kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

দিনে অভিযান, রাতে সাবাড়

আহমেদ নূর ও ইয়াহহিয়া ফজল, সিলেট   

১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দিনে অভিযান, রাতে সাবাড়

সিলেট নগরীর হাওলাদারপাড়া ও শাহপরান উপশহরে টিলা কেটে মাটি নিয়ে গেছে একাধিক চক্র। ছবি : আশকার আমিন রাব্বি

টিলাকাটার স্থানগুলো দিনে সুনসান নীরব থাকলেও রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে কর্মমুখর হয়ে ওঠে। কারণ টিলাকাটার বিরুদ্ধে দিনের বেলায় অভিযান চালায় প্রশাসন। এ কারণে দিনে কেউ টিলা কাটে না। রাত হলে কাজ শুরু করে। আর রাতে অভিযান চালাতে পারে না প্রশাসন।

গত ২ এপ্রিল দুপুরে শাহপরান উপশহর ঘুরে দেখা গেছে, শুকতারা রিসোর্টের পাশের টিলা অর্ধেকের বেশি কেটে ফেলা হয়েছে। আশপাশের বাসিন্দাদের অনেকের কাছে জানতে চাইলে কারো নাম বলতে সাহস করেনি। টিলার মালিক কে? এমন প্রশ্নেও উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে নানাভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরের মেজর টিলার জনৈক ইশতিয়াক এর মালিক। তিনি সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী শামীমের কাছ থেকে টিলাটি কেনার পর তা কাটতে শুরু করেন।

শাহপরান উপশহরের কাছাকাছি জাহানপুর জজ সাহেবের টিলাকাটা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। সেখানেও রাতে কাটা হয় আর দিনের বেলা মাঝেমধ্যে অভিযানে যায় পরিবেশ অধিদপ্তর।

একই চিত্র নগরের হাওলদারপাড়ার তিনটি টিলায়। কালীবাড়ির কালীমন্দিরের পেছনের টিলা এরই মধ্যে পুরোটা কেটেছে একটি চক্র। বাকি একটি মজুমদার এবং অন্যটি অজিত বাবুর। দিনে স্থান দুটি পরিত্যক্ত দেখালেও রাতে আঁধার নামলে এসব স্থান কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে সেই চাঞ্চল্য। বাড়ে ট্রাকের ঘন ঘন আনাগোনা। বিকট শব্দে অতিষ্ঠ এলাকার মানুষ।

নগরীর ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ব্রাহ্মণশাসন মৌজার হাওলদারপাড়া। এই মৌজায় বেশির ভাগ টিলাভূমি। ছোট-বড় অসংখ্য টিলার জন্য এলাকার নৈসর্গিক পরিবেশ অন্য রকম। কিন্তু গত ১০ বছরে এই মৌজার অনেকগুলো টিলা হারিয়ে গেছে। সুউচ্চ টিলা এখন সমতল ভূমি। সেখানে গড়ে উঠেছে আবাসিক ভবন। নগরের মদিনা মার্কেট পার হয়ে কালীবাড়ি রাস্তায় ঢুকলে সোজা হাওলদারপাড়ায় যাওয়া যায়। তার আগে পেরোতে হয় কালীবাড়ি এলাকা। কালীবাড়ির ঠিক পেছনে ছিল এক উঁচু টিলা। কিন্তু গত এক বছরে এর অস্তিত্ব শেষ। সরকারদলীয় স্থানীয় এক নেতার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এটি কেটে সাবাড় করা হয়েছে।

কালীবাড়ি পেরোলে বিশাল এলাকাজুড়ে অবস্থান মজুমদার টিলার। একসময়ের নামকরা হোমিও চিকিৎসক প্রয়াত সুপ্রভাষ চন্দ  রায় মজুমদার এর মালিক। তিনি মারা যাওয়ার পর উত্তরাধিকারীরা ভোগ করছেন তাঁর সম্পত্তি। সময়ের ব্যবধানে এর দক্ষিণ এবং পূর্ব পাশের বিশাল এলাকা এখন সমতল ভূমি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অজিত তালুকদার টিলাকাটার হোতা। এর সঙ্গে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সিলেট মহানগর শাখার এক শীর্ষ নেতা জড়িত। আড়াল থেকে তিনি পুরো বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন। এ ছাড়া চক্রটির সঙ্গে সিটি করপোরেশন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সিলেট মহানগরের জালালাবাদ থানা পুলিশ থেকে শুরু করে হাওলদারপাড়ায় সরকারদলীয় সংগঠনের স্থানীয় কয়েকজন নেতা জড়িত।

মজুমদার টিলায় কিছু জায়গা কিনে পুরোটা সাবাড় করেছে অজিত তালুকদারের চক্র। অন্যগুলোকে স্থানীয়রা অজিত বাবুর টিলা বলেই জানেন। দীর্ঘদিন ধরে গোপনে ‘অজিত বাবুর টিলা’ এবং মজুমদার টিলার মাটি রাতের আঁধারে কাটা হচ্ছে। সারা রাত ট্রাকের আনাগোনায় শান্তিতে ঘুমাতে পারছে না এলাকাবাসী। অজিত তালুকদারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সময় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে অভিযোগ জানিয়েছি। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাইনি। টাকার জোরে এবং প্রভাব খাটিয়ে সব ম্যানেজ করে ফেলে তারা।’

স্থানীয় এক আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, ‘দিনে টিলা এলাকা মনে হয় পরিত্যক্ত কোনো খনি। আর রাত নামলে জীবন্ত হয়ে ওঠে। চোরাই লাইন টেনে ব্যবস্থা করে রাখা বৈদ্যুতিক বাতির। এরপর সারা রাত চলে শাবল আর বেলচা। ট্রাক আসে। মাটি নিয়ে চলে যায়।’

সিলেট সদর উপজেলার নালিয়া ও ভাটার মাঝামাঝি স্থানে দুটি টিলাকাটা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। রাতে এসব টিলা কাটা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি টিলার সামনে প্রথমে কিছুদিন একটা মাদরাসা স্থাপন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে মাদরাসাটি স্থানান্তরিত করে টিলাকাটা শুরু হয়েছে। এই এলাকার একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও জড়িতদের নাম বলতে কেউ রাজি হননি।

পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ভূমি সন্তান বাংলাদেশের সমন্বয়ক আশরাফুল কবীর বলেন, ‘এগুলো দেখার দায়িত্ব যাদের তাদের অবহেলা রয়েছে।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন বলেন, ‘নালিয়ায় টিলাকাটা হচ্ছে এটা আপনাদের মাধ্যমে প্রথম শুনলাম। বিষয়টি নিয়ে আমি খোঁজখবর নিয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছি।’

হাওলদারপাড়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘এখানে আমরা একাধিকবার অভিযান চালিয়েছি। কাউকে স্পটে পাইনি।’ মেজর টিলার জাহানপুর জজ মিয়ার টিলা, খাদিমনগরের শাহপরান উপশহর বিষয়ে বলেন, ‘জাহান টিলায় কিছুদিন পর পরই আমরা অভিযান করি। কিন্তু কাউকে স্পটে পাওয়া যায় না।’ রাতে অভিযান পরিচালনা করেছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত রাতে অভিযানের জন্য আমরা প্রস্তুত নই। তা ছাড়া রাতে অভিযান চালানো ঝুঁকিপূর্ণও।’ রাতে অভিযান করা না গেলে কিভাবে টিলাকাটা বন্ধ হবে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিচালক যোগদান করেছেন। তাঁকে নিয়ে টিলাকাটা বন্ধে নতুন করে পরিকল্পনা করে মাঠে নামব।’

সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম) জেদান আল মুসা বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তর চাইলে যেকোনো সময় আমরা সহযোগিতা দিতে পারি। চাইলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমরা পুলিশ পাঠাতে প্রস্তুত। টিলাকাটা বন্ধ হোক, এটা আমরাও চাই।’

মন্তব্য