kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

আরো জীবন

হালিম খালাসি

জীবন তাঁর জলেই ভাসছে। এখন বয়স পঁয়তাল্লিশ। আব্দুল হালিম সঞ্চিতা লঞ্চের খালাসি। লঞ্চটি ভোলা-বরিশাল রুটে চলাচল করে। রাশেদ হোসেন রুবেল তাঁর গল্প শুনেছেন

১৮ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হালিম খালাসি

লঞ্চেই তাঁর থাকা-খাওয়া সব। ২৪ ঘণ্টার কাজ। চোখ-কান খোলা রাখতে হয় সব সময়। ২৫ বছর ধরে একই রুটিন। চাচার হাত ধরে এসেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ২০ বছর। চাচা ছিলেন এ রহমান অ্যান্ড সন্স কম্পানির মাস্টার। লালমিয়া সারেংয়ের সঙ্গে চাচার বন্ধুতা ছিল। লালমিয়াকে বলেই চাচা তাঁকে কাজে লাগিয়েছিলেন। লঞ্চটি প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টায় ভোলার ভেদুরিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে যায়। বরিশাল পৌঁছাতে আড়াই ঘণ্টা সময় নেয়। ফিরতি যাত্রা করে সাড়ে ৩টায়।

 

দিন শুরু

লঞ্চটাকে সকাল সকাল ঘাটে লাগানোই কাজ হালিমের। এ জন্য ঘুম থেকে উঠতে হয় ভোর থাকতেই। তার পর লঞ্চটার সব দিক চেক করতে হয় কোথাও দিয়ে পানি ঢুকছে কি না। ময়লা লেগে থাকলে সেগুলোও পরিষ্কার করেন। মোট কথা লঞ্চটিকে যাত্রার জন্য রেডি করে ফেলেন। তারপর যাত্রী ডাকার কাজ—বরিশাল, বরিশাল। তাঁর সঙ্গে কাজ করেন আরো দুজন। আন্তজেলা লঞ্চগুলোতে দু-তিনজনের বেশি খালাসি থাকে না। আব্দুল হালিম সবচেয়ে পুরনো, মানে সিনিয়র খালাসি হওয়ায় থাকেন সবার আগে। সিঁড়ি বেয়ে যাত্রী লঞ্চে ওঠার সময় বসানোর জায়গাও দেখিয়ে দেন। বৃদ্ধদের ধরে ধরে ওঠান। তারপর লঞ্চ ছাড়ার সময় হলে রশি টেনে তোলেন। মাঝে মাঝে টিকিট মাস্টারের কাজেও সহায়তা দেন।

 

লঞ্চ ছাড়ার পরে

প্রথমেই কল চাপতে হয় মেশিনের পানির জন্য। পথিমধ্যে শ্রীপুর ও লাহারহাট ঘাট ধরতে হয়। সে সময়ও আবার লঞ্চ বাঁধার জন্য রশি নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে হয়। এরই মধ্যে মাস্টারদের চা-পানি দিয়ে আসতে হয়। নিজেদের জন্য খাবার তৈরি করার কাজও শুরু করে দিতে হয়। যাত্রী তোলা ও নামানোর কাজ চলতেই থাকে মধ্যে মধ্যে। মাঝে মাঝে চেকিংয়ে বের হন—কে টিকিট কাটেনি বা কে কম টাকার টিকিট কেটে বেশিদূর ভ্রমণ করছে। তবে বরিশাল ঘাটে এলে কাজ বেড়ে যায়। আবারও লঞ্চ ধোয়া-মোছা ও বেঁধে রাখার কাজ করতে হয়। এভাবেই কেটে যায় প্রতিটি দিন। কম্পানি থেকে যা পাওয়া হয় তা দিয়েই চালাতে হয়। বাড়তি কিছু করার ফুরসতও নেই।

 

শুরু করেছিলেন

১২৮০ টাকা দিয়ে শুরু করেছিলেন হালিম। এখন পাচ্ছেন ৮০৫০ টাকা। ১২০০ টাকার একটি ছোট বাসায় থাকেন পরিবার নিয়ে। দুটি মেয়ে তাঁর। চিন্তা হয়, মেয়ের বাবা খালাসি বলে না আবার ভালো পাত্র মুখ ফিরিয়ে নেয়। তবে মেয়েদের পড়াচ্ছেন। বড়টি পঞ্চম শ্রেণিতে আর ছোটটি প্রথম শ্রেণিতে। ভালো খাওয়াতে পারেন না মেয়েদের; কিন্তু পড়া শেখানোয় কোনো কমতি রাখেন না। প্রতিষ্ঠানে রয়েছে তাঁর সুনাম। দক্ষতা বাড়াতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন প্রতিদিন। খালাসির কাজ করেও সুকানির (যিনি লঞ্চ চালাতে জানেন) কাজ ও ইঞ্জিন চালানোর কাজ আয়ত্ত করে ফেলেছেন তিনি। জীবনে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে আবদুল হালিমকে। বাবার সংসারের বড় সন্তান হওয়ার পরও সংসারে তেমন কোনো অবদান রাখতে পারেননি বলে আফসোস করেন। তিন-চার মাসে একবার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারতেন তিনি।

না, বড় কোনো বিপদ আসেনি

জীবনে কখনো বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনায় পড়েননি। তবে সাইপ্রাস নামে একটি লঞ্চকে কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়তে দেখেছেন। সেটা সম্ভবত ২০১০ সাল। অনেকে হতাহত হয়েছিল। হালিমের পরিশ্রম বেশি হয় বর্ষার সময়ে। তখন বাজারসদাই করার জন্য বা সন্তানদের দেখভালের জন্য কিছু সময় বাড়িতে থাকতে পারেন না। কারণ এ সময় ঝড়-বৃষ্টি হয় বেশি বেশি। ঝড়-বৃষ্টির সময় লঞ্চের ইঞ্জিন চালিয়ে রেখে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তবু বললেন, ‘ভালো আছি। আমাদের কম্পানি বড়। অন্য জায়গায় এর চেয়ে ভালো কোনো বেতন পাওয়া যায় না। জীবনটা এভাবে কাটাতে পারলেও ভালো।’

ছবি: লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা