kalerkantho

এ কেমন সাংবাদিকতা চলছে দেশে?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১৪:৩১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এ কেমন সাংবাদিকতা চলছে দেশে?

ছবি প্রতীকী

শব্দের চেয়ে ঘটনার প্রতাপ ও প্রচণ্ডতা  বেশি। শব্দের এই সীমাবদ্ধতাকে নিয়েই সাংবাদিকতা। তবু ঘটনা ও শব্দের মেলবন্ধনের সেতু তৈরির এক অবিরাম প্রচেষ্টা সাংবাদিকদের।

নতুন তথ্যবহুল সম্প্রতিক ঘটনা বা  কোনো ব্যক্তি-বিষয় যা যথেষ্ট আগ্রহ উদ্দীপক এবং জনগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়-তাই খবর। এই সংজ্ঞা সবার জানা। তথ্য-প্রযুক্তির তড়িৎ উন্নয়নের ফলে অসংখ্য সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, পাচ্ছে এবং পাবে। তার জন্য প্রচুর খবরের অপরিহার্যতা দেখা দিয়েছে। অপ্রতুল সংবাদ এবং সাংবাদিকের কারণে সংবাদ নয় কিন্তু ‘খবর’ বানিয়ে প্রকাশ করা হয়। যার ফলে আসল খবরও অনেক সময় গুরুত্বহীন হয়ে ওঠে। পাঠকের এত সময় নেই, কোনটি সংবাদ আর কোনটি সংবাদ নয় তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার।

সপ্তাহ দেড়েক পরেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় থেকে জাতীয় গণমাধ্যম প্রত্যেকে নিজেদের ‘মার্কা’কে বিজয়ী করানোর জন্য যার পর নাই চেষ্টা করে যাচ্ছে। নিজের ‘মার্কার’ প্রার্থীর সত্য-মিথ্যা সুনাম আর বিপরীতের বদনাম যেন গণমাধ্যমগুলোর নিত্যদিনের কাজে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তি হিসেবে কে কতটা যোগ্য বা অযোগ্য তা দেশের অধিকাংশ মানুষ চিন্তাই করতে চায় না। তার প্রতিফলনই হয়ত পড়েছে সাংবাদিক আর গণমাধ্যমের ওপর। দু’একটি পত্রিকা চেষ্টা করে নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের। তাদেরকে আবার দুই জোটের বা দলের মানুষ বিপরীত দলের দালাল বলতে কুণ্ঠাবোধ করে না। জরিপে দেখা গেছে দেশের সাধারণ মানুষের চেয়ে দুই দলের লোকই পরিমাণে বেশী। এতে করে করে সাধারণ মানুষ হচ্ছে বিভ্রান্ত।

আমেরিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেমন বিশ্বব্যাপী সমাদৃত তেমনি গণমাধ্যমও। এখানকার স্থানীয় বা জাতীয় নির্বাচনে তাদের পত্রিকাগুলোর ভূমিকা কেমন হয়? পত্রিকাগুলো তাদের পছন্দের প্রার্থীকে সম্পাদকীয় লেখে তাদের সমর্থনের কথাও জানান দেয়। কেউ কেউ ভেবে বসতে পারেন তাহলে তো এরা বাংলাদেশের পত্রিকা হতেও খারাপ । জ্বী না। আমেরিকান পত্রিকাগুলো প্রার্থীকে ‘দলকানা’র মতো সমর্থন দেয় না। তারা প্রার্থীর দোষ-গুণ স্বীকার করেই তাকে সমর্থন দেয়। পত্রিকায় ব্যক্তি সম্পর্কে সম্পাদকীয় দিয়েই এখানকার পত্রিকার দায়িত্ব শেষ করে। তারা বাংলাদেশের সাংবাদিক এবং গণমাধ্যমের মতো মার্কা নিয়ে মাঠে নেমে পড়ে না। এমনকী পুরো পত্রিকার কোনো সংবাদে প্রার্থী সমর্থনের কোনো প্রতিফলনও দেখা যায় না। বিপরীতের বদনাম তো অনেক দূরের ব্যাপার।

মিডিয়া নাকি সোশাল মিডিয়া বেশি কার্যকর তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে যে বিষয়ে মানুষের আগ্রহ আছে তা সবার কাছে পৌঁছে যায় কোনো না কোনো উপায়ে। সাম্প্রতিক #মি-টু নিয়ে যে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে এটি তার প্রমাণ। যদিও #মি-টু নিয়ে প্রধান পত্রিকা গুলোতে তেমন কোনো সংবাদ দেখা যায়নি।

আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশন নিয়ে একটি প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশে জনসাধারণের কী লাভ হয়? যে পদ্ধতিতে মানুষটি আত্মহত্যা করেছে তা বর্ণনা করার-ই কী প্রয়োজন? আত্মহত্যার পদ্ধতি বর্ণনা করার ফলে মানুষ মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে এক প্রকার সহানুভূতি দেখায়। আমরা জানি, যারা আত্মহত্যা করে তারা মূলত একটি ঘোরের মধ্যে থেকে কাজটি সম্পন্ন করে। মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে মানুষের এ সকল সহানুভূতি দেখে আশে-পাশের আত্মহত্যাপ্রবণরা আরো আগ্রহী হয়ে ওঠে। সাধারণ আত্মহত্যার কারণ এবং সংবাদ পরিবেশন না করে  যে আত্মহত্যাটি অন্য কারোর প্ররোচনায় হয়েছে তা নিয়ে অনুসন্ধানী সংবাদ পরিবেশন করা প্রয়োজন। অনেক সংবাদে দেখা যায় খুব তুচ্ছ কারণে কেউ কেউ আত্মহত্যা করে থাকেন। এই তুচ্ছ কারণ দেখে অনেকে নিজেদের অাত্মহত্যা করার যৌক্তিক ভিত তৈরী করে। অাত্মহত্যা প্রতিরোধে যে সংস্থাগুলো কাজ করেছে তাদের নিয়েও প্রতিবেদন করা উচিত।

সাংবাদিকতায় ‘বস্তুনিষ্ঠতা’র অভাব। এ নিয়ে সুশীল সমাজের মানুষসহ সর্বসাধারণকে সমালোচনা করতে  দেখা যায়। কথা অনেকাংশে সত্য। কিন্তু বিশ্বব্যাপী  পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অন্য পেশার তুলনায় যত সাংবাদিক মৃত্যুবরণ করেছেন তা কোনোভাবেই নগণ্য নয়।

বাংলাদেশের সংবিধানে গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। চতুর্থ স্তম্ভের এই ভার বহন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে আধুনিক, সুন্দর এবং সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে সাংবাদিকরা অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন এই প্রত্যাশা।

-- তোফাজ্জল লিটন নাট্যকার ও সাংবাদিক

(পাঠকের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নন)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা