ, গেরিলা যুদ্ধ, আত্মঘাতী আক্রমণ ও শত্রুঘাঁটি নিশ্চিহ্ন করতে অসংখ্য দুর্ধর্ষ অপারেশন পরিচালনা করেন। 
 
মুক্তিযুদ্ধে অপরিসীম বীরত্বের জন্য এ বাহিনীর দু’জন সৈনিক সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত হন। তাঁরা হলেন শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ এবং শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ। তাঁদের বীরত্বগাথা এ বাহিনী তথা বাঙালি জাতিকে করেছে গৌরবান্বিত। নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৫৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল্স (ইপিআর) এ যোগ দেন। তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ৮ নম্বর সেক্টর, যশোরের অধীনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ২৫ মার্চ ১৯৭১ এর পর যখন মুক্তিবাহিনীকে সুসংগঠিত করা শুরু হয় তখন তিনি যশোর জেলার ঝিকরগাছা থানার গোয়ালহাটি গ্রামে স্থাপিত একটি ক্যাম্পের অধিনায়কের দায়িত্ব পান। ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৭১ সালের ০৫ সেপ্টেম্বর গোয়ালহাটি গ্রামের এক প্রান্তে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে শহীদ হন। তিনি দু'জন সঙ্গী নিয়ে গোয়ালহাটি গ্রামের অনতিদূরে ছুটিপুর ঘাঁটি টহল দেয়ার সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁদের আক্রমণ করে। নূর মোহাম্মদ শেখ তাঁর টহল দলটিকে রক্ষার প্রাণপণ চেষ্টা করেন।  হানাদার বাহিনীর গুলিতে সহযোদ্ধা নান্নু মিয়া গুরুতর আহত হলে নূর মোহাম্মদ শেখ হাতে এলএমজি এবং কাঁধে গুরুতর আহত সঙ্গীকে নিয়ে শত্রুবাহিনীর দিকে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে নিরাপদ জায়গায় যেতে থাকেন। হঠাৎ শত্রুর দুই ইঞ্চি মর্টারের আঘাতে তাঁর হাঁটু ভেংগে চুরমার হয়ে যায়। তাঁর সঙ্গীরা যেন প্রতিরক্ষা ঘাঁটিতে পৌঁছাতে পারেন সেজন্য মর্মান্তিক আহত অবস্থায়ও নূর মোহাম্মদ শেখ গুলি চালাতে থাকেন এবং এক সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। যশোরের শার্শা থানার কাশিপুর গ্রামে এই বীর যোদ্ধাকে সমাহিত করা হয়। ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ নিজের প্রাণের বিনিময়ে সহযোদ্ধাদের জীবনরক্ষা করেছিলেন। তাঁর এই অপরিসীম বীরত্ব, সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করে। 
 
এ বাহিনীর অপর বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ ১৯৬৩ সালের ০৮ মে তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল্স (ইপিআর) এ সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। তিনি ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামে ১১ নম্বর উইং-এ নিয়োজিত থেকে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে ৮ম ইস্ট বেঙ্গলের একটা অংশ এবং তৎকালীন ইপিআরের কিছু বাঙালি সদস্য পার্বত্য চট্টগ্রামে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধকালে মুন্সী আব্দুর রউফ কোম্পানির মেশিন গানার হিসেবে রাঙ্গামাটির মহালছড়ি নৌপথে প্রহরারত ছিলেন। কোম্পানিটি বুড়িঘাট চিংড়ি খাল পাড়ের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত ছিল। ০৮ এপ্রিল শত্রু পক্ষের ২য় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের একটি কোম্পানি, ৬টি ৩ ইঞ্চি মর্টার ও ৩টি লঞ্চ নিয়ে প্রতিরক্ষা এলাকায় ঢুকে পড়লে ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ তাঁর নিজের অবস্থান থেকে একাই শত্রু পক্ষের ২টি লঞ্চ ও ১টি স্পীড বোট পানিতে ডুবিয়ে দেন। ফলে প্রায় ২ প্লাটুন শত্রু সৈন্য সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়। আচমকা শত্রুবাহিনীর মর্টারের গোলার আঘাতে নানিয়ার চরের বাছড়ি নামক স্থানে তিনি শাহাদতবরণ করেন। বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধি পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচরে। তাঁর অপরিসীম বীরত্ব, সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করে। 
 
এ বাহিনীর অহংকার বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ ও বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের সম্মানে পিলখানাস্থ দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ এবং বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ। এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাঁদের জন্য ও শাহাদত বার্ষিকী উৎযাপন অনুষ্ঠানে স্বজনদের বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানোর মধ্যদিয়ে সম্মানিত করা হয়ে থাকে। এছাড়া এ বাহিনীর আরো ৮ জন বীর উত্তম, ৩২ জন বীর বিক্রম, ৭৭ জন বীর প্রতীক খেতাব অর্জন করেন। মুক্তিযুদ্ধে এই বাহিনীর মোট ৮১৭ জন বীর সৈনিক শাহাদতবরণ করেন। এই বাহিনীর অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এ বাহিনীকে ‘স্বাধীনতা পদক ২০০৮’ প্রদান করেন। 
 
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজিবি (তৎকালীন ইপিআর) সৈনিকদের হিমালয় সদৃশ মনোবল, অতুলনীয় দেশপ্রেম ও চরম আত্মত্যাগ আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস। দেশমাতৃকার সেবায় নিয়োজিত বিজিবি’র সৈনিকেরা তাদের পূর্বসূরী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের মহিমায় গর্বিত ও অনুপ্রাণিত। তাই এ বাহিনী দায়িত্ব ও কর্তব্য বোধ থেকে তার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সর্বদা আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানিয়ে থাকে। 
 
প্রতি বছর বিশেষ করে বিজিবি দিবস উপলক্ষে এ বাহিনী’র বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যগণকে সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। বাহিনীর সদর দপ্তরসহ রিজিয়ন, সেক্টর ও ব্যাটালিয়ন পর্যায়ের আওতাধীন অঞ্চলে বসবাসকারী অত্র বাহিনীর খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যগণকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিশেষ করে বিজিবি সদর দপ্তরে মুক্তিযোদ্ধাগণের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এ বাহিনীর দুইজন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ এবং শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ এঁর পরিবারের সদস্যগণকে বিশেষভাবে সম্মান জানানো হয়ে থাকে। ঢাকা অঞ্চলে বসবাসকারী অত্র বাহিনীর অন্যান্য খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যগণকেও একইভাবে সংবর্ধিত করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাগণের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজনের এ উপলক্ষ এ বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে একটি উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বাহিনী প্রধান নিজে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যসহ অন্যান্য জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সরাসরি শুভেচ্ছা বিনিময় করে থাকেন। তাঁদের কুশলাদি অবহিত হয়ে তাঁদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বিজিবি সদর দপ্তরের পাশাপাশি ঢাকার বাহিরেও বিজিবি’র রিজিয়ন, সেক্টর ও ব্যাটালিয়ন পর্যায়েও অনুরূপ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। যেখানে সংশ্লিষ্ট রিজিয়ন কমান্ডার, সেক্টর কমান্ডার ও ব্যাটালিয়ন কমান্ডারগণ সরাসরি বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় ও কুশলাদি অবহিত হয়ে থাকেন। 
 
প্রতি বছর বিজিবি’র বিভিন্ন ইউনিট পর্যায়ে এ বাহিনীর খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা প্রদান করা হতো। কিন্তু গত বছর ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে প্রথমবারের মতো বিজিবি’র খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাসহ বিজিবি’র সকল জীবিত মুক্তিযোদ্ধাগণকে বিজিবি সদর দপ্তরে আমন্ত্রণ জানিয়ে সেখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর উপস্থিতিতে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। শহীদ এবং পরলোকগত মুক্তিযোদ্ধার পক্ষে তাঁর পরিবারের প্রতিনিধিগণও উক্ত  অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। বিজিবি সদর দপ্তরে প্রথমবারের মতো বৃহৎ পরিসরে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি বিজিবি’র সকল মুক্তিযোদ্ধাগণের মিলন মেলায় পরিণত হয়। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং বিজিবি মহাপরিচালক উপস্থিত থেকে অত্যন্ত আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশে প্রত্যেকের সাথে কথা বলেন এবং তাঁদের কুশলাদি অবহিত হন। বিজিবি’র মুক্তিযোদ্ধাগণকে কেন্দ্রীয়ভাবে একই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সম্মান জানাতে পেরে বিজিবি প্রধানসহ বাহিনীর সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সদস্যবৃন্দ গৌরবের আনন্দে প্রীত হয়েছেন। বিজিবি’র মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যগণ বিজিবি সদর দপ্তরে এই অনুষ্ঠান আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং বিজিবি মহাপরিচালক অনুষ্ঠানে উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন সমস্যার কথা অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শোনেন এবং সেগুলো সমাধানে বিজিবি তথা সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সকল প্রকার সহায়তা প্রদানের ব্যাপারে তাঁদের আশ্বস্ত করেন।
 
মুক্তিযোদ্ধাগণের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের এই আয়োজনের মাধ্যমে বাহিনীর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরবগাথা সম্পর্কে এ বাহিনীর বর্তমান সদস্যরা সরাসরি জানার সুযোগ পেয়ে থাকেন। এভাবে এ বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের পূর্বসূরীদের বীরত্বের নিদর্শন নিজেদের মধ্যে ধারণ করার জন্য অনুপ্রাণিত হন। শুধু প্রথাগত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সমস্যাদি জেনে তাঁদের পাশে থেকে এ বাহিনী কল্যাণমূলক কাজও করে থাকে। বিজিবি’র নিজস্ব তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তাসহ তাঁদের ঘর-বাড়ি নির্মাণ ও মেরামতে সহায়তা করা হয়। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য বিজিবি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা প্রদান, তাঁদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের শিক্ষাবৃত্তি প্রদানসহ নানাবিধ কার্যকর ও কল্যাণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়ে থাকে। প্রতি বছর বাহিনীর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানানোর আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াও তাঁদের কল্যাণে সারা বছর তাঁদের পাশে থাকার পদক্ষেপ নিতে পেরে বিজিবি’র বাহিনী প্রধান থেকে শুরু করে প্রতিটি সদস্য নিজেদের ধন্য ও কৃতার্থ মনে করে। এ বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাগণ যেভাবে দেশমাতৃকার প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগের নিদর্শন স্থাপন করেছেন তেমনি বিজিবি’র বর্তমান সদসগণও সীমান্ত রক্ষায় তাঁদের উপর অর্পিত মহান দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে বদ্ধপরিকর। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দায়বদ্ধতা থেকে বিজিবি’র গৃহীত পদক্ষেপগুলো সত্যিই প্রশংসনীয়। যা দেশবাসীর কাছে প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে।  
 
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ, পিলখানা, ঢাকা।
 
(পাঠকের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নন।)
 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা