kalerkantho

শিক্ষা কর্তার বদলি বাণিজ্য

সাইফুল ইসলাম তুহিন, নড়াইল   

২৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শিক্ষা কর্তার বদলি বাণিজ্য

আকবর হোসেন

নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিধি লঙ্ঘন করে শিক্ষক বদলির অভিযোগ পাওয়া গেছে। জ্যেষ্ঠদের বাদ দিয়ে টাকার বিনিময়ে কনিষ্ঠ ও নবীন শিক্ষকদের বদলি ও পদায়ন করেন তিনি। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ তিন শিক্ষক প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেছেন।

লোহাগড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ মার্চ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় একটি আদেশ জারি করে। এতে লোহাগড়া উপজেলার ১৬ জন সহকারী শিক্ষককে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে বদলির অনুমতি দেওয়া হয়। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বদলির খবর পেয়ে ক্ষুব্ধ জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা ওই দিনই উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে বদলির আবেদনপত্র জমা দিতে যান। নানা অজুহাতে তা নেননি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা।

বদলিপ্রত্যাশী জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, শিক্ষা কর্মকর্তা নীতিমালা অনুযায়ী সাত দিন আগে আবেদন জমা দেওয়ার কথা বললেও কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেননি। জ্যেষ্ঠদের না জানিয়ে কনিষ্ঠদের বদলি করেছেন। নিয়ম জানতে গেলে তিনি জ্যেষ্ঠদের বিভাগীয় মামলা দিয়ে চাকরি খেয়ে ফেলার হুমকি দিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মরিচপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুনভাবে বদলি অঞ্জনা খানম ২০১০ সালে চাকরিতে যোগ দেন। একই বিদ্যালয়ে বদলির আবেদনকারী মাহাবুবা খানমের যোগদান ২০০৯ সালে। মাহাবুবার আবেদন উপেক্ষা করে অঞ্জনাকে বদলি করা হয়েছে।

মাহাবুবার অভিযোগ, ‘শিক্ষা অফিসের উচ্চমান সহকারী ইলিয়াছ হোসেন আমার স্বামীর কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন। টাকা না দেওয়ায় আমার আবেদন গ্রাহ্য করা হয়নি।’

অভিযোগ রয়েছে, শূন্যপদের বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে টাকার বিনিময়ে গোপনে আবেদন সংগ্রহ করে নিয়মবহির্ভূতভাবে পদায়ন করা হয়েছে। কেবল জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন না, পদ শূন্য না হলেও শিক্ষকদের সুবিধামতো বদলি করা হয়েছে। দীঘলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফসিয়ার রহমানকে ঝিকিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং লাহুড়িয়া পচাশিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সহকারী শিক্ষক অর্পণা বিশ্বাসকে দীঘলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে। এই দুটি স্কুলে কোনো পদ শূন্য হয়নি।

এ ছাড়া নীতি লঙ্ঘন করে মতিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে দুজন, গোপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে দুজন এবং নালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তিনজনকে বদলি করা হয়েছে। এসব স্কুলে এখন তিনজন করে শিক্ষক রয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কমপক্ষে চারজন শিক্ষক থাকার কথা।

না প্রকাশ না করার শর্তে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক বলেন, ‘বদলির বিষয়ে কিছু বললে নানা ধরনের ফ্যাসাদে ফেলার হুমকি দেন কর্মকর্তা। তাই চুপ করে সব সহ্য করতে হয়। এ ছাড়া শিক্ষা অফিসের প্রতিটি কাজে ঘুষ দিতে হয়।’

মরিচপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সালাউদ্দিন আরিফ বলেন, ‘উচ্চমান সহকারী ইলিয়াস হোসেনের মাধ্যমে ৩১ মার্চ রাতে ঘুষ নিয়ে ১৬ জন শিক্ষকের বদলি চূড়ান্ত করেন লোহাগড়া শিক্ষা কর্মকর্তা।’

লোহাগড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও চাচই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মফিজুর রহমান বলেন, ‘উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের অসাধু কর্মচারীরা প্রতিনিয়ত নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ঘুষের মাধ্যমে বদলি বাণিজ্য করে যাচ্ছেন।’

অভিযুক্ত অফিস সহকারী ইলিয়াস হোসেন বদলির ব্যাপারে শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘বদলির ব্যাপারে স্যারেরা ভালো জানেন। আমি অফিস সহকারী হিসেবে কাজ করেছি মাত্র।’

এ বিষয়ে লোহাগড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আকবর হোসেন বলেন, ‘আমি অল্প কিছুদিন হলো এখানে এসেছি। টাকা নেওয়ার বিষয়টা জানি না। নিয়মনীতি মেনে বদলি করা হয়েছে।’ বদলি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘সব মিথ্যা-বানোয়াট।’

নড়াইল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মু. শাহ আলম বলেন, ‘শিক্ষকদের অভিযোগ আমলে নিয়ে জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হেমায়েত আলী শাহকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অনিয়ম পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 

মন্তব্য