kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল

রোগী ছিনতাই

মানিক আকবর, চুয়াডাঙ্গা   

২৩ মে, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দিন যাচ্ছে আর চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য যেন বাড়ছে। 'কম খরচে উন্নত চিকিৎসা'র প্রলোভন দেখিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের 'ছিনতাই' করে ক্লিনিকে নিয়ে যায় দালালরা। প্রতিদিনই ঘটছে এসব ঘটনা। আর যেসব রোগী হাসপাতাল ছাড়তে রাজি হয় না তাদের কাছ থেকে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা (রক্ত, প্রস্রাব প্রভৃতি) সংগ্রহ করে দালালরা। এভাবেই প্রতিদিন সরকারি হাসপাতালের রোগীদের 'চিকিৎসা' দিচ্ছেন বেসরকারি ক্লিনিকের মালিকরা। প্রকাশ্যে এসব ঘটলেও দেখার যেন কেউ নেই। অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয় না বলে জানিয়েছেন অনেক ভুক্তভোগী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে অন্তত ২০ জন দালাল সক্রিয় রয়েছে। তারা সবাই হাসপাতালের সামনে অবস্থিত কোনো না কোনো ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার কিংবা ওষুধের দোকানের নিয়োগ করা কর্মচারী। অনেক ক্ষেত্রে ওই সব ক্লিনিকের মালিকরাও দালালের ভূমিকায় তৎপর হয়ে ওঠে। হাসপাতালে আসা রোগী কিংবা তাদের স্বজনদের কাছে নিজেকে 'সেবক', 'শুভাকাঙ্ক্ষী', 'পরোপকারী' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করে দালালরা। এভাবেই রোগীদের প্রভাবিত করে দালালরা টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেয়। দালালদের সঙ্গে একশ্রেণির চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতাল কর্মচারীর সখ্য রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি একাধিকবার ওই হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, জরুরি বিভাগের ভেতরে ও বাইরে সাত-আটজন দালাল ঘোরাঘুরি করছে। পেশাগত কারণে যারা হাসপাতাল এলাকায় নিয়মিত আসেন তাঁদের মধ্যে দু-তিনজন নিজেদের নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জানান, জরুরি বিভাগের ভেতরে ও আশপাশে সব সময়ই দালালরা ঘোরাফেরা করে। কোনো রোগী ভর্তি হলেই দালালদের মধ্যে ইশারায় ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়ে যায় যে কোন দালাল ওই রোগীকে নেবে। তারপর সেই দালাল চলে যায় নির্ধারিত ওয়ার্ডে। সেখানে গিয়ে চিকিৎসাসেবার নামে রোগীর টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেয় তারা। জরুরি বিভাগ ছাড়াও প্রত্যেক চিকিৎসকের দরজার বাইরে ও ওয়ার্ডের মধ্যে রয়েছে দালালদের অবাধ বিচরণ।

ওই হাসপাতাল এলাকার এক ওষুধ ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রক্তের অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ইসিজি, এক্স-রে এ সবের ব্যবস্থা এখন সদর হাসপাতালেই রয়েছে। তার পরও দালালরা কৌশলে রোগীদের বাইরে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে আনছে। তিনি আরো বলেন, সদর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের সঙ্গে তাদের আত্মীয়-স্বজনের দেখা করার নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। যেকোনো সময় যে কেউ হাসপাতালের যেকোনো ওয়ার্ডে ঢুকে রোগীর সঙ্গে কথা বলতে পারে। সাধারণ বেশে দালালরা হাসপাতালে ঘোরাঘুরি করে। বেশির ভাগ চিকিৎসক তাদের চেনেন। নার্স, ওয়ার্ডবয়, হাসপাতালের কর্মচারীরাও দালাল চেনেন। কিন্তু কখনো কখনো নিজেদের স্বার্থে কিংবা 'ঝামেলামুক্ত' থাকার জন্য তাঁরা চুপচাপ থাকেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, দালালদের ব্যাপারটি কারো অজানা নয়। স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক বৈঠকেও দালাল নির্মূল করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সহায়তাও চাওয়া হয়েছে। এপ্রিল মাসের শেষের দিকে দালাল ধরার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত এসেও অভিযান চালিয়েছে। প্রশাসন তৎপর হলে দুই-এক দিনের জন্য দালালদের দাপট কমে, কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ হয় না। দুই-তিন দিন পর আবার সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে পড়ে, দালালরা আগের মতো তাদের 'রোগী ধরা' কাজ শুরু করে দেয়।

জানা গেছে, ওই হাসপাতালে দালালদের উৎপাত নতুন নয়। বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেও কর্তৃপক্ষ এর কোনো সুরাহা করতে পারেনি। ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর সদর হাসপাতাল দালালমুক্ত করার দাবিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধনসহ জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। এরপর পুলিশ ও ভ্রাম্যমাণ আদালত একাধিকবার অভিযান চালালেও ওই হাসপাতাল এখনো দালালমুক্ত হয়নি।

এ প্রসঙ্গে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. মাসুদ রানা বলেন, মাঝেমধ্যেই দালালদের উৎপাতের অভিযোগ কানে আসে। রোগীর স্বজনের বেশে দালালরা হাসপাতালে ঘোরাঘুরি করে। কিছুতেই তাদের প্রতিহত করা যাচ্ছে না। এর আগে অনেকবার এ ব্যাপারে প্রশাসনের সহায়তা নেওয়া হয়েছে। রোগীর সঙ্গে স্বজনদের দেখা করার সময় নির্দিষ্ট করে দিয়েও কোনো কাজ হয়নি।

 

মন্তব্য