kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

বাঙালির বিশ্বদর্শন

থিম্পু

মাহবুব নূর   

২৫ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



থিম্পু

ছবি : লেখক

ড্রুক এয়ারের বিমানে চড়ে গিয়ে নামলাম পারো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এটি সাড়ে পাঁচ হাজার ফুট উঁচুতে। প্লেন থেকে বেরোতেই ঠাণ্ডা জড়িয়ে ধরল শরীর। তবে মন উঠল নেচে। বাতাস দারুণ বিশুদ্ধ। বিশ্বের একমাত্র কার্বন ঋণাত্মক দেশ এই ভুটান। বাতাসে অফুরান অক্সিজেন। পারো থেকে চললাম থিম্পু। সুউচ্চ পাহাড় আর পাহাড়ি নদী ঘেঁষে এগিয়ে চলেছে গাড়ি। রাস্তার মোড়ে বা সেতুতে রাঙা প্রেয়ার ফ্ল্যাগ উড়ছে। চারদিকে চোখ জুড়ানো সবুজ। ভুটান তার সংবিধানে ৬০ শতাংশ ভূমি বনাঞ্চলের জন্য নিশ্চিত করেছে; কিন্তু বাস্তবে রয়েছে ৭২ শতাংশ। ভুটানকে পুণ্যভূমিও বলা হয়। এখানে প্রাণী হত্যা নিষেধ, এমনকি মাছ ধরাও। ভুটান প্রাণিজ আমিষ আমদানি করে ভারত থেকে। ভুটানিরা পাহাড়ের পাদদেশে চাষাবাদ করে থাকে আর পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বাড়িঘর তৈরি করে। বেলেপাথর, গ্রানাইট, কাঠের দ্বারা বাড়িগুলো তৈরি হয়। বাড়িতে ব্যবহৃত কাঠে পেরেক ব্যবহার করে না তারা। ধর্মীয় পুস্তকের বিভিন্ন প্রতীক বা চরিত্র দিয়ে বাড়িগুলোর নকশা করে। বসতবাড়িগুলো তিনতলা সমান উঁচু হয়। নিচতলায় রাখে গবাদি পশু। দ্বিতীয় তলায় ভাঁড়ার ঘর আর থাকার জায়গা। তৃতীয় তলায় থাকার জায়গা আর প্রার্থনাগৃহ।

 

থিম্পু গিয়ে

ছোট্ট শহর। হেঁটেই ঘুরে বেড়ানো সম্ভব। থিম্পুতে দুদিন ছিলাম। পায়ে পায়েই ঘুরেছি। এখানে সবাই যেন সুখী মানুষ। হাসিমুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সহযোগিতা দিতে পছন্দ করে। দোকানপাটে মালিক-মজুর আলাদা করার উপায় নেই। রেস্তোরাঁয় দেখেছি, সবাই সমানভাবেই কাজ করছে। দেশটি উন্নয়ন মাপে জিডিপি দিয়ে নয়, বরং জিএনএইচ দিয়ে। জিএনএইচ মানে হলো গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস। থিম্পুর কেন্দ্রস্থল ক্লক টাওয়ার থেকে ১০ মিনিট হেঁটে ভুটান জিপিও গেলাম। ভুটানি স্থাপত্য ঐতিহ্যে নির্মিত। আন্তর্জাতিক ফিলাটেলিক বাজারে ভুটানি ডাকটিকিটের বেশ কদর আছে। ভুটানের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি খাত এই ডাকটিকিট। দেশটি বিভিন্ন ধরনের মুদ্রণ (সিল্ক প্রিন্ট, মেটাল প্রিন্ট), আকৃতি এবং বিষয়-বৈচিত্র্যের ডাকটিকিট প্রকাশ করে। জিপিওতে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে নিজের ছবি দিয়ে ডাকটিকিট প্রকাশ করা যায় এবং তা দিয়ে চিঠিও পাঠানো যায়। পর্যটকরা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ডাকটিকিট ছাপছে। আমিও দাঁড়িয়ে পড়লাম।

জিপিও থেকে কিছুদূর এগোলেই জাতীয় গ্রন্থাগার ও আর্কাইভ। ছোট্ট দেশের ছোট্ট লাইব্রেরি। চারতলা উঁচু। গ্রন্থাগারটিতে শত বছরের পুরনো বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের পাণ্ডুলিপি সযত্নে সংরক্ষিত। তবে গ্রন্থাগারের সব থেকে আকর্ষণীয় বস্তু হচ্ছে ১৫ ডিসেম্বর ২০০৩ সালে ‘ভুটান’ শিরোনামে প্রকাশিত বিশ্বের সর্ববৃহৎ গ্রন্থ। এটি উচ্চতায় পাঁচ ফুট এবং প্রস্থে সাত ফুট। ওজন ৬০.৩২ কেজি।

 

কৃষি মার্কেটে গেলাম

কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বিক্রয়ের উদ্দেশে ওয়াং চু নদীর তীরে গড়ে উঠেছে সেন্টেনারি ফার্মাস মার্কেট। এখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে সরাসরি চলে আসে। এটি খোলা থাকে বৃহস্পতি থেকে রবিবার। এখানে কোনো স্থায়ী দোকান নেই। মার্কেটে ঢুকলাম। কৃষকরা পরিবারসহ চলে এসেছে। বাচ্চারা খেলছে। ঘুরে দেখছি, জিনিসপত্রের দাম জানছি, ছবিও তুলছি। তারা হাসিমুখে পর্যটকদের স্বাগত জানাচ্ছে। থিম্পুবাসীরা সুলভ মূল্যে তাদের মাসের বাজার করছে। জানতে পারলাম কৃষকরা পরিবার-পরিজনসহ তাদের পণ্য নিয়ে তিন দিনের জন্য চলে আসে।

 

 

অবাক হলাম ট্রাফিক সিস্টেমে

ভুটান ভ্রমণে যে বিষয়টি আশ্চর্য করল তাহল এর ট্রাফিক ব্যবস্থা। দেশটিতে কোনো ট্রাফিক সিগন্যালবাতি নেই। সারা দেশে একটিমাত্র যে ট্রাফিক সিগন্যালবক্স আছে তা থিম্পুতে। নাগরিকরা ফুটপাত ব্যবহার করেন এবং জেব্রাক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় মানুষকে থামতে হয় না।

এখানে ট্যাক্সি ড্রাইভার থেকে শুরু করে প্রতিটি লোকই যেন গাইডের কাজ করে। পর্যটকদের ঠকানো বা প্রতারিত করার চেষ্টা করে না। ভুটানে একসময় পর্যটক প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৭৪ সালে ২৭৪ জন পর্যটককে প্রথম দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। ১৯৯১ সালে পর্যটন খাতকে বেসরকারি করা হয়। ভারত, বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ ব্যতীত অন্য কোনো দেশের পর্যটক ভুটানে প্রবেশ করতে হলে ট্যুর অপারেটরকে ন্যূনতম ২৫০ ডলার প্রদান করতে হবে। এর মধ্যে সরকারের ট্যাক্স ৬৫ ডলার এবং বাকিটা তার থাকা, ঘোরা, খাবার প্রভৃতির জন্য। ভুটানের দোকানগুলোতে বাংলাদেশের বিস্কুট, চিপস, প্লাস্টিক সামগ্রী বা তৈরি পোশাক দেখে খুব ভালো লেগেছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা