kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

রাজশাহী-নওগাঁ

মহাসড়কের কাজ চলছে ঢিমেতালে, দুর্ভোগ

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কোথাও কার্পেটিং করার পরপরই রাস্তায় দেখা দিয়েছে ফাটল, কোথাও খোয়া ফেলে রেখে মাসের পর মাস জনদুর্ভোগ তৈরি করা হচ্ছে। আবার কোথাও নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে নির্মাণকাজ চলছে। কোনো অংশে কাজের মেয়াদ শেষ হতে চললেও ঠিকাদারের খোঁজ নেই। এভাবেই চলছে রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়ক বর্ধিতকরণকাজ। দীর্ঘদিনেও কাজ শেষ না হওয়ায় এই রাস্তার প্রায় সাড়ে ২১ কিলোমিটার অংশ এখন যেন দুর্ভোগের অন্য নাম। কিন্তু এরই মধ্যে ঠিকাদারদের প্রায় ২৩৩ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তার কার্পেটিং হতে না হতেই অনেক স্থানে ছোট ফাটল দেখা দিয়েছে। রাজশাহী-নওগাঁ সড়কের রাজশাহী অংশেই বেশি অনিয়ম হয়েছে। বিশেষ করে নওহাটার পর থেকে মান্দা পর্যন্ত রাস্তাটিতে শুধু খোয়া ফেলে রাখা হয়েছে। তাতে চরম জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। নিম্নমানের খোয়াগুলোও এরই মধ্যে উঠে যেতে শুরু করেছে। বৃষ্টিতে কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কাদা, আবার বৃষ্টি শেষে ধুলাবালুতে ভরে যাচ্ছে।

আবার নওগাঁ অংশের সাবাইহাট এলাকায় পাশাপাশি চারটি স্থানে কার্পেটিং শেষ না হতেই ফাটল দেখা দেয়। এই অংশের কাজ করছে সর্বোচ্চ চারটি কাজ পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আমিনুল হক এন্টারপ্রাইজ। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘ওই স্থানে অল্প একটু ফাটল দেখা দিলে তা ঠিক করে দিয়েছি। কাজ এখনো শেষ হয়নি। আরেকটি কার্পেটিং হবে। কাজেই এই অবস্থায় ছোটখাটো সমস্যা থাকতেই পারে। সেটি বড় কিছু নয়।’

স্থানীয় মোহনপুর এলাকার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘রাস্তাটির কাজের শুরু থেকেই নানা অনিয়ম হচ্ছে। ঠিকমতো বালু ও খোয়া দেওয়া হয়নি। নিম্নমানের খোয়া দিলেও ঢালাইয়ের পরিমাণ ছিল কম। এসব নিয়ে প্রতিবাদ করলে উল্টো ঠিকাদারের লোকজন ভয়ভীতি দেখিয়েছে। এখন কাজ ফেলেই পালিয়েছে ঠিকাদার। যে কারণে আমাদের কষ্ট পোহাতে হচ্ছে। রাস্তার পাশে বাড়ি হওয়ায় ধুলা গিয়ে ঘরে ঢুকছে। আবার বৃষ্টি হলে কাদা-পানিতেও রাস্তায় বের হওয়া যায় না।’

রাজশাহী সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) সূত্র মতে, প্রায় ৪৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কটির ৭৮ কিলোমিটার বর্ধিতকরণকাজ চলছে। ১২টি প্যাকেজে ভাগ করে এই কাজের টেন্ডার আহ্বান করা হয়। এর মধ্যে চারটি কাজই পেয়েছে আমিনুল হক এন্টারপ্রাইজ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। আর দুটি করে কাজ পেয়েছে রাজশাহীর ওয়াহেদ কনস্ট্রাকশন, ডন কনস্ট্রাকশন, ঢাকার কামাল অ্যাসোসিয়েট কনস্ট্রাকশন এবং একটি করে কাজ পেয়েছে তূর্ণা কনস্ট্রাকশন ও প্যারাডাইস কনস্ট্রাকশন। রাজশাহী ও নওগাঁ সওজের যৌথ তত্ত্বাবধানে দেড় বছর ধরে এই কাজ চলছে। কিন্তু সামান্য কিছু কাজ করে কোনো কোনো ঠিকাদার লাপাত্তা হয়ে আছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কটি ৭ দশমিক ৩ মিটার থেকে ১০ দশমিক ৩ মিটার চওড়াকরণের মধ্যে দুটি প্যাকেজে কাজ করছে ওয়াহেদ কনস্ট্রাকশন, যার স্বত্বাধিকারী রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা ও বাস মালিক সমিতির সভাপতি মুঞ্জুর রহমান পিটার। তিনি প্রায় ৫০ কোটি টাকার কাজ করছেন। এর মধ্যে প্রায় ২৫ কোটি টাকা তিনি তুলে নিয়েছেন। তাঁর দুটি কাজেরই মেয়াদ এ মাসে শেষ হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্পেটিং শুরু হচ্ছে না। তাঁর অংশে শুধু খোয়া ঢালাই করে রেখে দেওয়ার কারণে দুর্ভোগ বেশি।

রাজশাহী সওজ সূত্র মতে, পরিস্থিতি এতই খারাপ যে রাজশাহী সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী শামসুজ্জোহা ঠিকাদার মুঞ্জুর রহমান পিটারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। দু-এক দিনের মধ্যে এই চিঠি দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। এদিকে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, রেট গোপন করে সওজের এই কাজগুলো পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করেছেন রাজশাহীর একজন ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী। প্রতিটি টেন্ডারের আগে গোপনে তিনি ঠিকাদারদের দর জানিয়ে দিয়ে ২-৩ শতাংশ হারে অর্থ আদায় করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে একজন ঠিকাদার একাধিক কাজ পেয়েছেন। ফলে কাজের মান নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি কাজও শেষ হতে দেরি হচ্ছে।

তবে কাজে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন রাজশাহী ও নওগাঁর দুই নির্বাহী প্রকৌশলী। এর মধ্যে রাজশাহীর নির্বাহী প্রকৌশলী শামসুজ্জোহা বলেন, ‘একজন ঠিকাদারকে নিয়ে আমরা চরম বিপদে আছি। তাঁর কাজ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক দিন বাকি। কিন্তু তিনি রাস্তাটি কার্পেটিংয়ের উদ্যোগ নেননি।’

নওগাঁর নির্বাহী প্রকৌশলী হামিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের অংশের প্রায় সাড়ে ৫৬ কিলোমিটার অংশের কাজ প্রায় ৭০ ভাগ শেষ হয়েছে। বাকিটুকুও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ হবে। তবে কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি।’

মন্তব্য