kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

রংপুর বিভাগে অজ্ঞাত রোগে আতঙ্ক বাড়ছে

আট বছরে আক্রান্ত ৬৮

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রংপুর বিভাগে অজ্ঞাত রোগে আতঙ্ক বাড়ছে

রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় অজ্ঞাত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে ঠাকুরগাঁওয়ে এক পরিবারের পাঁচজনের মৃত্যুসহ আরো চারজন আক্রান্ত হয়েছে। এ নিয়ে বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

গত আট বছরে রংপুর বিভাগে অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৬৮ জন। এদের বেশির ভাগ সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দা। অজ্ঞাত রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি লালমনিরহাটে। একই সময়ে এ জেলায় অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৩৯ জন। অন্যদিকে দিনাজপুরে আক্রান্ত হয়েছে ১৭ জন, ঠাকুরগাঁওয়ে ৯, রংপুরে দুই ও কুড়িগ্রামে একজন। চিকিৎসকরা বলছেন, অজ্ঞাত এসব রোগের বেশির ভাগ ভাইরাসজনিত। প্রতিনিয়ত খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণে অতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার ও চোরাই পথে পার্শ্ববর্তী দেশে যাতায়াতের ফলে অজ্ঞাত রোগ সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় অজ্ঞাত রোগে ১৩ জন মারা যান। তাঁরা হলেন বড়াই গ্রামের ইসলাম (২৫), সানিয়াজানচর গ্রামের আব্দুল করিম (৩৩), সাবিনা (৩), অরণ্য ঘোষ (৮), পশ্চিম বেজগ্রামের সাদেকুল ইসলাম (৩০), আব্দুল করিম (২৫), দক্ষিণ গড্ডিমারী গ্রামের জয়ী (৩), ময়না বেগম (৪২), কাজল (৭), দোয়ানী সানিয়াজান গ্রামের গৌরব (২), অনন্যা (৪), টংভাঙ্গা গ্রামের সাজ্জাদ হোসেন (৩) ও গেন্দুকুড়ি গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক (৩২)। এ ছাড়া আক্রান্ত হয়েছিল আরো ১৪ জন। পরে রংপুর মেডিক্যাল কলেজের একটি বিশেষ দল রোগটি এনসেফালাইটিস ভাইরাসের আক্রমণ বলে শনাক্ত করে।

এরপর ২০১৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বরে অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার চন্দনপাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবু সাঈদের পরিবারসহ ১২ জন। অন্যরা হলেন রওশনারা বেগম (৩৮), রাফিউল ইসলাম সবুজ (১৮), শারমিনা আক্তার ইতি (১২), জুনাইদ (১), রাজিয়া সুলতানা (৩৫), সুলতানা (৩০), তাসলিমা তমা (৮), সামিউল ইসলাম (২৮), চায়না বেগম (২৫), আল নাহিদ (৫) এবং হরেন্দ্রনাথ (৪০)। আক্রান্তদের সবার মাথা ব্যথা, জ্বর জ্বর ভাব, শরীর দুর্বল, অসংলগ্ন কথা ও প্রচণ্ড ঘুমের লক্ষণ দেখা গেছে। ওই সময় চিকিৎসকরা এ রোগকে প্রাথমিকভাবে ‘সিডেশন উইথ সাইকোসিস’ বলে উল্লেখ করেন।

২০১৫ সালের জুনে দিনাজপুরে অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ১১ জন। তারা হলো পার্বতীপুর উপজেলার জুরাই গ্রামের জোবাইদুর রহমানের মেয়ে জেরিনা খাতুন (৫), সদর উপজেলার মাধবমাটি গ্রামের আজিবর রহমানের ছেলে সামিউল ইসলাম (২), রুবেল হোসেনের ছেলে সাকিব (৩), আউলিয়াপুর গ্রামের সাগরের মেয়ে জয়বুন নেছা (৩), বিরল উপজেলার নুরপুর গ্রামের আলম হোসেনের মেয়ে মিনারা পারভীন (২), বীরগঞ্জ উপজেলার ধুলট দাসপাড়ার গজেন চন্দ্র দাসের ছেলে ফুল কুমার দাস (২), সেনপাড়ার আব্দুল হকের মেয়ে শামিমা আক্তার (৫), সনকা গ্রামের আবু তালেবের ছেলে মামুন (৬), সাদুল্লাপাড়ার রবি চানের ছেলে স্বপন (৫), কাহারোল উপজেলার জয়রামপুর গ্রামের জিয়ারুল ইসলামের মেয়ে ইয়াসমিন (৪) ও চিরিরবন্দর উপজেলার ভগনবাড়ী গ্রামের আমানুল হকের ছেলে আবু সায়েম (৪)। ওই সময় আক্রান্ত হয়েছিল আরো পাঁচজন। আক্রান্তরা প্রচণ্ড খিঁচুনি, কাঁপুনিসহ নিস্তেজ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়। তবে চিকিৎসকরা এ রোগ উদ্ঘাটন করতে পারেননি।

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার আব্দুল্লাহপুর কালসারডাড়া গ্রামে ২০১৬ সালে ৮ মার্চ হাতে-পায়ে গাছের মতো শিকড় গজানো বিরল রোগে আক্রান্ত বাবা-ছেলের সন্ধান পাওয়া যায়। তাজুল ইসলাম (৪৮) ও তাঁর ছেলে রুহুল আমিন (১০) এ রোগে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন। তাজুল ইসলাম জন্মের পর থেকে এ রোগে আক্রান্ত হন। বংশপরম্পরায় তাঁরা এ রোগে ভুগছেন। তাঁর বাবা আফাস মুন্সি এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

এ ছাড়া ২০১৭ সালের আগস্টে অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয় কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার জুম্মাপাড়া এলাকার দিনমজুর শফিকুল ইসলাম ও গৃিহণী শাহিদা বেগমের মেয়ে সুরভী খাতুন (৬)। প্রায় ছয় মাস আগে তার দেহে বাসা বাঁধে অজ্ঞাত রোগ। বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে গেলেও চিকিৎসকরা তার রোগ নির্ণয় করতে পারেননি। বর্তমানে তার শরীরের ওজন কমে ১৬ কেজিতে দাঁড়িয়েছে।

সর্বশেষ ঠাকুরগাঁওয়ে অজ্ঞাত রোগে গত মাসে ১৫ দিনের ব্যবধানে মা-বাবা এবং দুই সন্তানসহ একই পরিবারের পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতরা হলেন বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ভাণ্ডারদহ মরিচপাড়া গ্রামের আবু তাহের (৫৫), রুহিয়া থানার কুজিশহর গ্রামের হাবিবুর রহমান বাবলু (৩৫), হোসনেয়ারা বেগম (৪৫), ইউসুফ আলী (২৭) ও মেহেদী হাসান (২৪)।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অজ্ঞাত ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার আরো চারজন। তাঁরা হলেন রবিউল ইসলাম (৬০), কোহিনুর বেগম (১৯), আবীর হোসেন (২০) ও মাসুদা বেগম (৩০)। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হলেও এখন তাঁরা আশঙ্কামুক্ত। ঢাকা থেকে পাঁচ সদস্যের একটি দল গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতালে এসে চিকিৎসাধীন চার রোগীর রক্তসহ বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. অজয় রায় জানান, অতিরিক্ত দূষণ, রাসায়নিক মিশ্রিত খাদ্যদ্রব্য ও চোরাই পথে পার্শ্ববর্তী দেশে যাতায়াতের ফলে অজ্ঞাত এসব রোগ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অজ্ঞাত এসব রোগের বেশির ভাগই ভাইরাসজনিত। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে অজ্ঞাত রোগে পাঁচজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, ‘অসুস্থ চারজনকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ঢাকা থেকে আসা চিকিৎসকরা রোগীর রক্তসহ বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করেছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যাবে তাঁরা কী ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।’

 

মন্তব্য