kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

ভাসমান হাজারো পরিবার সংস্কারহীন বেড়িবাঁধ

আইলার ক্ষত সারেনি আজও

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা ও মোশাররফ হোসেন, সাতক্ষীরা   

২৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ভাসমান হাজারো পরিবার সংস্কারহীন বেড়িবাঁধ

খুলনার কয়রায় কপোতাক্ষ নদের পারে নড়বড়ে বেড়িবাঁধ। ছবি : কালের কণ্ঠ

আইলার আঘাতে কয়রার কপোতাক্ষপারের নড়বড়ে বাঁধটি ভেঙে যায়। ঝড়ের গতির সঙ্গে তীব্র জোয়ারে ধেয়ে আসা পানিতে ভেসে যায় গ্রাম। বাঁধসংলগ্ন ঘাটাখালী গ্রামের আবু তৈয়ব ছেলে-মেয়ে নিয়ে কয়রা সদরের রাস্তার ওপর গিয়ে ওঠেন। মাস ছয়েক পর বাঁধ বাঁধা হলে আবারও এসে ঘর বাঁধেন। কিন্তু নদী ও বাঁধের ভাঙন আর থামে না। বর্তমানে মাত্র কাঠা দেড়েক জমির ওপর থাকা ঘরটিই তাঁর একমাত্র সম্বল। তৈয়ব বলেন, ‘এবার ভাঙলি কোথায় যাব, তা জানি না। এখন আর সরার জায়গা নেই।’

২০০৯ সালের ২৫ মে খুলনা-সাতক্ষীরা উপকূলের দাকোপ, কয়রা, শ্যামনগর ও আশাশুনিতে ঘূর্ণিঝড় আইলা আঘাত হানে। এরপর ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত আইলাকবলিত হাজার হাজার পরিবার এখনো পুনর্বাসিত হয়নি। আশ্রয়হীন জনপদে এখনো চলছে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও খাবার পানির জন্য তীব্র হাহাকার। সর্বগ্রাসী আইলা আজও উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

খুলনার কয়রায় ওই ঘূর্ণিঝড়ে সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছিল নদীতীরের বাঁধের। চিংড়ি চাষের কারণে বাঁধ যথেচ্ছভাবে কাটাছেঁড়া করায় আগে থেকেই তা দুর্বল ছিল। ঘূর্ণিঝড় আইলায় সৃষ্ট জোয়ারের ধাক্কায় সেই বাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দেয়। শুরু হয় তীব্র নদীভাঙন। বাঁধের বাইরে নদীর পারে আজ আর কোথাও জমি নেই। এ কারণে জোয়ারের চাপ সরাসরি বাঁধের ওপর পড়ে বাঁধ ভেঙে যায়। নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়ে অনেকেই বেড়িবাঁধের কিনারায় আশ্রয় নিয়েছে। কয়রা উপজেলার দুই শতাধিক পরিবার এখনো বাঁধের ওপর বাস করছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কয়রার ঘাটাখালীতে ৫০টির মতো পরিবার সব সময় নদী আর বাঁধ ভাঙার আতঙ্কে আছে। তাদের সবারই বাস বাঁধের পাশে বা ওপরে। পাথরখালী এলাকায় বেড়িবাঁধের ওপর আছে ঘর হারানো ২২টি পরিবার।

আইলার আঘাতে কয়রায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধের ২৭টি পয়েন্ট ভেঙে যায়। নোনা পানির তোড়ে হারিয়ে যায় ২৬ প্রাণ। স্বজন হারানোরা আজও সেই দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেড়িবাঁধেই বাস করছে। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে কয়রার ২৫ কিলোমিটারের মতো বেড়িবাঁধ খুবই ঝুঁকির মধ্যে আছে। এসব বেড়িবাঁধের উপরিভাগে কোথাও কোথাও মাত্র দেড়-দুই হাত মাটি অবশিষ্ট রয়েছে। অবস্থা এতটাই খারাপ যে বাঁধের অনেক জায়গা দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে পানি প্রবেশ করছে।

খুলনা-৬ আসনের (পাইকগাছা-কয়রা) সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান বাবু বলেন, ‘যথেষ্ট বরাদ্দ থাকলেও বেড়িবাঁধ বাঁধার দায়িত্ব যাদের ছিল, তারা তা যথাযথভাবে পালন করেনি। এ কারণে বাঁধগুলো আবারও ভেঙে যাওয়ার মুখে।’

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পদ্মপুকুর ও আশাশুনির প্রতাপনগর এলাকায়ও দেখা গেছে একই চিত্র। আইলার পর থেকে এসব এলাকায় সুপেয় পানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। খাবার পানির জন্য ছুটতে হচ্ছে মাইলের পর মাইল। আইলাকবলিত এ অঞ্চলের রাস্তাঘাট ও বেড়িবাঁধ এখনো ঠিকমতো সংস্কার করা হয়নি। ফলে উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত সবাই চালাচ্ছে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। আইলার আঘাতের পর থেকে গাবুরা ও পদ্মপুকুর এলাকা উদ্ভিদশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে কৃষি ফসল ও চিংড়ি উৎপাদন বন্ধ থাকায় গোটা এলাকায় তীব্র কর্মসংস্থানের সংকট দেখা দিয়েছে। কর্মহীন মানুষ অনেকেই এলাকা ছেড়ে কাজের সন্ধানে বাইরে চলে গেছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা