kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

গাজীপুরের বনগ্রামে হামলা

চার দিন পরও ভয়

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর   

২৪ এপ্রিল, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চার দিন পরও ভয়

গাজীপুরের বনগ্রামে হামলার চার দিন পরও স্বাভাবিক হয়নি জীবনযাত্রা। হামলায় ভাঙচুর করা টেলিভিশন পড়ে আছে সেভাবেই। ছবি : কালের কণ্ঠ

গাজীপুর মহানগরীর আদিবাসী কোচ সম্প্রদায় অধ্যুষিত বনগ্রাম এলাকায় সন্ত্রাসী হামলার চার দিন পরও জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়নি। এখনো গ্রামজুড়ে বিরাজ করছে আতঙ্ক। গত বুধবার এলাকা ঘুরে সর্বত্র ভাঙচুর-লুটপাটের চিত্র দেখা গেছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল ও বুধবার গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ বনগ্রাম এলাকা পরিদর্শন করেন। মেয়র ক্ষতিগ্রস্ত ৪৫টি পরিবারের প্রত্যেককে পাঁচ হাজার করে টাকা দিয়েছেন। এ সময় সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. দেলোয়ার হোসেন সঙ্গে ছিলেন।

বনগ্রাম এলাকার বাসিন্দা কোচ নেতা ধীরেন্দ্র বর্মণ জানান, রবিবার বিকেলে পুলিশের পোশাক পরা ৪০-৪৫ জন এবং সাদা পোশাকে আরো ৬০-৬৫ জন সন্ত্রাসী গ্রামে ঢোকে। পুলিশের সাদা পোশাকধারীদের অধিকাংশই ছিল মুখোশ পরা। প্রথমেই তারা ২০-২৫ রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এ সময় অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে ভয়ে পাশের গজারি বনে আশ্রয় নেয়। পরে তারা একে একে আবদুর রউফ, রফিক, সুকেন্দ্র বর্মণ, সুনীল বর্মণ, আবদুল্লাহ, হুইয়া বর্মণ, মঙ্গল বর্মণ, বিমল বর্মণ, যোগীন্দ্র বর্মণ, ইসলাম খাঁ ওরফে বদু মিয়াসহ অনেকের বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় ভাঙচুরের পাশাপাশি তারা টাকা-পয়সা, মোবাইল ফোনসেট ও মূল্যবান জিনিসপত্র লুটে নেয়। তাদের হামলায় কমপক্ষে ৩৫ জন আহত হয়। চার ঘণ্টা ধরে চলে এ তাণ্ডব। রাতেই তারা বিষয়টি স্থানীয় এমপিকে জানিয়েছেন।

বুধবার ভারপ্রাপ্ত মেয়র এলাকায় গিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ সহায়তা দেওয়ার সময় আশ্বাস দেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে গ্রামের একমাত্র মন্দিরটি স্থায়ীভাবে নির্মাণ করে দেওয়া হবে। রবিবারের হামলার ঘটনার পর থেকে ওই গ্রামে পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে। সেখানে দায়িত্বরত এসআই আবদুল আজিজ জানান, মন্দিরে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনায় থানায় করা মামলার তিনি তদন্তকারী কর্মকর্তা। পুলিশের নেতৃত্বে হামলার ঘটনা অস্বীকার করে তিনি বলেন, হামলার সময় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে পুলিশ থাকার প্রশ্নই আসে না। হামলার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। একই কথা জানান জয়দেবপুর থানার ওসি খন্দকার রেজাউল হাসান রেজা। গতকাল বৃহস্পতিবার স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল এলাকায় গেলে ওই গ্রামের মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। যোগাযোগ করা হলে জাহিদ আহসান রাসেল জানান, গ্রামে গেলে লোকজন সন্ত্রাসীদের সঙ্গে পুলিশ থাকার কথা বলেছে। তারা পাঁচ-ছয়জন পুলিশ কর্মকর্তার নামও জানিয়েছে। তিনি বলেন, যারাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে, প্রমাণ সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ঘটনা তদন্তে গঠিত চার সদস্যের কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ হোসেন কালের কণ্ঠকে জানান, গত মঙ্গলবার সকাল থেকে কমিটি তদন্ত শুরু করেছে। হামলায় ৪৫টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত ৩৫ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তাতে পুলিশের সংশ্লিষ্টতা এসেছে। এসব সাক্ষ্য যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন তৈরি করা হবে।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত : বনগ্রাম ও আশপাশের লোকজন জানায়, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মধ্যে হলেও বনগ্রাম দুর্গম এলাকা। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের পেছনের এলাকাটি গভীর গজারি বনবেষ্টিত। ৭০-৭২টি বাড়ির মধ্যে ৬০টি আদিবাসী কোচ সম্প্রদায়ের বর্মণ পরিবার। পেশা কৃষি হলেও বর্মণদের অনেকেই দেশি চোলাই মদের ব্যবসা করে। গ্রামের বাসিন্দাদের বড় একটি অংশ ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে ছিনতাই, মাদক ব্যবসাসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত। গ্রামের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম রফিক জাতীয় উদ্যানে ছিনতাইকারী দলের মূল হোতা। চারটি হত্যাসহ একাধিক ছিনতাই ও মাদক মামলার আসামি তিনি। তাঁর স্ত্রী নাজমা ওই এলাকায় যৌন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রফিক ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে থানা ও ডিবি পুলিশের কয়েক কর্মকর্তার বিশেষ সম্পর্ক থাকায় তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়।

দুই মাস আগে রফিকের বাড়ি থেকে তিনটি পিস্তল, বেশ কিছু চাপাতি ও ছুরি উদ্ধার করে র‌্যাব। এ সময় রফিক পালিয়ে যায়। অভিযোগ ওঠে, পুলিশ রফিককে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ গ্রামের মানুষ রফিকের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়। পরে ওই ঘটনায় রফিকের স্ত্রী নাজমা বাদী হয়ে জয়দেবপুর থানায় গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে মামলা করেন। এক মাস আগে পুলিশ ওই মামলার প্রধান আসামি আমজাদ হোসেনকে আটক করলে গ্রামবাসী তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

 

মন্তব্য