kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

পাবলিক পরীক্ষায় এমসিকিউ পদ্ধতির বিলোপ কি সঠিক সিদ্ধান্ত হবে?

তাসমিন নূর   

২৫ অক্টোবর, ২০১৮ ১৬:২২ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



পাবলিক পরীক্ষায় এমসিকিউ পদ্ধতির বিলোপ কি সঠিক সিদ্ধান্ত হবে?

এমসিকিউ পদ্ধতি বাতিল বিষয়ে জোর আলোচনা উঠেছে দেশজুড়ে। এর মধ্যেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এমসিকিউ বাতিল ঘোষিত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, সকল পাবলিক পরীক্ষায় এমসিকিউ পদ্ধতির বিলোপ কি সঠিক সিদ্ধান্ত হবে আমাদের জন্য? 

এমসিকিউ পদ্ধতি বাতিলের পেছনে প্রথম এবং প্রধান ইস্যু কী? একটাই- প্রশ্ন ফাঁস। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন বাতিল করল? তাদের ক্ষেত্রেও একই ইস্যু। প্রশ্ন-জালিয়াতি রোধ করা যাচ্ছে না। বিভিন্ন পরীক্ষার যতগুলো প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, তার সবই এমসিকিউ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছিল। 

প্রধান কারণের পাশাপাশি কিছু অপ্রধান কারনেও এমসিকিউ পদ্ধতির বৈধতা হুমকির মুখে আছে। শিক্ষাবিদগণ এবং সচেতন মহল মুলত সেই কারণগুলোকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন। মোটামুটি যত বক্তব্য চোখে পড়েছে, তার সারমর্ম করলে দুই-তিনটি অভিযোগ প্রকট হয়ে সামনে আসে— 

১। এমসিকিউ পদ্ধতিতে অনুমান ভিত্তিক উত্তর করেও নম্বর পাওয়া যায়। 
২। এমসিকিউ মুখস্থ বিদ্যাকে উৎসাহিত করে। শুধু তথ্য জানাই তো আর জ্ঞান নয়। 
৩। এমসিকিউ শিক্ষার্থীর উচ্চতর চিন্তাশক্তি এবং বিশ্লেষণী দক্ষতা পরিমাপে বাধা। 

অবস্থা যদি এমনই হয়, তাহলে আমরা এমসিকিউ পদ্ধতি প্রণয়ন করেছিলাম কেন? সুন্দরতম শিক্ষাব্যবস্থার জন্য সবচে’ আলোচিত দেশ ফিনল্যান্ড, PISA র‍্যাংকিং-এ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা চীন, গুরুত্বপূর্ণ মেডিক্যাল পরীক্ষাগুলো, SAT, TOEFL, IELTS, GRE, GMAT-এর পরীক্ষা, বাঘা বাঘা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরীক্ষায়...কোথায় নেই এমসিকিউ অংশ? কেন বিশ্বের এতগুলো দেশে আজও এমসিকিউ পদ্ধতিকেই শিক্ষার্থীদের সমভাবে মূল্যায়নের একমাত্র উপায় মনে করা হয়ে আসছে? 

উত্তরটা খুবই সহজ। এমসিকিউ পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করা হয় টেকনিক্যাল উপায়ে, ফলে দু’জন শিক্ষার্থীর মধ্যে নম্বরে বৈষম্য হওয়ার কোনো উপায় থাকে না। 

লেখার মানে খুব একটা পার্থক্য নেই, এমন অবস্থায়ও দু’জন শিক্ষার্থী ভিন্ন ভিন্ন নম্বর পাচ্ছেন, এমন ঘটনা আমাদের দেশে খুবই কমন। কোনো একটি উত্তরে হয়তো শিক্ষক নম্বর দিতেই ভুলে গেছেন, কোনো শিক্ষকের মেজাজ খারাপ ছিল বলে দায়সারাভাবে দেখে সেরকমই দায়সারা একটা নম্বর দিয়ে দিলেন, কারো সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞানের ঘাটতি ছিল, ইত্যাদি কারণে শিক্ষার্থী পেল সেই নম্বরটিই, যা তার পাওয়ার কথা ছিল না। পত্র-পত্রিকায় চোখ রাখলে এসব অনিময়ের খবর প্রায়ই চোখে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও তো খুব ভাইরাল হয়েছিল। একজন শিক্ষক বাসে বসে খাতা কাটছেন, মাঝে মাঝে আবার বাইরে তাকাচ্ছেন, আবার খাতা দেখছেন। অনুসন্ধান এবং পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, শিক্ষকরা নিকটাত্মীয় এমনকি ওপরের ক্লাসে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের দিয়েও পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ণ করান, যাদের রচণামূলক প্রশ্নোত্তরে নম্বর দেয়ার নির্ধারিত বিধিমালা জানা নেই। তাছাড়া, বিশ্লেষকদের মতে, রচনামুলক প্রশ্নের খাতা মূল্যায়ণের জন্য বোর্ডের বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও সব পরীক্ষার্থীকে সমভাবে মূল্যায়ণ করা সম্ভব হয় না।শিক্ষকরা নম্বর দেয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের নীতি-আদর্শ অনুযায়ীও প্রভাবিত হন। নম্বর দেয়ার ক্ষেত্রে কেউ উদার নীতি গ্রহণ করেন, কেউ কিপটেমি করেন। 

ব্র্যাক এজুকেশন প্রোগ্রামের প্রোগ্রাম কর্মকর্তা মাসুম বিল্লাহ এক নিবন্ধে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন, “ আমি আমার কোনো কোনো সহকর্মীকে রচণামূলক উত্তরে ১০-এ ১০ দিতেও দেখেছি। একই বিষয়ের আরেক শিক্ষককে দেখতাম ২, ৩ কিংবা ৪ করে নম্বর দিতেন। নম্বর দেয়ার সময় তিনি বলতেন, ‘ইংরেজিতে পাশ করা কি এত সোজা? দেখব কিভাবে পাশ করে।’ যদি অল্প সংখ্যক শিক্ষার্থীর খাতা মূল্যায়ণের অবস্থাই এমন হয়, তাহলে পাবলিক পরীক্ষার এত এত খাতা কিভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে, কল্পনা করতে বেগ পেতে হয় না।” 

বোর্ডের নিয়মানুসারে, একটি খাতা তিনজন শিক্ষক দেখে থাকেন। প্রথম শিক্ষকের মূল্যায়ণের পর দ্বিতীয় শিক্ষক সেই খাতা মূল্যায়ণ করেন। দুই জনের মূল্যায়ণে যদি ২০শতাংশ নম্বরের পার্থক্য হয় তৃতীয় শিক্ষক দ্বারা সেই খাতা পূর্নমূল্যায়িত হয়। এই মূল্যায়ণ প্রক্রিয়ার পরও প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী উত্তরপত্র পূণর্মূল্যায়ণের জন্য আবেদন করেন। সেই মূল্যায়ণে কয়েকটি জিনিস খতিয়ে দেখা হয়- 

১। খাতায় যে নম্বর দেয়া হয়েছে সেই নম্বরের বৃত্ত ঠিকঠাক পূরণ করা হয়েছে কিনা 
২। এমন কোনো উত্তর রয়ে গেছে কিনা, যাতে নম্বর দেয়া হয়নি 
৩। সব নম্বরের যোগফল ঠিক আছে কিনা 

কিন্ত, একজন পরীক্ষার্থী যে অনুচ্ছেদ বা রচনায় ১০-এ ৪ পেল, সেই অনুচ্ছেদ বা রচনার জন্য সেই নম্বর আদৌ যৌক্তিক ছিল কিনা, উক্ত মূল্যায়ণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেটা যাচাই করার কোনো সুযোগ নেই।

অনুসন্ধান করে দেখা যায়, বাংলাদেশে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার খাতা সবচে’ বেশি মূল্যায়িত হয় গ্রাম এবং মফস্বল এলাকার শিক্ষকদের দ্বারা, যাদের মধ্যে অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বেশিরভাগ শিক্ষকই খাতা মূল্যায়ণের কোনো যোগ্যতা রাখেন না। অন্যদিকে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকদের একটা বড় অংশই পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ণের মতো একটা গুরুত্বপুর্ণ কর্মযজ্ঞে অংশগ্রহণ করেন না। 

এমন অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে। এমসিকিউ-এর ক্ষেত্রে এই উদাসীনতা আর সীমাবদ্ধতাগুলো অন্তত কমানো যায়। 
এমসিকিউ-এর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সুবিধাগুলো কী? খুব সহজ করে বললে—

১। বেশি সংখ্যক টপিকে শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞান পরিমাপের সক্ষমতা বহুনির্বাচনী প্রশ্ন পদ্ধতির রয়েছে। ধরা যাক, একটি বইয়ে বিশটি অধ্যায় রয়েছে। ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় শিক্ষার্থীকে ৭টি বা ৮ টির মধ্য থেকে ৫টি প্রশ্নের বর্ণনামূলক উত্তর লিখতে হবে। তাহলে সেই প্রশ্নপত্র কি সবগুলো অধ্যায়ের সঙ্গে সংযোগ রেখে করা সম্ভব হবে? কিন্তু প্রশ্নপত্রে যদি ৩০-৪০টি প্রশ্ন থাকে, সবগুলো অধ্যায় থেকে প্রশ্ন করা শিক্ষকের জন্য সহজ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীকেও পুরো বইটি পড়তে হয়।  

২। বিশাল মার্কিং টিম এবং মডারেশন টাইমের প্রয়োজনীয়তা শিথিল হয় এই পদ্ধতিতে, যা লিখিত পরীক্ষার ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। বলা বাহুল্য, এ্যাকাডেমিক কর্মকর্তাদের কর্মভারের মধ্যে সবচে’ বড় বোঝা হলো এই গ্রেড প্রসেসিং-এর মডারেশন এবং রিভিউ। অধিক জনসংখ্যার, অধিক শিক্ষার্থীর দেশে তাই এমসিকিউ’র ভালো বিকল্প নেই। খাতা দেখার জন্য আমাদের শিক্ষকরা যে সময়টুকু পান, সেই সময়ে এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর খাতা গোলযোগ ছাড়া দেখে শেষ করতে পারবেন তো তারা?  

এখন যদি অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখি? এমসিকিউ মুখস্থবিদ্যাকে উৎসাহিত করছে। অনুমান-নির্ভর হয়ে পড়ছে আমাদের শিক্ষার্থীরা। কারণ- এমসিকিউ প্রশ্নগুলো বেশিরভাগ হয় তথ্যভিত্তিক। খুবই সত্য কথা। কিন্তু কেন? যেখানে শিক্ষা-গবেষকরা বলছেন, এমসিকিউ-এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীর উচ্চতর চিন্তাশক্তি এবং বিশ্লেষণী দক্ষতা পরিমাপ সম্ভব, এমন প্রশ্ন তৈরিও হচ্ছে, সেখানে আমাদের এমসিকিউ প্রশ্ন তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন দিয়ে ভরপুর থাকলে তা কি আমাদেরই দীনতা নয়? 

‘গাওকাও’ পরীক্ষাই সম্ভবত বিশ্বের সবচে’ কঠিন পরীক্ষা। চীনা শিক্ষার্থীদের জন্য এ এক যুদ্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে হলে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ৭৫০ পয়েন্টের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট স্কোর অর্জন করতে হয়। দুই দিনে ৯ ঘন্টার পরীক্ষায় অংশ নেয় শিক্ষার্থীরা, যাতে অন্তর্ভুক্ত থাকে এমসিকিউ এবং সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর। চায়নিজ শিক্ষার্থীরা এই পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হতে পারে। গাওকাও আসলে আমেরিকান SAT এবং ব্রিটিশ এ’লেভেল পরীক্ষার সমন্বিত রূপ। গাওকাও পরীক্ষায় তথ্য-নির্ভর প্রশ্ন এড়িয়ে উচ্চতর চিন্তাশক্তি এবং বিশ্লেষণী ক্ষমতা পরিমাপক প্রশ্নকে গুরুত্ব দেয়া হয়। 

ফিনল্যান্ডে শিক্ষক হওয়া অন্য যে কোনো পেশার চেয়ে কঠিন। শিক্ষক হবার লক্ষ্য থাকলে সেখান ছাত্রাবস্থা থেকেই বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কঠিন প্রতিযোগীতা করে উত্তীর্ণ হতে হয়। ফিনল্যান্ড শিক্ষক-প্রার্থীদের উচ্চতর চিন্তাশক্তি এবং বিশ্লেষণী দক্ষতা পরিমাপের জন্য একটি এমসিকিউ টেস্ট নিয়ে থাকে। এই পরীক্ষার নাম- VAKAVA.

এত এত উদাহরণ থাকতে আমরা কেন বলছি, এমসিকিউ প্রশ্ন তথ্যভিত্তিক? আমরা পারছি না কেন চিন্তাশক্তি এবং বিশ্লেষণী দক্ষতা পরিমাপক প্রশ্ন তৈরি করতে? আমাদের শিক্ষকরা কি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন? সঠিক শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারছি আমরা? আমাদের সৃজনশীল প্রশ্নের উদ্দীপকে মীনা-রিনাদের জন্মের অনেক আগেই তাদের বাবা-মা দু’জনই মারা যাচ্ছেন। কী অবস্থা আমাদের প্রশ্নকর্তাদের তা কি আমরা ভাবছি? 

সমস্যা অনেক, সমাধানের আছে অনেক কিছু। কিভাবে প্রশ্ন করলে, সিস্টেমে কী পরিবর্তন ঘটালে প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা যাবে তা নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা না করে, একটা কার্যকর মূল্যায়ণ পদ্ধতি বাতিল করে দিতে চাওয়া আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে কতটা যৌক্তিক হবে? 

লেখক : শিক্ষা গবেষক ও উন্নয়ন কর্মী


(পাঠকের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নন।)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা