kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

লালসালু

লুৎফর রহমান, পঞ্চগড়   

২৫ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



লালসালু

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার গজপুরী গ্রামে ঝড়ে পড়ে যাওয়া একটি গামারগাছকে কেন্দ্র করে তুফান পীরের মাজার গড়ে তোলা হয়েছে। ছবিটি গত বুধবার তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে ঝড়ে পড়ে যাওয়া একটি গামারগাছকে কেন্দ্র করে তুফান পীরের মাজার গড়ে তোলা হয়েছে। কাগজে লিখে দেওয়া হয়েছে, ‘নিয়ত করলে ফল মিলবে।’ অন্ধবিশ্বাসে অনেকে মানত করতে শুরু করে দিয়েছে। মাজারে জ্বলছে আগরবাতি, মোমবাতি। টাকা-পয়সা, গোলাপজল, আগরবাতি পড়ছে প্রতিনিয়ত। এ যেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’র ফিরে আসা।

দেবীগঞ্জ উপজেলার সোনাহার মল্লিকাদহ ইউনিয়নের গজপুরী গ্রামে গত ১৭ মে ভোরে ঝোড়ো বাতাসে সাবেক গ্রাম সরকার তোফাজ্জল হোসেনের দুটি বড় গামারগাছ পড়ে যায়। গামার স্থানীয়ভাবে পিঠালি নামে পরিচিত। একটি গাছ ১০ ফুট উঁচু রাস্তার পাশে হেলে পড়ে। বড় বড় ডালপালা রাস্তার ওপর থাকায় চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে গাছের মালিক তাত্ক্ষণিক গাছটি স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী বাবুল হোসেনের কাছে বেচেন। কাঠুরিয়া দিয়ে দ্রুত গাছটি কেটে নিয়ে যেতে বলেন। কাঠুরিয়ারা প্রথমে সড়কের ওপর থাকা গাছের ডালপালা কেটে দেয়। ডালপালা কাটার পর গোড়ালির ভর বেশি হওয়ায় গাছটি আস্তে আস্তে আগের মতো দাঁড়িয়ে যায়। ওই গাছটি পাঁচ-ছয় বছর আগেও একবার একইভাবে পড়ে গিয়ে উঠে যায়। গোড়ালির মাটির ভরের কারণে গাছটি উঠে গেলেও স্থানীয় একটি চক্র গুজব ছড়িয়ে দেয় গাছের অলৌকিক ক্ষমতার। এরপর কাঠুরিয়ারা ভয়ে গাছ কাটা বন্ধ করে বাড়ি চলে যায়। এ কথা দশ কান পৌঁছলে রাতারাতি ওই এলাকার মোবারক হোসেনের ছেলে ইসমাইল হোসেন লালসালু এনে তা মাজারের আদলে ঘেরাও করেন। তুফান পীরের মাজার হিসেবে ঘোষণা দিয়ে মুরিদ ও খাদেম বনে যান। তাঁর সঙ্গে যোগ হয় গ্রামের আরো কিছু মানুষ।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মামুন শাহ তাঁর ফেসবুকে ‘দুই শ বছরের আগের পীরের সন্ধান, উপড়ে পড়া গাছকে বারবার জীবন্ত করে’ লিখে প্রচারও করেন। এরপর আর দশটি মাজারের মতোই ওই গামারগাছের প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে তুফান পীরের মাজার হিসেবে। সেখানে লিখে দেওয়া হয়, ‘নিয়ত করলে ফল মিলবে।’ এরপর দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ মাজার দেখতে আসতে থাকে। টাকা-পয়সা দান-দক্ষিণা করার পাশাপাশি মাজারে মোমবাতি, আগরবাতি জ্বালানো হয়। এ ছাড়া কেউ দুধ ঢেলে মানত করে যাচ্ছে বলেও জানায় স্থানীয় লোকজন। দানে পড়া টাকা ওই চক্রটি হাতিয়ে নিচ্ছে। দিন দিন তারা মাজারটি শক্তভাবে স্থাপন করার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে।

গত বুধবার গিয়ে দেখা যায়, সোনাহার ইউনিয়নের বটতলী বাজার থেকে গজপুরী গ্রামের সড়ক ধরে কয়েক শ মিটার সামনে গেলে দেখা মেলে কথিত তুফান পীরের মাজার। কবরের আদলে লাল কাপড় দিয়ে ঘেরা গাছটি। ভেতরে ভক্তদের দেওয়া কয়েকটি পয়সা পড়ে আছে। তার সঙ্গে আগরবাতি, মোমবাতি ও গোলাপজলের বোতল পড়ে আছে। গাছটিতে লাল কাপড়ের ওপর রঙিন কালিতে কম্পোজ করা কাগজ আটকিয়ে দেওয়া আছে। কে এই তুফান? তার কোনো পরিচয় দিতে পারল না স্থানীয় লোকজন। কেউ কেউ বলল, তুফান হলেই এই গাছ অলৌকিক ক্ষমতা দেখায়। তাই তুফান পীরের মাজার। সেখানে কোনো খাদেমকে পাওয়া গেল না। তবে উত্সুক কিছু মানুষের ভিড় দেখা গেল, যারা এক পলক ওই অলৌকিক ক্ষমতার গাছটি দেখতে এসেছে। কেউ কেউ আবার টাকা ফেলল।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঝড়ে গাছটি পড়ে গিয়ে আবার উঠে যাওয়ার পরপরই হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা তাদের দেবতা ভেবে পূজা-অর্চনা শুরু করে। এরপর স্থানীয় যুবক ইসমাইল হোসেনসহ কয়েকজন সেখানে মুসলমানদের পীরের মাজার রয়েছে বলে জানিয়ে তাদের বাধা দিয়ে তুফান পীরের মাজার ঘোষণা দেয়। তারা আরো জানায়, ওই স্থানে কখনো কোনো মাজার ছিল না। স্থানীয় লোকজনের কোনো কবরও ছিল না। সেটিকেই এখন মাজার বানানোর চেষ্টা চলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই এলাকার হিন্দু গৃহবধূ বলেন, ‘আমি গাছের পাশেই কাজ করছিলাম। গাছটি নিজে থেকে উঠে গেলে ইসমাইল আমার কাছে লাল কাপড় চাইল। আমি দিইনি। পরে সে কোথা থেকে যেন একটা লাল কাপড় এনে ঘেরা দিল আর একটা বস্তা বিছিয়ে দিল। তার পর থেকেই টাকা-পয়সা পড়তে শুরু করল।’

প্রত্যক্ষদর্শী কাঠুরিয়া জাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘গাছটির গোড়ালিতে অনেক মাটি ছিল। আমরা ডালগুলো কেটে দেওয়ার পরেই গাছটি আবার দাঁড়িয়ে যায়। এরপর আমরা চলে যাই। পরে এসে দেখি লাল কাপড় দিয়ে ঘেরা দিয়ে তুফান পীরের মাজার করা হয়েছে।’

দেবীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের ছাত্র ছাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি প্রতিদিন এই রাস্তা ধরে কলেজে যাই। গাছের যেদিকে ভর থাকবে গাছ তো সেদিকেই যাবে, এটাই স্বাভাবিক। আমাদের এলাকার এক শ্রেণির মানুষ লাভের আশায় মানুষকে প্রতারিত করার জন্যই মাজার ব্যবসা শুরু করেছে।’

স্থানীয় কৃষক কাবিরুজ্জামান বলেন, ‘গাছটি পড়ে গিয়ে আবার উঠে যাওয়ার পর গাছের অলৌকিক ক্ষমতার কথা ছড়িয়ে যায়। কেউ বলে ভূত আছে, কেউ বলে দেবতা আছে, কেউ বলে সাপ আছে। একটা নাটক শুরু করে দেয় তারা। এখন দেখি মাজার হয়ে গেছে।’

প্রবীণ ওমর আলী বলেন, ‘আমি এখানে ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করে আসছি। কখনো শুনিনি এখানে মাজার আছে। গাছ পড়ে দাঁড়িয়েছে গোড়ালিতে ভার বেশি ছিল তাই। কিন্তু এখন মাজার বানিয়ে ফেলেছে। অনেকে টাকা-পয়সাও দান করতেছে।’

ঠাকুরগাঁও থেকে আসা ট্রাকচালক মানিক বলেন, ‘গাছটি নিজে থেকেই উঠে দাঁড়িয়েছে শুনে দেখতে আসলাম। এখন বোঝাই যাচ্ছে না গাছটি পড়ে গেছিল। আসলেই বিষয়টি রহস্যজনক।’

গাছের মালিক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘আমি তো গাছটি বিক্রি করে দিয়েছি। কিন্তু কাঠুরিয়ারা ভয়ে কাটছে না। এখানে কে লালসালু দিয়ে মাজার করেছে, তা-ও বলতে পারি না। তবে এখানে মাজার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হলে আমরা তা মেনে নেব না।’

সোনাহার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মামুন শাহ বলেন, ‘কিছু দুষ্ট ছেলের কাজ এটা। তবে কিছু মানুষ এসব বিশ্বাস করে। এখানে যেন মাজার হতে না পারে আমরা সেটাই চেষ্টা করব।’ তবে ফেসবুকে কেন প্রচার করেছিলেন—এমন প্রশ্নে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি।

তুফান পীরের মাজারের কথিত খাদেম ইসমাইল তার জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেন।

পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক আব্দুল্লাহ আল ইমরান বলেন, ‘গাছটা পুরোপুরি শিকড়বিচ্ছিন্ন হয়নি। ভেঙে যায়নি। মাটির সমান্তরাল পড়েনি। রাস্তার ওপর কিছুটা হেলে পড়েছিল। ভারী ডালপালা কেটে দেওয়ার পর সে স্বাভাবিকভাবে আগের জায়গায় ফিরে গেছে। এখানে অলৌকিকের কিছু নেই।’

দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রত্যয় হাসান বলেন, ‘আমরা প্রথমে স্থানীয় লোকজনকে সচেতন করে কথিত মাজার প্রতিষ্ঠা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করব। তার পরও যদি তারা সরে না আসে, তাহলে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও মাজার প্রতিষ্ঠা বন্ধ করা হবে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা