kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

ধান কাটার উৎসবে বন্যা ও বজ্র ভয়

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি   

২৪ এপ্রিল, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সুনামগঞ্জের হাওরে বৈশাখের শুরু থেকে চলছে ফসল কাটার উৎসব। মাঠের প্রায় ৭৫ শতাংশ বোরো ধান ইতিমধ্যে পেকেছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে বাকি ধানও পেকে যাবে। ইতিমধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ ফসল কাটা হয়েছে। এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর বন্যা পূর্বাভাস দেখিয়েছে। এ কারণে জেলা প্রশাসন দ্রুত ধান কাটার নির্দেশনা দিয়ে মাইকিং করছে। ভারি বৃষ্টিতে পাকা ধান তলিয়ে গেলেও কিছু এলাকায় শ্রমিকরা বজ্রপাত আতঙ্কে মাঠে যেতে পারছে না। জেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও কৃষক সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, পাহাড়ি ঢল, শীলাবৃষ্টি ও বৃষ্টির পানিতে তাহিরপুর ও দিরাই উপজেলার প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। শীলাবৃষ্টিতে প্রায় ১৩১ কোটি টাকার বোরো ফসলের ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে হাওরে পাকা ধান ক্ষেতে পড়ে থাকলেও বজ্রপাতে হতাহতের কারণে ধানকাটা শ্রমিকের সংকট দেখা দিয়েছে। আবহাওয়া অফিসের বন্যাঝুঁকির সতর্কতায় ফসল গোলায় তোলা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন কৃষক।

কৃষকরা জানান, এই মৌসুমে গত দেড় দশক আগেও ফরিদপুর, বগুড়া, বরিশাল, জামালপুর, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ধানকাটা শ্রমিক (ভাগালু) আসত। এখন আর তারা আসে না। এ কারণে প্রতিবছর শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। তবে চলতি মাসে ধান কাটার সময় অন্তত ১৫ শ্রমিক বজ্রপাতে মারা যাওয়ায় স্থানীয়রা হাওরে নামতে ভয় পাচ্ছে।

প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বজ্রপাত আতঙ্ক, শ্রমিক সংকট এবং আবহাওয়া অফিসের বন্যা পূর্বাভাসের কারণে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন গত মঙ্গলবার রাতে দ্রুত ধান কাটার জন্য নির্দেশনা দিয়েছে। এ জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ কৃষি বিভাগের লোকজনকে নির্দেশনা দিয়েছে। গত বুধবার দুপুরে সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং চেয়ারম্যানদের প্রশিক্ষণ কর্মশালায় জেলার চারটি বালুমহাল এক সপ্তাহ বন্ধ রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। বালুমহালের প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিককে ধান কাটার কাজে পাঠাতে বলা হয়েছে। এই নির্দেশনা পেয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার ধোপাজান বালু-পাথরমহাল বন্ধ করে ইজারাদার শ্রমিকদের ধান কাটার কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

ইজারাদাররা গতকাল বৃহস্পতিবার বালুমহালগুলোতে মাইকিং করে মহাল বন্ধের ঘোষণা দিয়ে শ্রমিকদের ধান কাটার কাজে যোগ দিতে নির্দেশনা দিয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকেও বিভিন্ন স্থানে দ্রুত ধান কাটার নির্দেশনা দিয়ে মাইকিং করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি বছর জেলায় দুই লাখ ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে দুই লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। যা থেকে দুই হাজার ৫০৭ কোটি টাকা মূল্যের ফসলের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ পর্যন্ত জেলার জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, দিরাই, শাল্লা, জগন্নাথপুর ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ১৩১ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। গত দুই দিনের বৃষ্টিতে তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরের নজরখালী বাঁধ ভেঙে ৩০০ হেক্টর জমির বোরো ধান এবং দিরাইয়ে বৃষ্টির পানিতে আরো প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে।

সুনামগঞ্জ দেখার হাওরের লক্ষ্মণশ্রী গ্রামের কৃষক মনির মিয়া বলেন, 'হাওরে আমার ১০ কেয়ার জমির ধান পাকা পড়ে আছে। বজ্রপাতের ভয়ে এখন শ্রমিকরা ধান কাটতে নামছে না। প্রতিদিন ৫০০ টাকা মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।'

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জাহেদুল হক বলেন, 'আমাদের বিভাগীয় পরিচালক শীলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হাওর এলাকা পরিদর্শন করে কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিয়েছেন। শীলাবৃষ্টিতে এ পর্যন্ত ১১ হাজার ১০০ হেক্টর জমির প্রায় ১৩১ কোটি টাকার বোরো ফসলের ক্ষতি হয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও শীলাবৃষ্টিতে বোরো ধান ঝুঁকিতে রয়েছে।'

জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, 'শ্রমিক সংকটের কারণে বালু-পাথরমহালে নিয়োজিত বারকি শ্রমিকদের এক সপ্তাহের জন্য শ্রম বন্ধ রেখে হাওরে ধান কাটার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের ৮৮ জন চেয়ারম্যান ও বালু-পাথর ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের নির্দেশনা দেওয়ার পর তারা মাইকিং করে শ্রমিকদের ধান কাটার নির্দেশ দিয়েছে। দ্রুত ধান কাটার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।'

 

মন্তব্য