kalerkantho

সোমবার । ২৪ জুন ২০১৯। ১০ আষাঢ় ১৪২৬। ২০ শাওয়াল ১৪৪০

এইতো জীবন

সিনেমা দেখা চানাচুর বেচা

রথীশচন্দ্র কুরীর বয়স এখন ৮৩। চানাচুর বিক্রি করছেন ৭১ বছর ধরে। কিন্তু সিনেমা দেখা আর চানাচুর বিক্রি করা—কোনো নেশাই এখনো তাঁর কাটেনি। হবিগঞ্জ সদরের মোহন সিনেমা হলের সামনে তাঁর সঙ্গে দেখা করে এসেছেন শাহ ফখরুজ্জামান

২৫ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সিনেমা দেখা চানাচুর বেচা

দেড় হাজারেরও বেশি সিনেমা দেখেছেন রথীশ হলে বসে। সিনেমা দেখতে ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের নানা জায়গায়। ভারতও  গেছেন সিনেমা দেখতে। এখন সিনেমা হলে আগের সেই অবস্থা নেই বলে তাঁর দুঃখ খুব।

হবিগঞ্জ শহরের দানিয়ালপুর এলাকার রোহিনী কুরীর ছেলে রথীশচন্দ্র কুরী। বাংলা ১৩৫৫ সালে রথীশের বয়স ছিল ১২। ১০-১৫ জন মিলে সিনেমা দেখা শুরু করেন। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে সিনেমা দেখাটা নেশায় দাঁড়িয়ে যায়। বাবা রোহিনী ছেলের ওপর তাই খুব বিরক্ত ছিলেন। পারিবারিক ব্যবসা চানাচুর বিক্রি করতে ছেলেকে চাপ দিতে থাকেন রোহিনী। শুরুতে রথীশ ট্রেনে ফেরি করে চানাচুর বিক্রি করতেন। এর মধ্যেও তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ট্রেনে করে নানা জায়গায় যাওয়া আর নতুন নতুন হলে সিনেমা দেখা। এভাবে চানাচুর বিক্রি করে আর সিনেমা দেখে তাঁর দিনকাল ভালোই যাচ্ছিল। কুমিল্লা, সিলেট, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভৈরব আর আশুগঞ্জের সিনেমা হলগুলোর নিয়মিত দর্শক হয়ে ওঠেন রথীশ।

 

মোহন সিনেমা হলে

হবিগঞ্জ শহরের সবেধন নীলমণি ওই মোহন সিনেমা হল। এই হলেই সবচেয়ে বেশি সিনেমা দেখেন রথীশ। ট্রেনে করে চানাচুর বিক্রি বাদ দিয়ে একসময় সিনেমা হলের সামনেই আস্তানা গাড়েন। এতে রথ দেখা ও কলা বেচা—দুটিই হতো। সিনেমা দেখতেন আবার চানাচুরও বিক্রি করতেন। সাত দশক আগে যেখানে শুরু করেছিলেন, এখনো সেখানেই আছেন। সে সময়ে যাঁরা ক্রেতা হয়ে এসেছিলেন, এখন তাঁদের নাতিরা কিনতে আসে। সঙ্গী কতজনই তো চলে গেল, রথীশ আছেন। ঝড়-বৃষ্টি যা-ই হোক এক দিনের জন্যও ব্যবসা বন্ধ করেন না। বেচতে বেচতেই ভেতর থেকে ছবির শব্দ শুনতে পান।  কখন মারপিট হচ্ছে আর কখন ঘোড়া দৌড়াচ্ছে বুঝতে কষ্ট হয় না। শত বছরের পুরনো মোহন সিনেমা হলের ইতিহাসও তাঁর মুখস্থ। বলছিলেন, ১০০ বছর আগে এটি প্রতিষ্ঠা করেন পিয়ারী চৌধুরী। পরে এর মালিক হন গুনেন্দলাল চৌধুরী। সর্বশেষ এর মালিক হন আজমিরীগঞ্জের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন ওরফে হাফাই মিয়ার পিতা মিয়াধন মিয়া। এখন সিনেমা হলের নাম মোহন সিনেমা হল হলেও প্রতিষ্ঠার সময় নাম ছিল হিরণ মহল। পরে নাম হয়েছিল অঞ্জলী।

 

সিনেমা দেখতে দেশ-বিদেশ 

রথীশ  জানান, তাঁর বাবার অনেক সম্পদ ছিল। সিনেমা দেখতে গিয়ে এই সম্পদ নষ্ট করেছেন। শুরুতে ১৪ পয়সা ছিল সিনেমার টিকিটের দাম। পরে ১০০ টাকায়ও টিকিট কাটতে হয়েছে। আর দেশ-বিদেশে ছুটতে গিয়ে যাতায়াত খরচ হয়েছে বিস্তর। সিনেমা দেখতে স্বাধীনতার আগে বহুবার গেছেন ভারতের শিলচর, করিমগঞ্জ আর ত্রিপুরায়। সেখানে বলিউডি, তামিল আর কলকাতার ছবি অনেক দেখেছেন। বলছিলেন, আর দেশের এমন কোনো জায়গা মনে হয় বাকি নেই যেখানে সিনেমা দেখার জন্য যাইনি। একবার মোহন সিনেমা হলে একটি বিখ্যাত ছবি আসবে বলে প্রচার করা হলো। কিন্তু ছবিটি আর আসেনি। পরে সঙ্গীদের নিয়ে ছুটতে থাকি কোথায় ছবিটি দেখা যাবে। লোকে বলত, মনে হয় কুড়িগ্রামে পাওয়া যাবে। গেছি কুড়িগ্রাম। তারপর বলেছে শরীয়তপুর, শরীয়তপুরেও গেছি। এভাবে একপর্যায়ে বরিশাল যাই। শেষে জানতে পারি, ভোলায় চলছে ছবিটি। আসলে কোনো ছবি মিস হলে মাথা নষ্ট হয়ে যেত। এই মোহন সিনেমায় গেল ৭০-৭১ বছরে কোনো ছবি দেখা মিস হয়নি। অনেক সময়ই হল কর্তৃপক্ষ আমার কাছ থেকে টিকিট নেয়নি।

রথীশ বলেন, ‘আমি হলে বসে দেড় হাজারের বেশি ছবি দেখেছি। একনাগাড়ে কয়েক শ ছবির নাম বলে যেতে পারি। সিনেমার কাহিনিও অনেক মনে আছে। পাকিস্তানি ছবি খাইবার মেইল, লালারুখ, জারকান, জিন্দালাশ, নাচে নাগিন বাজে বিন খুব সাড়া জাগিয়েছিল সে সময়ে। হিন্দি ছবির মধ্যে হাতি মেরা সাথি, সঙ্গম, আলী বাবা ৪০ চোরের কথাও মনে আছে। মোহন সিনেমায় দেখা প্রেমের মরা জলে ডোবে না, সিরাজউদ্দৌলা বিখ্যাত ছবি। বেদের মেয়ে জ্যোত্স্না কয়েক মাস ধরে চলেছিল। সব শো হাউসফুল ছিল। তখন উর্দু ছবির পছন্দের নায়ক-নায়িকা ছিল মোহাম্মদ আলী, ওয়াহিদ মুরাদ, রোখসানা প্রমুখ। তবে বাংলা সিনেমায় রাজ্জাক-শাবানার ধারে-কাছে কেউ নেই। আনোয়ার হোসেন আর আনোয়ারাকেও মনে আছে।’  রথীশ কুরী শুধু অভিনেতা-অভিনেত্রী নয়, প্রযোজনা সংস্থা আর পরিচালকদের নামও বলতে পারেন।

 

ছবি হিট বিক্রি ভালো

ছবি যত বেশি হিট হয় চানাচুরের বিক্রিও বাড়ে তত। কারণ হিট ছবিতে দর্শক বেশি হয়। এমনও দিন গেছে আমি একা চানাচুর তৈরি করতাম আর তিনজন বিক্রি করত।  কোনো কোনো দিন তিন হাজার টাকাও লাভ পাইছি। এখন দুই-তিন শ টাকা রোজগার। হলে সারা দিনেও পাঁচ হাজার টাকার টিকিট বিক্রি হয় না। শুধু ঈদে কিছু দর্শক হয়। ‘যারা বিদেশে থাকে, তারা দেশে বেড়াতে এসে আমাকে দেখে অবাক হয়। বলে, আপনি এখনো আছেন? আমার কাছ থেকে তারা বাড়ির জন্য চানাচুর কিনে নিয়ে যায়। অনেক লোক বাকি খেয়ে আর টাকা দেয়নি। তবে এ নিয়ে বেশি ভাবি না,’ বলছিলেন রথীশ।

রথীশের চার ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে অনেক আগেই। দুই ছেলেকেও বিয়ে দিয়েছেন। নাতি-নাতনি নিয়ে ভালোই আছেন। তবে সন্ধ্যার পর কেরোসিনের কুপির আলোয় চানাচুর নিয়ে বসার দীর্ঘদিনের অভ্যাস ছাড়তে পারছেন না। কোথাও মেলা বা অনুষ্ঠানের খবর পেলেও ছুটে যান। আক্ষেপ করে বললেন, ‘বাবার অনেক সম্পদ ছিল। সিনেমার পেছনে ঘুরে শেষ করেছি সব। তবে ছেলে-মেয়েরা আমার মতো সিনেমাপাগল হয়নি। সিনেমার প্রতি আমার আগ্রহ সেই আগের মতোই আছে।’

ছবি : ডা. এস এস আল আমিন সুমন

মন্তব্য