kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

সরকারবাড়ির শরবতদানি

১৮ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সরকারবাড়ির শরবতদানি

সাবেকি আমলের থালাবাটি, সুরমাদানি, আতরদানি, ঝাড়বাতি, কাপড়চোপড় নিয়ে এক দুর্লভ ভাণ্ডারের মালিক আলুবাজারের সরকাররা। এর মধ্যে শরবতদানি অন্যতম। তবে এটি সারা বছর তোলা থাকত তাকে। রমজানে নামিয়ে ধুয়ে-মুছে সাফ করে ইফতারের সময় ব্যবহার করা হতো। জাফরানি শরবত পরিবেশন করা হতো এটি দিয়ে। মোহাম্মদ আসাদকে সেসব দিনের গল্প শুনিয়েছেন সরকারদের মেয়ে জিনাত পারভীন 

 

সরকারদের চার প্রজন্ম

জাহানারা খাতুনের শ্বশুর ছিলেন পুরান ঢাকার ডাকসাইটে মানুষ। নাম আল্লাবক্স সরকার। তিনি সরদার ছিলেন। আল্লাবক্সের বাবার নাম ছিল হাজি আব্দুল্লাহ সরকার। বাবার নামে আল্লাবক্স একটি রাস্তার নাম রেখেছিলেন আব্দুল্লাহ সরকার লেন। আব্দুল্লাহ সরকার বংশালের চামড়া ব্যবসায়ী। কলকাতায়ও সুপরিচিত ছিলেন। ইউরোপের অনেক দেশ, যেমন জার্মানিতেও তিনি চামড়া রপ্তানি করতেন। আব্দুল্লাহ সরকারের ছিল তিন স্ত্রী। তাঁদের মধ্যে ছোট স্ত্রীর ঘরে চার সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় ওই আল্লাবক্স সরকার। অন্য ভাইদের নাম আজিজুর রহমান সরকার ও হামিদুর রহমান সরকার। আয়শা আক্তার বানু নামে তাঁর এক বোনও ছিল। আল্লাবক্স ছোটবেলায়ই বাবার ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। পরে তিনি ঢাকার ২২ পঞ্চায়েত সরদারের একজন হয়েছিলেন। ঢাকার কমিশনারও ছিলেন ৩৫ বছর। তিনি মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। বংশাল এলাকার উন্নয়নে তাঁর অবদানের কথা লোকে এখনো বলে। জনপ্রিয় মানুষ ছিলেন আল্লাবক্স। ঈদে ৫০০-৭০০ লোককে দাওয়াত করে খাওয়াতেন। তিনি ঢাকা জুরি বোর্ডের সদস্য ছিলেন, আর খেলাফত আন্দোলনের ছিলেন কোষাধ্যক্ষ। আল্লাবক্সের বিয়াই ছিলেন ইমামগঞ্জের সাবান ব্যবসায়ী। নাম ফজলুর রহমান সিকদার। তিনি ছিলেন ঢাকার প্রথম সাবান ব্যবসায়ী। নিজ হাতে সাবান তৈরি করতেন। ফজলুর রহমানের চার ছেলের মধ্যে সবার বড় ছিলেন মোহাম্মদ শরীফ। শিক্ষা বোর্ডের কন্ট্রোলার ছিলেন। ছোট ছেলে আফজালুর রহমান জনতা ব্যাংকের এমডি হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। বঙ্গবন্ধু একবার জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর নিজেই গাড়ি চালিয়ে তাঁকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। ফজলুর রহমানের দুই মেয়েকে আল্লাবক্স নিজের দুই ছেলের জন্য বউ করে আনেন। তাঁদেরই একজন জাহানারা।  আল্লাবক্সের ছেলে মনসুর রহমান সরকারের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল জাহানারার। ১৯৪১ সালে। জাহানারা বসবাস করতেন বাবার দেওয়া ৩১ হাজি ওসমান গণি রোডের (আলুবাজার) সুন্দর একটি বাড়িতে। বাবার বাড়ি ও শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া সাবেকি আমলের জিনিসপত্রের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার তিনি গড়ে তুলেছিলেন। তিনি জাদুঘরবান্ধব ছিলেন। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মসলিনসহ আরো বেশ কিছু দ্রষ্টব্য জাহানারার দেওয়া। তাঁর সন্তানেরা কিছু দ্রষ্টব্য দিয়েছেন বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির ঐতিহ্য জাদুঘরে। বাকি আরো অনেক কিছুই আছে আলুবাজারের বাড়িটিতে। জাহানারা খাতুনের তিন ছেলে—সুলতান মামুদুর রহমান বাবু একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি গণতন্ত্রী পার্টির প্রেসিডিয়ামের সদস্য। আরেক ছেলে আসুফুর রহমান মুন্না রেসলিং কোচ ও সাবেক রেসলিং ফেডারেশনের ট্রেজারার। আনজালুর রহমান জাতীয় জাদুঘরের সাবেক কিপার। একমাত্র মেয়ে জিনাত পারভীনের বিয়ে হয়েছিল টাঙ্গাইলের জমিদারবাড়িতে। তিনি এখন থাকেন মায়ের বাড়িতেই। মায়ের মৃত্যুর পর জিনাত পারভীনই মায়ের ঐতিহ্য-রত্ন দেখভাল করছেন। একান্নবর্তী এই পরিবারের ছেলে-মেয়েরা জিনাত পারভীনকে ডাকে মামণি বলে। জিনাতের পর এই দুর্লভ রত্ন ভাণ্ডারের দায়িত্ব পাবেন জিনাতের ভাইয়ের মেয়ে জেহেরা জেরিন পুন্নি। তিনি সাংবাদিকতা বিষয়ে স্নাতকোত্তর হয়েছেন।

জিনাত পারভীন

রমজান মাসে দুপুরের পর থেকেই ইফতার তৈরির কাজ শুরু হয়ে যেত। ৫০-৬০ পদের খাবার থাকত ইফতারে। বিকেলেই দস্তরখানা ভরে যেত।  আমার মা ভালো মুড়িমাখা তৈরি করতে পারতেন। সেই মুড়িতে মুরকিও দেওয়া হতো (মিষ্টি দেওয়া মুড়ি)। তারপর থাকত সুতা কাবাব, পনির ইত্যাদি। সব মিলিয়ে স্পেশাল একটা মুড়িমাখা হতো। আরো হতো স্পেশাল জাফরান শরবত। থাকত তোকমার শরবত, বাঙ্গির শরবত বা লেবুর শরবত। তারপর থাকত পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ। এখনকার আলুর চপের সঙ্গে কিন্তু তখনকারটির মিল খুঁজতে যাবেন না। তখন চপের ভেতরে কিমা দেওয়া হতো। ওপরে বিস্কুটের গুঁড়া মাখিয়ে ভাজা হতো। চর্বি দিয়ে ভাজা হতো পেঁয়াজু। থাকত ডাবলি, ঘুগনি। আরো থাকত তেহারি। তেহারি কিন্তু খাস ঢাকাইয়া খাবার। মোগল বা পাঠানদের কেউ এটা নিয়ে আসেনি। নবাববাড়িতে এ খাবারের জন্ম। দস্তরখানায় শুধু ফলই থাকত

৮-১০ রকমের। জাফরানের শরবতদানিটি রাখা হতো একেবারে মাঝখানে। মাগরিবের আজান হলে এই পাত্রটিই প্রথম খালি হতো। আবার নতুন করে ভরে আনা হতো।

মনসুর সরকার ও জাহানারা খাতুন

শরবতদানিটি এসেছিল নানাবাড়ি থেকে

মায়ের বিয়ের সময় নানাবাড়ি থেকে এই শরবতদানিটি এসেছিল। এটি কাচের তৈরি। বাইরের দিকটায় নকশা করা। মুখ বন্ধ করার ছিপিটিও কাচের। এটির বয়স এখন ৮০ হয়েছে। এখনো রমজান মাসে পাত্রটি আমরা নামাই। জাফরানি শরবত দিয়ে ভর্তি করি। ইফতারে পরিবেশন করি। মা বলতেন, এটি বেলজিয়াম গ্লাস। সংগ্রহ করা হয়েছিল কলকাতা থেকে। মায়ের আত্মীয়দের অনেকের বাড়িতেই এ রকম শরবতদানি আছে। সম্ভ্রান্ত ঢাকাইয়া পরিবারে এমন পাত্র থাকাটা রেওয়াজ। রমজান ছাড়া বিয়েতে জামাই বরণের জন্যও এই পাত্র ব্যবহার করা হয়। এটা জামাইকে সম্মান জানানোর জন্যই। শবেবরাত আর মহররমের দিনেও এই পাত্রে শরবত পরিবেশনের চল আছে। এই পাত্রটিতে জাফরানি ছাড়া অন্য শরবত রাখা হয় না।

জেহেরা জেরিন পুন্নি

শরবত যেভাবে

গরুর খাঁটি দুধের মালাই নেওয়া হয়। বেটে নেওয়া হয় পেস্তাবাদাম। এর সঙ্গে  চিনি, কিশমিশ মেশানো হয়। দেওয়া হয় জাফরান। সব কিছু মেশানো হলে শরবত হালকা হলুদ রং ধারণ করে। সে আমলে বরফকুচি মিশিয়ে পরিবেশন করা হতো। এখন তো ফ্রিজে রেখেই পরিবেশন করা হয়। এই শরবত ঠাণ্ডা না খেলে মজা তেমন পাওয়া যায় না। এই শরবত কিন্তু রোজার মাসেও প্রতিদিন করা যায় না। প্রথম রোজার দিন এই শরবত থাকবেই। তারপর ১০ রোজা, ২৭ রোজা, ৩০ রোজা এবং ঈদের দিন তৈরি করা হয়। বলতে পারেন আমরা আমাদের ইফতারের ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছি। আমাদের শৈশব থেকে দেখেছি মা ইফতার সাজাতেন। মা নিজেই দেখতেন সব। মায়ের মৃত্যুর পর আমি দেখছি। আমার ভাইয়েরা বিয়ে করেছে। তাদের সংসার আছে। তার পরও আমরা একটি বাড়িতে থাকি। বিশেষ দিনের খাবার আমিই তৈরি করি। ঈদ, জন্মদিন, বিয়েবার্ষিকী সব অনুষ্ঠানের খাবার আমিই দেখি। আমার মায়ের নিয়মেই তৈরি এবং পরিবেশন করা হয়। মোগলদের অনেক আদব-কায়দা ছিল। জাফরানি শরবত খাওয়ার চল তারাই করে থাকবে। তারা খাবার পরিবেশনও করত সুন্দর করে। পুরান ঢাকার বনেদি পরিবারগুলোতে সেসব চল ছিল। আমাদের পরিবারে আমরা আজও তা ধরে রেখেছি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা