kalerkantho

বুধবার। ১৯ জুন ২০১৯। ৫ আষাঢ় ১৪২৬। ১৫ শাওয়াল ১৪৪০

বংশাইকে বনসাই

আমিনুল হক, মধুপুর (টাঙ্গাইল)   

২৭ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বংশাইকে বনসাই

টাঙ্গাইলের মধুপুরে বংশাই নদের পার দখল করে প্রভাবশালীরা বহুতল ভবন নির্মাণ করছে। ছবিটি উপজেলা হাসপাতাল গেটের সামনে থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

টাঙ্গাইলের মধুপুরের ঐতিহাসিক বংশাই নদ প্রভাবশালীদের দখল আর দূষণে মরা খালে পরিণত হয়েছে। পৌরসভাসহ এলাকাবাসীর নিক্ষিপ্ত বর্জ্যে নদটি দিন দিন ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে। নদের তীর দখল করে যার যার মতো বহুতল ভবন, বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করার ফলে অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে নদটি। দখলবাজরা একসময়ের খরস্রোতা এ নদটিকে যেন ‘বনসাই’ করে রেখেছে। তাই মধুপুর পৌর শহরকে দৃষ্টিনন্দন শহর হিসেবে গড়তে বংশাইকে দখলমুক্ত করার আওয়াজ উঠেছে সব মহলে।

ব্রহ্মপুত্র নদের একটি শাখা হলো বংশাই নদ। নানা পথ পেরিয়ে যমুনা হয়ে ঢাকার সাভার-ধামরাই পর্যন্ত বংশাই রূপেই এর পরিচিতি। মধুপুর ও এর গড়াঞ্চলের প্রকৃতিতে ‘বংশাই’ অবিচ্ছেদ্য অংশ। একসময় বংশাইয়ের জলে বনের প্রাণীরা তৃষ্ণা মেটাত। দুই-তিন দশক আগেও এই নদ দিয়ে পাল তোলা নৌকা চলাচল করত। নদ থেকে গাঁয়ের বধূরা কলসি ভরে জল নিত, দুরন্ত বালক-বালিকারা হৈচৈ করে দিনভর গোসল করত।

পত্রিকার হকার বোয়ালী গ্রামের হারুন রশিদ বলেন, ‘একসময় বংশাইয়ের স্বচ্ছ জলে ঝাঁপিয়ে গোসল করতাম। এখন এর ময়লাযুক্ত পানিতে গোসল করলে রোগ-বালাই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এখানে আর কেউ গোসল করে না।’

দুই দশক আগেও রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন মোকামের পাইকাররা বংশাই নদ দিয়ে নৌকা নিয়ে বিভিন্ন ফসল কিনতে আসত। কম খরচে অতি সহজে নদীপথে কৃষিপণ্য মধুপুর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেত। এসব এখন শুধুই ইতিহাস। সেই নদ ধীরে ধীরে দখলকারীদের থাবায় ভরাট ও দখল হয়ে চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এর দুই পারে স্থাপনা নির্মাণের ফলে নাব্যতা সংকটেও পড়েছে নদটি।

স্থানীয়রা জানায়, কিছু ভূমিখেকো প্রভাবশালী ব্যক্তি নদের দুই তীর দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করছে। উপজেলার গোলাবাড়ী সেতু থেকে শুরু করে দামপাড়া গ্রাম পর্যন্ত বংশাইয়ের দুই পার দখলের এমন দৃশ্য হরহামেশা চোখে পড়ে। বিশেষ করে কাইতকাই, হাসপাতাল গেটের সামনে, মধুপুর বাসস্ট্যান্ড সেতু থেকে হাটখোলা, বোয়ালী গ্রামের সীমানা এলাকা, দামাপাড়া পর্যন্ত দখলের মহোৎসবে বংশাইয়ের দৈন্যতা উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছেছে।

শুকনো মৌসুমে প্রবাহ না থাকায় ময়লা-আবর্জনা আটকে পানি দূষণ হচ্ছে অনেক স্থানে। সরু হয়ে বংশাইয়ের অনেক স্থানে পানি চলাচল বন্ধ হওয়ার মতো। অস্তিত্ব আর ঐতিহ্যের এমন সংকটে নদের দুই তীর উদ্ধার করে মধুপুরের প্রকৃতিতে বংশাইয়ের ভূমিকাকে ফিরিয়ে দেওয়া জরুরি বলে মনে করছে স্থানীয় পরিবেশবাদী ও পরিবেশপ্রেমীরা।

টিআইবির সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) মধুপুর শাখার সাবেক সভাপতি ডা. মীর ফরহাদুল আলম মনি বংশাইকে মধুপুরের ফুসফুস বর্ণনা করে নিজেদের বৃহৎ স্বার্থে একে টিকিয়ে রাখার দাবি জানান। তা ছাড়া এরই মধ্যে শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও পথচারীর হাঁটার জন্য বংশাইয়ের দুই তীর দিয়ে সড়ক নির্মাণের দাবি জানিয়েছে স্থানীয়রা।

মধুপুর পৌরসভার মেয়র মাসুদ পারভেজ এ দাবির পক্ষে যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, ‘এ নদের স্রোতধারা ফিরিয়ে দুই পারে পথচারীদের হাঁটার রাস্তাসহ পার্ক নির্মাণের মাধ্যমে বিনোদন স্পট গড়ে তোলা যেতে পারে। আমার দায়িত্বকালে এমন উদ্যোগের বাস্তবায়ন করতে পারলে মেয়র হিসেবে একটি স্বপ্নের সফল পরিণতি হবে।’

পরিবেশ উন্নয়ন সংগঠন বেলার টাঙ্গাইলের সিনিয়র গবেষক সোমনাথ লাহেড়ী বলেন, মধুুপুরের বংশাই একটি ঐতিহ্যবাহী নদ। ভরাটের কারণে এখানকার জলজ প্রাণী, প্রসিদ্ধ মাছ ও জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। বংশাই দখল রোধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাসলিমা আহমেদ পলি জানান, এরই মধ্যে উপজেলা ভূমি অফিসকে নদটির দুই পারের দখল চিহ্নিত করে দখলদারদের তালিকা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দখল এলাকা ও দখলদারদের বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা