kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতের গুলিতে নিহত গানম্যানের মেয়ের প্রশ্ন

'বাবা এভাবে মরল কেন?'

নড়াইল প্রতিনিধি   

২৪ এপ্রিল, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



'বাবা এভাবে মরল কেন?'

সাভারের কাঠগড়ায় কমার্স ব্যাংকে ডাকাতির ঘটনায় নিহত গানম্যান বদরুল আলমের লাশ গ্রামের বাড়ি নড়াইলের লোহাগড়ায় নেওয়া হলে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। ছবি : কালের কণ্ঠ

'মা, তোমার কাপড়-চোপড় পরিষ্কার করে রেখো। আমি এসে তোমাকে নিয়ে যাব। তুমি আসতে না চাইলে আমি তোমাকে কোলে করে নিয়ে আসব।' গত সোমবার মাকে কথাগুলো বলেছিলেন সাভারের আশুলিয়ার কমার্স ব্যাংকের গানম্যান অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য কাজী বদরুল আলম। গত মঙ্গলবার ওই ব্যাংকে ডাকাতি প্রতিরোধকালে ছুরি ও গুলির আঘাতে ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান তিনি। তাঁর বাড়ি নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার আমাদা গ্রামে। গত বুধবার গ্রামের বাড়িতে তাঁর লাশ আসে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আমাদা গ্রামের মৃত আবদুল কুদ্দুস কাজীর ১০ ছেলেমেয়ের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন বদরুল। ঢাকা থেকে গত বুধবার বিকেলে তাঁর লাশ গ্রামের বাড়ি পৌঁছলে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। এলাকার কয়েক হাজার লোক এসে ভিড় করে তাঁদের বাড়ির আঙিনায়। সেখানে জানাজা শেষে রাত সাড়ে ৮টায় যশোর সেনাবাহিনীর একটি দল তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। পরে রাতে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফন করা হয়। বড় ভাই ইকবাল হোসেন কাজী জানান, '১০ ভাইবোনের মধ্যে এই প্রথম আমাদের সেজ ভাইয়ের মৃত্যু হলো।'

অত্যন্ত সৎ ও কর্মঠ বদরুল আলম ১৯৮৩ সালে সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগদান করেন। এরপর ১৯৯১ সালে সেনাবাহিনীর সঙ্গে কুয়েত মিশন থেকে সৌদি আরবে হজ পালন করেন। সৈনিকদের সর্বোচ্চ পদ সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার পদ থেকে ২০১২ সালে অবসর নেন। ভাইবোনের মধ্যে সেজ হলেও তিনি পারিবারে মুরবি্বর ভূমিকা পালন করতেন। ভাইবোনের বিয়ে, ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, তাদের যেকোনো সমস্যায় তিনি পাশে দাঁড়াতেন। ছোট ভাই নাজমুল আলম কাজী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, 'আমার ভালো ভাইটি চলে গেলেন। আমাদের মাথা থেকে ছাদ সরে গেল।'

দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে সাভারের খেজুরটেক সেনাপল্লীর নিজের ফ্ল্যাটে বাস করতেন নিহত বদরুল। সদ্য এসএসসি পরীক্ষা শেষ করা বড় মেয়ে সুমনা আর ছোট মেয়ে সুমাইয়া সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। দিনভর কাজপাগল মানুষটি অবসরের পরও বসে থাকেননি। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে কমার্স ব্যাংকে গানম্যান হিসেবে যোগদানের আগে তিনি একই পদে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে কাজ করতেন। এরও আগে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস কম্পানির স্টোর কিপার হিসেবে কাজ করেছেন কিছুদিন। এসবের মধ্যে হোমিওপ্যাথি কোর্স সমাপ্ত করে সাভারের খেজুরটেক বাজারে নিয়মিত প্র্যাকটিস করতেন।

স্ত্রী রিনা বেগম (৩৮) আহাজারি করতে করতে বলেন, 'আমার সুখের সংসারটি একেবারে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ডাকাতরা আমাদের একেবারে নিঃস্ব করে দিল।'

বাবার শোকে একেবারে পাগলপ্রায় বড় মেয়ে সুমনা। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না তার বাবা এভাবে মারা যাবে। তার বিলাপ সবার কাছে কাঁটার মতো বিঁধেছে, 'আমার বাবা এভাবে মরল কেন? সে ব্যাংকের নিরাপত্তা দিল। কিন্তু তার নিরাপত্তা দেবে কে? দেশে কিসের আইন, কিসের নিরাপত্তা?'

'পরিবার অসহায় হলো'

এদিকে জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানান, সাভারের আশুলিয়ার কমার্স ব্যাংকে দিনদুপুরে ডাকাতের গুলিতে নিহত নিরাপত্তাকর্মী (গানম্যান) ইব্রাহিম হোসেনের (৪৫) বাড়ি জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার পশ্চিম আবাদপুর গ্রামে। গত মঙ্গলবার বিকেলে পরিবারের কাছে তাঁর মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছার পর থেকে পুরো গ্রামটি শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে। নিহতের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তাঁর স্ত্রী ও তিন কন্যা এখন পাগলপ্রায়। গত বুধবার বিকেলে তাঁর মৃতদেহ গ্রামে আসার পর রাত সাড়ে ৭টায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ইব্রাহিমের স্ত্রী ও তিন কন্যা বিলাপ করে কাঁদছেন। গ্রামবাসী তাঁদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ইব্রাহিমের স্ত্রী ইয়াসমীন খাতুন জানান, গত সোমবার ফোনে শেষ কথা হয় তাঁদের। ফোনে আগামী মাসে ছুটিতে বাড়িতে আসার কথা জানিয়ে চিন্তা করতে নিষেধ করেছিলেন স্বামী। কে জানে সে কথাই যে হবে শেষ কথা। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিলাপ করে বলেন, 'আল্লাহ তুমি এ কি করলে? আমার তিন মেয়ে এখন যে এতিম হয়ে গেল। আল্লাহ, তুমি বিচার করো।' কথাগুলো বলতে বলতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন ইয়াসমীন। মায়ের পাশে তখন অঝোরে কাঁদছিলেন তিন মেয়ে প্রেমা, সোমা ও রিভা।

গ্রামবাসীরা জানান, ইব্রাহিম অত্যন্ত নম্র ছিলেন। তাঁর তিন কন্যা। স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। সংসারের অভাব মেটাতে ইব্রাহিম কয়েক বছর আগে দুবাই ছিলেন। বছর দুয়েক হলো দেশে ফিরে নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি নেন। বড় মেয়ে প্রেমা বিবাহিত। দ্বিতীয় মেয়ে সোমা অষ্টম শ্রেণি ও ছোট মেয়ে রিভা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। বসতবাড়ি ছাড়া তাঁর কোনো সহায় সম্পদ নেই।

নিহত ইব্রাহিমের ভায়রা নুরে আলম সিদ্দিকী বলেন, 'জান-মাল রক্ষা করতে গিয়ে ইব্রাহিম প্রাণ হারিয়েছেন। এখন তাঁর পরিবারের দায়িত্বভার নেবে কে?'

আক্কেলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম মো. শাহনেওয়াজ বলেন, 'ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় ইব্রাহিম ঘটনাস্থলে প্রাণ হারিয়েছেন। পরিবারটির একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন নিহত ইব্রাহিম। তাঁর মৃত্যুর কারণে পরিবারটি অসহায় হয়ে পড়ল।'

 

মন্তব্য