kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

তুলসীগঙ্গা এখন মরা খাল

ফরিদুল করিম, নওগাঁ   

২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তুলসীগঙ্গা এখন মরা খাল

নওগাঁর তুলসীগঙ্গা নদী মরা খালে পরিণত হয়েছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

সব হারিয়ে গেছে। রূপ-যৌবন আর কিছুই নেই। একসময়ের খরস্রোতা তুলসীগঙ্গা এখন মরা খাল। নদীটি পাশের জয়পুরহাট থেকে নওগাঁয় প্রবেশ করে রানীনগর উপজেলার ত্রিমোহনীতে ছোট যমুনা ও আত্রাই নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোহাম্মদ আলীর সময় নওগাঁ সদর উপজেলার তাজনগরের ছিটকীতলায় এর গতিপথ রোধ করে ছোট যমুনা নদীর সঙ্গে সংযোজন করা হয়। ফলে ছিটকীতলা থেকে ত্রিমোহনী পর্যন্ত তুলসীগঙ্গার বাকি ১৮ কিলোমিটার অংশের মৃত্যু ঘটে। এতে নদীর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য হারিয়ে গেছে।

এ নদীতে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি খানিকটা জমলেও শুকনো মৌসুমে চলে চাষবাস আর দখল। অথচ একসময় নদীটি জনমানুষের যাতায়াতের একটি বড় মাধ্যম ছিল। সওদাগরের গুণ টানা কোষা নৌকায় মালপত্র পরিবহন করা হতো। বিশেষ করে পাটের মৌসুমে পাট ব্যবসায়ীদের আনাগোনায় হাট-বাজার জমে উঠত। মৎস্যজীবীদের জালে ধরা পড়ত ছোট-বড় নানা প্রজাতির মাছ। হাবুডুবু খেলায় মেতে উঠত শুশুক। নদীর দুই তীরের জীবনযাত্রা ছিল তুলসীগঙ্গাকেন্দ্রিক।

সম্প্রতি নদীটির ভাটির দিক থেকে নওগাঁ শহরের তুলসীগঙ্গা সেতু পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার পুনঃখননের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তবে অভিজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু খনন করে নদীটিকে ওয়াটার রিজার্ভার হিসেবে না রেখে প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। নদীটির যেখানে গতিরোধ করা হয়েছে সেখানে রেগুলেটর নির্মাণ করে বর্ষা মৌসুমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহের ব্যবস্থা নিলে তুলসীগঙ্গাকে তাঁর আদি রূপে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এতে করে ফিরে আসবে নদীকেন্দ্রিক প্রাকৃতিক ভারসাম্য।

নওগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জোয়ারদার মো. অসাদুল্লাহ্ জানান, জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পাশাপাশি দুটি বিল থেকে হারাবতী নদী ও তুলসীগঙ্গার সৃষ্টি। এ নদী দুটি প্রবাহিত হয়ে জয়পুরহাটের বটতলীতে মিলিত হয়েছে। সেখান থেকে তুলসীগঙ্গা নাম ধারণ করে নওগাঁর সীমানায় প্রবেশ করেছে। নওগাঁর মধ্যে নদীটির মৃত অংশের দৈর্ঘ্য ১৮ কিলোমিটার। এখন তুলসীগঙ্গার প্রশস্ততা দৃশ্যমান আছে মাত্র ৭৫ ফুট। বর্তমান সরকারের ৬৪ জেলার পুনঃখনন প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের আওতায় তুলসীগঙ্গার ত্রিমোহনী থেকে নওগাঁ শহর পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার অংশ পুনঃখনন কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। মূল্যায়ন কাজ চলমান রয়েছে।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান বলেন, তুলসীগঙ্গা নদী পুনঃখননের বিষয়ে নওগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা হয়েছে। নদী খনন করতে গিয়ে মামলা বা অন্য কোনো প্রকার সমস্যা হলে সেখানে যেন খননকাজ চলমান থাকে—সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নওগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুধাংশু কুমার সরকার বলেন, ‘চক কুতুব থেকে তুলসীগঙ্গা নদীর ১০ কিলোমিটার খননকাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। শুরুতে নদীর তলা খনন করা হবে ১৯ ফুট ৬ ইঞ্চি, ওপরে চওড়া হবে ৯৮ ফুট ও গভীরতা হবে ১৬ ফুট। এভাবে ধীরে ধীরে নওগাঁ শহরের তুলসীগঙ্গা ব্রিজ পয়েন্টে এসে নদীর খননের অবস্থা দাঁড়াবে তলা ৯৮ ফুট, ওপরের চওড়া ১৬৪ ফুট ও গভীরতা ১১ ফুট ৬ ইঞ্চি। এ কাজে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে সাত কোটি তিন লাখ ২৪ হাজার টাকা। এ খনন কাজের মেয়াদ হবে ২০২০ সালের জুন মাস পর্যন্ত।

নওগাঁ জেলার ইতিহাস গবেষক কবি আতাউল হক সিদ্দিকী বলেন, ষাটের দশকে ছিটকীতলায় তুলসীগঙ্গা নদীর গতিপথ রোধ করার ফলে নদীটির অবশিষ্ট ১৮ কিলোমিটার অংশটি মরে যায়। ওই স্থানটিতে রেগুলেটর নির্মাণ করা হলে প্রয়োজন মতো পানি নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে নদীর জীবন ফিরিয়ে দেওয়া যাবে।

অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম খান বলেন, ‘নওগাঁ শহরের মধ্য দিয়ে দুটি নদী প্রবাহিত ছিল। একটি ছোট যমুনা, অপরটি তুলসীগঙ্গা। ছোট যমুনা নদীর অস্তিত্ব এখনো কোনোভাবে টিকে আছে। কিন্তু তুলসীগঙ্গা নদীটিকে হত্যা করা হয়েছে। নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার জন্য তাঁর গতিরোধক বাঁধটি সরিয়ে ফেলে সেখানে রেগুলেটর নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।’

নওগাঁর সামাজিক সংগঠন ‘একুশে পরিষদ নওগাঁ’র সভাপতি ডি এম আব্দুল বারী বলেন, ‘তুলসীগঙ্গা নদীর যে স্থানটিতে নদীর গতিপথ রোধ করা হয়েছে সেখানে রেগুলেটর নির্মাণ করা জরুরি। এতে নদীটি আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।’

মন্তব্য