kalerkantho

বুধবার। ১৯ জুন ২০১৯। ৫ আষাঢ় ১৪২৬। ১৫ শাওয়াল ১৪৪০

শিক্ষাঙ্গনে জীবন শঙ্কা

প্রিয় দেশ ডেস্ক   

২৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শিক্ষাঙ্গনে জীবন শঙ্কা

‘নাই শঙ্কা, নাই ভয়; চাই শিক্ষা আনন্দময়’ স্লোগানটি ততটা কাজে আসছে না। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবন শঙ্কার মধ্য দিয়েই লাভ করতে হচ্ছে শিক্ষা। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় অসংখ্য জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত ভবনে ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম চলছে। মাঝেমধ্যেই ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে আহত হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বাধ্য হয়ে খোলা আকাশের নিচে নেওয়া হচ্ছে ক্লাস। কিন্তু এ ব্যাপারে দ্রুত কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না শিক্ষা অফিস। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করেই নীরব থাকছে কর্তৃপক্ষ। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর জানান, জেলার মধুখালীর কামারখালী উচ্চ বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের অভাবে ৫৭ বছরের পুরনো ঝুঁকিপূর্ণ একটি ভবনে চলছে পাঠদান। ভবনটির বিভিন্ন স্থানের পলেস্তারা খসে পড়ছে। কিছুদিন আগে পলেস্তারা খসে পড়ে শিক্ষক নজীর আহম্মেদ আহত হয়েছেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখ বশীর আহম্মেদ জানান, বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস নিতে হচ্ছে। মধুখালী উপজেলার ইউএনও মোস্তফা মনোয়ার বলেন, ‘আমি প্রধান শিক্ষককে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস না নিতে চিঠি দেব।’

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলার ২১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ, যা মোট স্কুলের ২০ শতাংশ। এর মাঝে হাওর অঞ্চলের বানিয়াচং উপজেলায় ৬৩টি, আজমিরীগঞ্জে ১১টি, বাহুবলে ২৪টি, নবীগঞ্জে ২২টি, মাধবপুরে ৪০টি, লাখাইয়ে ৯টি, চুনারুঘাটে ৪০টি ও সদর উপজেলায় একটি বিদ্যালয় ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। হবিগঞ্জের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর তালিকা ইতিমধ্যে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।’

আগৈলঝাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি জানান, উপজেলার ৪৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টি বিদ্যালয় ভবন অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সময় এসব বিদ্যালয়ের পলেস্তারা খসে পড়ে আহত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। ফলে বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা সব সময় ভীতির মধ্যে থাকছেন। প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলো ১২-১৫ বছর আগে উপজেলা প্রকৌশল বিভাগ থেকে নির্মাণ করা হয়। নির্মাণকাজের সময় নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় কাজের গুণগত মান খারাপ হয়েছে। এ ব্যাপারে আগৈলঝাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলেই এর সংস্কারকাজ করা হবে।

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি জানান, ২০১৬ সালে উপজেলার কাদিপুর ইউনিয়নের উত্তর চুনঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এরপর কেটে গেছে আড়াই বছর। নতুন করে কোনো ভবন তৈরি করা হয়নি। বিকল্প হিসেবে একটি জোড়াতালির টিনশেড ঘরে ঝুঁকি নিয়ে শিশু শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম চলছে। বৃষ্টি এলে কিংবা ঝড়-তুফানের পূর্বাভাস দেখলেই বিদ্যালয় ছুটি ঘোষণা করা হয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেবী প্রসাদ ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘পরিত্যক্ত ভবনেই আমাদের অফিসকক্ষ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেখানে কাজ করছেন শিক্ষকরা। তা ছাড়া শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা টিনশেডের ঘরে কোনো বিদ্যুৎ ও ফ্যানের ব্যবস্থা নেই। শিক্ষার্থীদের ক্লাস করতে খুব কষ্ট হচ্ছে।’ কুলাউড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আইয়ুব উদ্দিন বলেন, ‘আশা করছি, চলতি বছরেই নতুন একটি ভবন পাবে বিদ্যালয়টি।’

চাটমোহর (পাবনা) প্রতিনিধি জানান, উপজেলার ১০ নম্বর নিমাইচড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে। ভবনের ভেতরের মূল পিলার ও বিমের পলেস্তারা ধসে পড়েছে। দরজা-জানালা ভাঙাচোরা। ভবনের বিভিন্ন জায়গায় ফাটল ধরেছে। ফলে যেকোনো সময় প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটতে পারে। বাধ্য হয়ে কিছু শিক্ষার্থীদের স্কুল চত্বরের গাছতলায় পাঠদান করা হচ্ছে। এ অবস্থায় ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। এ ব্যাপারে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ভবন হিসেবে স্কুলটিকে চিহ্নিত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। অচিরেই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তালা (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি জানান, উপজেলার ২১১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১২টি ঝুঁকিপূর্ণ। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস এরই মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান বন্ধের নির্দেশ দিলেও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় তা মানা হচ্ছে না। ফলে শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছে। তালা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ মুস্তাফিজুর রহমান জানান, আগামী অর্থবছরে ভবনগুলো পুনর্নির্মাণ করা হবে।

নাজিরপুর (পিরোজপুর) প্রতিনিধি জানান, উপজেলার ৫৬ নম্বর বুইচাকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় খোলা আকাশের নিচে শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম চলছে। বিদ্যালয় ভবনের ভেতর ও বাইরের বিভিন্ন অংশের পলেস্তারা খসে পড়েছে। ফলে ভবনটি যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হাসিনা খানম বলেন, ‘ভবনটি নিরাপদ না মনে করে শিশু শিক্ষার্থীদের বাইরে খোলা মাঠে পড়ানো হচ্ছে। এতে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।’ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শিকদার আতিকুর রহমান জুয়েল বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ের তালিকা তৈরি করার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি চিঠি এসেছে। সে তালিকায় বিদ্যালয়টির নাম রাখা হয়েছে।’

ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, শহরের ফকিরটিলা সুনু মিয়া চৌধুরী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করছে। গত ১৭ এপ্রিল কালবৈশাখী বিদ্যালয়ের টিনের চালা উড়িয়ে নিয়ে গেলে বিদ্যালয়ের মাঠে পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়। এতে বিঘ্নিত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা শাবনাজ সুলতানা জানান, এ বিদ্যালয়ে তিনিসহ আরো দুজন শিক্ষিকা রয়েছেন। দুই বছর ধরে তাঁরা কোনো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। তিনি বিদ্যালয়টি দ্রুত সরকারীকরণের দাবি জানান।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা