kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

সূতিকাগার

পিটারমারিজবার্গ স্টেশন

দক্ষিণ আফ্রিকার বন্দরনগরী ডারবান থেকে অল্প দক্ষিণে একটা ছোট্ট ট্রেন স্টেশনের নাম পিটারমারিজবার্গ। শান্ত স্টেশনটিতে শত বছর আগের ছোট্ট একটি ঘটনা পৃথিবীকে একটি বড় মানুষ উপহার দেয়। আহমেদ বায়েজীদ বলছেন বিস্তারিত

১৮ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পিটারমারিজবার্গ স্টেশন

ভিক্টোরীয় যুগের লাল ইটে তৈরি স্টেশন ভবনটি। ওপরে লোহার ছাউনি। স্টেশনটি বেশির ভাগ থাকে জনশূন্য। স্থানীয়দের কাছেও বেশি গুরুত্ব নেই এর। তবে ১৮৯৩ সালে এখানে একটি ঘটনা ঘটেছিল। ছোট্ট সে ঘটনার নায়কের নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। জুন মাসের ৭ তারিখ ছিল সেটি। গান্ধী সেদিন দাদা আবদুল্লাহ নামের তাঁর এক ক্লায়েন্টের কাজে ডারবান ট্রেনে ওঠেন। যাচ্ছিলেন প্রিটোরিয়া। পিটারমারিজবার্গ স্টেশনে ট্রেনটি আসার পর কন্ডাক্টর তাঁকে প্রথম শ্রেণির কম্পার্টমেন্ট থেকে বের হয়ে যেতে বলে। দেখিয়ে দেয় নিম্ন শ্রেণির যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত ভ্যান কম্পার্টমেন্ট। আরো বলে, প্রথম শ্রেণি শুধু শ্বেতাঙ্গদের জন্য সংরক্ষিত। গান্ধী নিজের প্রথম শ্রেণির টিকিট দেখিয়ে জানান, এটি তাঁরই সিট; কিন্তু কন্ডাক্টর কোনো কিছুই মানতে রাজি হয়নি। গান্ধীও নিম্ন শ্রেণির কম্পার্টমেন্টে যেতে রাজি হন না। শেষে তাঁকে জোর করে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যে স্টেশনের ছোট্ট একটি ওয়েটিংরুমে বসে রাত কাটাতে হয় তাঁকে। পরে তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমার ওভারকোট ছিল লাগেজে; কিন্তু সেটি পরলে না আবার অপদস্থ হতে হয়, সেই ভয়ে আর বের করিনি।’

 

বদলে গেল জীবন

গান্ধীর জীবনের গতিপথ বদলে গেল ওই ঘটনায়, সেই সঙ্গে ইতিহাসেও যোগ হলো সত্যাগ্রহ আন্দোলন নামে নতুন অধ্যায়। দক্ষিণ আফ্রিকার পূর্ব উপকূলীয় ট্রান্সভাল প্রদেশের নাটালভিত্তিক একটি কম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়েছিলেন। তারও কয়েক দশক আগে থেকেই দেশটিতে ভারতীয় অভিবাসীরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বসবাস করছিল, বিশেষ করে ১৮৬০ সালটি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রান্সভাল সরকার আখক্ষেতের কাজের জন্য ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে শ্রমিক নিয়েছিল অনেক; কিন্তু শ্বেতাঙ্গ শাসিত দেশটিতে অশ্বেতাঙ্গ উপমহাদেশীয়দের পদে পদে বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছিল। তাদের কাছ থেকে বাড়তি করও আদায় করা হচ্ছিল। গান্ধী এসবে ব্যথিত হতেন। হেনস্থার শিকার হন নিজেও। পিটারমারিজবার্গ স্টেশনের ওই ঘটনার কয়েক দিন আগেই ডারবানের আদালতে তার মাথা থেকে পাগড়ি খুলে ফেলতে বলা হয়েছিল। গান্ধী তা অগ্রাহ্য করে ক্ষোভে সেখান থেকে বেরিয়ে যান।

 

সিদ্ধান্ত নিলেন

পিটারমারিজবার্গের ওই ঘটনার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন এই শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়বেন। শুরু করেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। ভারতীয়দের সংগঠিত করে ভোটাধিকার, শ্রমিক হিসেবে ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ শুরু করেন। এর মধ্যেই তাঁর চাকরির মেয়াদ শেষ হলেও তিনি অধিকার আদায় আন্দোলনের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় থেকে যান। ১৯০৭ সালে ট্রান্সভাল সরকার ভারতীয়সহ সব এশীয়র নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করলে (এশিয়াটিক রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট) গান্ধী প্রতিবাদ শুরু করেন। শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহ আন্দোলন। দীর্ঘ সাত বছর আন্দোলন চলে। ১৯১৪ সালে শ্বেতাঙ্গ সরকার উপমহাদেশীয়দের অভিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। যদিও এর মধ্যে কয়েকবারই কারাবরণ করতে হয়েছে গান্ধীকে। গান্ধীর এই আন্দোলনই পরবর্তী সময়ে মার্টিন লুথার কিং ও নেলসন মেন্ডেলার শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবিরোধী আন্দোলনের পথ দেখিয়েছে। ওই বছরই দেশে ফিরে এসে গান্ধী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন।

 

পিটারমারিজ স্টেশন মর্যাদা পেয়েছে

দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারও স্টেশনটিকে যথাযথ মর্যাদা দিয়েছে। যেখানে গান্ধীকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেই জায়গাটিতে পরে তৈরি করা হয়েছে একটি নামফলক। তাতে লেখা আছে ‘এই ঘটনাটিই তাঁর (গান্ধীর) জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়’। ২০১৬ সালে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই স্থানটি ভ্রমণের সময় ভিজিটরস বইয়ে লিখেছেন, ‘পিটারমারিজবার্গের একটি ঘটনাই ভারতীয় ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দিয়েছে।’

 

ওয়েটিং রুমটি জাদুঘর

স্টেশনের সেই ছোট্ট ওয়েটিং রুমটি এখন একটি জাদুঘর। দক্ষিণ আফ্রিকায় গান্ধীর দুই দশক অবস্থানকালের স্মৃতিচিহ্নগুলো ধরে রাখা হয়েছে সেখানে। গান্ধীর জীবনের বিভিন্ন তথ্য লেখা রয়েছে দেয়ালে। আছে অনেক সাদাকালো ছবি। যে কাঠের বেঞ্চে বসে গান্ধী রাত কাটিয়েছিলেন, তেমনি একটি বেঞ্চ রাখা হয়েছে ঘরটির মাঝখানে। স্থানীয় ট্যুরিস্ট গাইড শিনে ব্র্র্রাইট বলেছেন, ‘আমি যেসব ভারতীয়কে জায়গাটি দেখাতে নিয়ে আসি তাঁদের অনেকেই এখানে এসে অশ্রু সংবরণ করতে পারেন না।’ ২০১৮ সালের জুনে সেই রাতের ঘটনার ১২৫ বছর পূর্ণ হয়েছিল। আয়োজন করা হয়েছিল দুই দিনব্যাপী এক অনুষ্ঠানের। সে সময় স্টেশনটির প্রবেশমুখে মহাত্মা গান্ধীর একটি ভাস্কর্য উন্মোচন করা হয়। এর নাম বার্থ অব সত্যাগ্রহ। ভাস্কর্যটির এক পাশে তরুণ ব্যারিস্টার গান্ধীর মুখ, অন্য পাশে শেষবেলার গান্ধী।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা