kalerkantho


ঝুলে থাকা তারের জঞ্জাল ও আমাদের কাণ্ডজ্ঞান

ওমর শরীফ পল্লব   

১৬ নভেম্বর, ২০১৮ ১৪:১২



ঝুলে থাকা তারের জঞ্জাল ও আমাদের কাণ্ডজ্ঞান

শুধু তারই নয়, তারগুলোর সঙ্গে অসংখ্য কয়েলও রাস্তায় ঝুলিয়ে রাখা হয়

রাজধানীর বুকে বিদ্যুতের খুঁটিগুলোই ছিল বেখাপ্পা। সেগুলোতে ডিশ আর ইন্টারনেটের তারগুলো জড়িয়ে ক্রমে যে অবস্থা করা হয়েছে তা খুবই দৃষ্টিকটু ও বিপজ্জনক। ২০১০ সালেই তারগুলো ভূগর্ভে সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় একটি তারিখও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা আর হয়ে ওঠেনি।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর সর্বত্রই বিদ্যুত ও টেলিফোনের খুঁটিগুলোতে বিপজ্জনকভাবে তারের জট ঝুলছে। কোথাও ফুটপাত বা রাস্তায় নেমে এসেছে তারের লাইন। ঝুলে থাকা এসব তারের মাধ্যমেই মাঝে মাঝে ঘটছে নানা দুর্ঘটনা।

শুধু তারই নয়, তারগুলোর সঙ্গে অসংখ্য কয়েলও রাস্তায় ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। এগুলো মাথার ওপর জঞ্জালের মতো জমে নষ্ট করছে ঢাকার সৌন্দর্যও।

কাণ্ডজ্ঞানের অভাব

রাস্তায় বিদ্যুতের খুঁটিতে এত বিপুলসংখ্যক তার জমে ওঠার একটি বড় কারণ হলো কেবল ও ইন্টারনেট অপারেটরদের কাণ্ডজ্ঞানের অভাব। তারগুলো সুশৃঙ্খলভাবে টানা হলে এবং অসংখ্য কুণ্ডলি পাকানো তার (কয়েল) ঝুলিয়ে না রাখলে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও ভালো হত। যদিও এসব বিষয়ে কোনো সচেতনতা দেখা যায় না তাদের মাঝে। নগর কর্তৃপক্ষও এসব ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

রাজধানীর মতিঝিল, গুলশান, নিকেতন ও মহাখালীসহ বেশ কিছু এলাকায় শতভাগ ভূগর্ভস্থ ক্যাবল অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। তবে বাস্তবে বিভিন্ন ডিশ, ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ অপারেটরের অনিচ্ছার কারণে তারগুলো ভূগর্ভে নেওয়ার কাজটি সফল হয়নি।

রাজধানীতে ইন্টারনেট আর কেবল টিভির তার মাটির নিচ দিয়ে নেওয়ার কথা প্রায় এক দশক আগে থেকেই চলছে। সরকারের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা মানছেন না ব্যবসায়ীরা। ফলে তারগুলো ঝুলানোই থাকছে। আর সেই ঝুলানো তারের নিচ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন সাধারণ পথচারীররা। কোথাও কোথাও তারের ভারে কাত হয়ে পড়েছে খুঁটি। তারের জটলা হাঁটার সময় পথচারীদের মাথাও ছুঁয়ে যায়। এতে যে কোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। ইতোমধ্যেই বেশ কিছু দুর্ঘটনা ঘটেছে।

সড়কগুলো থেকে বিপজ্জনক তার অপসারণ করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অভিযান চালালেও কয়েক দিন পরেই ফিরে আসে আগের রূপ। ফলে কার্যত ভোগান্তি কমে না।

অপ্রয়োজনীয় তার ঝুলছে প্রচুর
যেসব তার রাস্তায় ঝুলানো থাকে তার সবগুলোই প্রয়োজনীয় নয়। বিশেষ করে ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান করার কাজে ব্যবহৃত তারগুলো একবার ব্যবহারের পর সেগুলো অপারেটররা আর খুলে নেয় না। পুরনো তার খুলে নেওয়া কষ্টসাধ্য, তাই এগুলো রাস্তাতেই ফেলে রাখা হয়। এছাড়া পুরনো তার প্রায়ই ব্যবহারের উপযোগী থাকে না। কোনো তার মাঝপথে কাটা পড়লে কিংবা গ্রাহক সংযোগ বন্ধ করে দিলেও এগুলো রাস্তায় থেকে যায় বছরের পর বছর। এগুলোর কোনো কোনোটি রাস্তায় মানুষের ও যানবাহনে লেগে দুর্ঘটনার কারণ হয়।

সমাধান রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিতে
টিভি সংযোগের জন্য এখন বহু দেশেই স্যাটেলাইট রিসিভার ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলোর জন্য কোনো তারের প্রয়োজন হয় না। বাড়ির বারান্দায় বা ছাদে একটি ছোট ডিশ অ্যান্টেনার মতো রিসিভার স্থাপন করতে হয়। এতে বাড়তি তারের ঝামেলা হয় না। ভারতেও এ পদ্ধতি প্রচলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট চালু হওয়ায় এ সুবিধা নিতে এখন বাংলাদেশকে বিদেশি স্যাটেলাইটের ওপরও নির্ভর করতে হবে না।

ইন্টারনেট সংযোগের জন্য ফাইবার অপটিক কেবল লাইনের বিকল্প রয়েছে। উচ্চগতির মোবাইল নেটওয়ার্ক হতে পারে এর একটি সমাধান।

বিকল্প হিসেবে রয়েছে ওয়াইম্যাক্স ইন্টারনেটেরও ব্যবস্থা। বর্তমানে ব্যয়বহুল হওয়ায় গ্রাহকের অভাবে এ সার্ভিস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কিছুটা ব্যয়বহুল হলেও গ্রাহকসংখ্যা বাড়লে পরিচালনা ব্যয়ও কমে আসবে ওয়াইম্যাক্স সেবাদাতাদের। তখন কম খরচেও এ সার্ভিস দেওয়া সম্ভব।

এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় ওয়াইফাইয়ের রেঞ্জ বাড়িয়ে তাও স্থানীয় গ্রাহকদের মাঝে ঝামেলামুক্তভাবে বিতরণ করা যায়। এতে প্রতি এলাকায় একটি করে বেস স্টেশন বানাতে হবে, যেজন্য সংযোগের প্রয়োজন হলেও বাড়ি বাড়ি তারের সংযোগ দিতে হবে না। ফলে অধিকাংশ তারের ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকা যাবে।

বিদেশের অভিজ্ঞতা
বিদেশে নগর কর্তৃপক্ষ কঠোরভাবে মনিটরিং করে যেন কোনোভাবেই শহরের সৌন্দর্য নষ্ট না হয়। প্রতিটা এলাকায় ভূগর্ভস্থ ক্যাবল লাইন টানার জন্য ব্যবস্থা রাখা হয়। এছাড়া সেখান থেকে বাড়ি পর্যন্ত কেবল নেওয়ার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হয় যেন কোথাও সৌন্দর্য নষ্ট না হয়। রাস্তায় কয়েল ঝুলানোর প্রশ্নই আসে না। নগর কর্তৃপক্ষের নজরে কোনো দৃষ্টিকটু বিষয় ধরা পড়লে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল কিংবা বিপুল জরিমানা করা হয়। বৈদ্যুতিক ও টেলিফোন কেবলও সাধারণত উন্নত দেশগুলোতে ভূগর্ভ দিয়ে টানা হয়। এজন্য নগর কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি থাকে।

আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন
একটি শহরে কতগুলো প্রতিষ্ঠান ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট টিভি সংযোগ দিতে পারবে তার একটি নির্দিষ্ট মাত্রা ঠিক করা যেতে পারে। একসঙ্গে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান ইচ্ছেমতো রাস্তা দিয়ে তারের সংযোগ টানার সুযোগ কোনোভাবেই পেতে পারে না। অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় তার ও দৃষ্টিকটু কয়েল ঢাকার রাস্তায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, যেগুলো নগর কর্তৃপক্ষ একটু উদ্যোগ নিলেই সরাতে পারে। এছাড়া কোন প্রতিষ্ঠানের তার রাস্তায় ঝুলছে, তা কয়েক ফুট পর পর তারের গায়ে লিখে রাখা প্রয়োজন। এতে সেই তারের মাধ্যমে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়ী করা সহজ হবে।



মন্তব্য