kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

কাতার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ মসজিদে বাংলাদেশি খতিব

মাহমুদুল হাসান    

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১৮:০২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কাতার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ মসজিদে বাংলাদেশি খতিব

কাতারের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ মসজিদের বাংলাদেশি খতিব সাইফুল ইসলাম। বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের নয়নপুর পৌরসভার বাসিন্দা ডা. ওয়ালিউর রহমান ও জাহেরা বেগমের সন্তান। ৯ ভাই-বোনের তিনি সপ্তম। স্থানীয় স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর তিনি মাদরাসায় ভর্তি হন। দেশের খ্যাতিমান কোরআনে হাফেজ মাওলানা আবদুল হকের কাছে হিফজুল কোরআন সম্পন্ন করেন। ২০১১ সালে দাওরা হাদিস (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেন। ২০১০ সালে দাখিল ও ২০১২ সালে জিপিএ-৫ পেয়ে আলিম (এইচএসসি) পাস করেন। স্কলারশিপ নিয়ে কাতার ইউনিভার্সিটিতে গমন করেন। ২০১৭ সালে সেখান থেকে ইসলামিক স্টাডিজে অনার্স সম্পন্ন করেন।

মধ্যপ্রাচ্যের উন্নত দেশ কাতারের আমিরের (প্রেসিডেন্ট) রাজকীয় প্রাসাদ মসজিদে নিয়মিত খুতবা দিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন হাফেজ মাওলানা সাইফুল ইসলাম। সাফল্যের গল্পটা শুরু ২০০৪ সালে। সে বছর দুবাই হলি কোরআন অ্যাওয়ার্ডে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন তিনি। এরপর ২০১০ সালে আসে আরো বড় সাফল্য। জর্দানে ৬০টি দেশের সম্মিলিত তাফসিরুল কোরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণ করে ছিনিয়ে আনেন প্রথম স্থানের মুকুট। তখন তিনি বাংলাদেশে দাওরায়ে হাদিসের ছাত্র। দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করার পাশাপাশি ইন্টারমিডিয়েট পাস করে কাতার ইউনিভার্সিটিতে স্কলারশিপ লাভ করেন। ২০১২ সাল থেকে চার বছর মেয়াদে সেখানে অনার্স সম্পন্ন করেন। 

২০০৪ সালে দুবাই হলি কোরআন অ্যাওয়ার্ড জয়ের পর থেকে রাজপরিবারের সদস্য আবদুল আজিজ বিন খালেদ আবদুল্লাহ আল-থানি তাঁকে নিয়মিত কাতারে আমন্ত্রণ করতেন। প্রতিবছর আসা-যাওয়ার টিকিট ও আনুষঙ্গিক খরচসহ দুইবার তাঁকে কাতার নিয়ে যাওয়া হতো। প্রথমবার যেতেন পরীক্ষার ছুটিতে মাত্র এক সপ্তাহের আনন্দভ্রমণে। দ্বিতীয়বার যেতেন রমজান মাসে। সেখানে রাজপরিবারের সদস্যদের তারাবির নামাজে তিনি ইমামতি করতেন। 

২০১৫ সালে কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় রমিলার সেনাবাহিনীর অফিসারদের ২০৭ নাম্বার মদজিদে কাতারের ধর্ম মন্ত্রণালয় এর অধীনে কঠিন প্রতযোগিতামূলক পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে খতিব হন তিনি। সেনাবাহিনীর মসজিদটিতে প্রদানকৃত তাঁর খুতবাগুলো রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের মনে ছুঁয়ে যায় বেশ।

২০১৭ সালের রমজানে হঠাৎ ফোন করে তাঁকে জানানো হয়, প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ মসজিদে জুমার খুতবা দিতে হবে। সেখানে কাতারের প্রেসিডেন্ট ও রাজপরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত থাকবেন। এমন গুরুদায়িত্ব সম্পর্কে ফোন পাওয়ার পর বেশ চিন্তায় পড়ে যান তিনি। মনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও অজানা শঙ্কা ডালপালা গজাতে শুরু করে। কিন্তু জুমার দিন আগেভাগে কর্তৃপক্ষ গাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার পরে মনে আশার সঞ্চার হয়। মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকেন তিনি।

২০১৭ সালের ২৯ জুলাই প্রথমবারের মতো খুতবা দেন তিনি। রাজপরিবার ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ মুগ্ধ হন তার খুতবায়। জানানো হয়, তিনিই এখন থেকে কাতার আমিরের প্রাসাদের নিয়মিত খতিব। সেই থেকে এ গুরুদায়িত্ব পালন করে আসছেন বাংলাদেশের কৃতিসন্তান হাফেজ কারি মাওলানা সাইফুল ইসলাম। 

বিদেশে অবস্থানরত সাইফুল ভুলে যাননি প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে। দেশের হাফেজদেরকে বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার মতো মানসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠা করেছেন এক প্রতিষ্ঠান। মারকাজুত তানজিল আল ইসলামিয়া ইন্টারন্যাশনাল নামে ঢাকার শনিরআখড়ায় আন্তর্জাতিক মানের কওমি ও হিফজুল কোরআন মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। মারকাজুত তানযীলে রয়েছে- আন্তর্জাতিক হিফজ রিভিশন বিভাগ। এ বিভাগে অধ্যয়রত শিশু কিশোররা আন্তর্জাতিক মানের হাফেজ হয়ে গড়ে উঠেন। বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাগুলোতে তারা সহজেই অংশ গ্রহণের জন্য উপযোগী হয়ে যায়। রয়েছে হিফজ বিভাগ। মানসম্মত এ হিফজ বিভাগে সীমিত আসনে শিক্ষার্থী নেয়া হয়ে থাকে। এ প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা বিগত বছরগুলোতে বোর্ডে শীর্ষ স্থান দখলের কৃতিত্ব অর্জন করেছে। শিশুদের জন্য আদর্শ নুরানি মক্তব। 

বিগত বছরগুলোতে বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নিয়ে- ১ম, ২য়, ৩য় স্থান লাভ করেছে এ মাদরাাসার শিশুরা। জাতীয় পর্যায়ের একাধিক কুরআনে কারিম তেলাওয়াতের প্রতিযোগিতায় পুরস্কার লাভ করেছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা আলোকিত মানুষ গড়ে বিশ্বব্যাপী দ্বিনের সেবার পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তি পৃথিবীময় উজ্জ্বল করবে বলে তিনি স্বপ্ন দেখেন হাফেজ সাইফুল। তিনি কাতারে অবস্থান করলেও সেখানে থেকেই স্কাইপের মাধ্যমে নিয়মিত ক্লাস নেন এবং দেশ-বিদেশের আন্তজার্তিক ক্বারী ও শায়েখরাও নিয়মিত সরাসরি ও স্কাইপের মাধ্যমে মাশক্ব ও অন্যান্য বিষয়ে পাঠদান করেন। প্রতিষ্ঠাতা নিজে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হাফেজ হওয়ায় এখানে পড়ুয়া শিশুদের খুব যত্নের সঙ্গে আদর্শবান ও আন্তর্জাতিক মানের হাফেজ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন।

গত ৮ ডিসেম্বর দেশে আসেন তিনি। অল্প কিছুদিনের জন্য ছুটি নিয়ে দেশে এলেও তিনি বসে নেই। কোরআনের আলো ও জ্ঞান নিয়ে ছুটে চলছেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরে বক্তব্য রাখছেন তিনি। সুমধুর কণ্ঠে কুরান তিলাওয়াত এবং সাবলীল ভাষায় বক্তব্য রেখে মুগ্ধ করছেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের। 

আরবি ভাষায় বক্তৃতা দেওয়ার প্রতি তাঁর ছোটবেলা থেকেই আলাদা টান ছিল। আরবদের স্টাইলে কথা বলতে চাইতেন। তাদের বাচনভঙ্গি অনুসরণ করতেন। এতে করে তাঁর বক্তৃতাশৈলী সুন্দর হয়ে ওঠে। 

দেশ-বিদেশে সাফল্যও অর্জন হাফেজ কারি সাইফুল ইসলামের দেশ-বিদেশে অনেক সাফল্য রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তিনি অনেক পুরস্কার জিতেছেন। তার মধ্যে ২০০৪ সালে দুবাই আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান, ২০১০ সালে জর্দানে আন্তর্জাতিক তাফসিরুল কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান, ২০০৪ সালে সৌদি আরবে আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় চতুর্থ স্থান, ২০০৯ সালে ইরান আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় চতুর্থ স্থান, ২০১৫ সালে আবারও জর্দানে আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে বিদেশে দেশের মান উজ্জ্বল করেন। 

হাফেজ সাইফুলরা দেশের সম্পদ। নীরবে দেশের সম্মান বাড়াচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এদের সম্মান করা দরকার। 

(পাঠকের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নন।)

মন্তব্য