kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

সরেজমিন

ভবঘুরে আশ্রয়কেন্দ্র

১৭ একর জায়গার ওপর গড়ে ওঠা একটি জমিদারবাড়ি। এটি ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়নের ধলায়। ভবঘুরে আশ্রয়কেন্দ্রটি গড়ে উঠেছে ওই জমিদারবাড়িতে। মোস্তাফিজ নোমান ঘুরে এসেছেন

১৮ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ভবঘুরে আশ্রয়কেন্দ্র

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এটি পরিচালনা করে। যেসব শিশু অপরাধে জড়িয়ে যায় তাদের ঠিকানা এই আশ্রয়কেন্দ্র। এখানে তাদের কর্মমুখী করে গড়ে তোলার কথা; কিন্তু তিন বেলা খাওয়া ও ঘুমানো ছাড়া শিশুদের এখানে বেশি কিছু করার নেই। এটি এক রকম বন্দিশালাই। মঙ্গলবার দুপুর ১২টা। উপজেলা সদর থেকে প্রায় বিশ কিলোমিটার। অনুমতি পাওয়া সহজ ছিল না; কিন্তু অনেক দূর থেকে এসেছি জানতে পেরে একজন সহানুভূতি দেখালেন। গ্রিলের বাইরে থেকে কিছু কথা বলার সুযোগ মিলল। ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল ফাহিম, রবিন, শান্ত, মজনু, সুমন, নুরুন্নবী, আব্দুল্লাহ, রেজাউল, মেহেদী, সামাদ সাব্বির এবং আরো কয়েকজন। সবারই অনেক কথা বলার আছে।

 

ঢাকার ফাহিম

ফাহিমের বয়স পনেরো হবে। পিতা মাছুদ মিয়া ঢাকায় গাড়ি চালান। চার ভাই-তিন বোনের মধ্যে ফাহিম চতুর্থ। গাড়ি সারাইয়ের কাজ কিছু শিখেছিল ফাহিম। টুকটাক যা রোজগার করত মা-বাবার হাতে তুলে দিত। বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়ে জড়িয়ে গেল মাদকের সঙ্গে। সারাইয়ের কাজ পুরো শেখাও হলো না। ৫০-১০০ টাকার বিনিময়ে মাদক পৌঁছে দিত এখানে-সেখানে। একদিন পুলিশ তাকে ধরে ফেলে। পরে মিরপুরে শিশু সহায়তা কেন্দ্র ঘুরে ঠাঁই হয় এই ধলা ভবঘুরে আশ্রয়কেন্দ্রে। এখানে এর মধ্যে দুই বছর পার হয়ে গেছে। খুব স্টাইলিশ ছেলে ফাহিম। চুল ছেঁটেছে বলিউডের পছন্দের নায়কের মতো। বলছিল, ‘এখানে কষ্ট ছাড়া খাবার পাচ্ছি, পোশাক পাচ্ছি; থাকতে মন্দ লাগছে না।’ বেশ ভালোই নাকি আছে ফাহিম। সে আর কোনো স্বপ্ন দেখে না।

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রবিন

একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত রবিন। স্কুলে যাওয়া নিয়ে মা-বাবা বকা দিয়েছিলেন। অভিমান করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। ট্রেনে উঠে চলে আসে ঢাকার এয়ারপোর্ট স্টেশনে। তিন দিনের অনাহারী রবিন কাজের সন্ধানে ঘুরতে থাকে স্টেশনে। কোনো কাজ না পেয়ে কাগজ টোকানোর কাজ শুরু করে। সারা দিন কাগজ কুড়িয়ে যা পায় বিক্রি করে খাবার কেনে। রাতে ওভারব্রিজে ঘুমায়। এভাবে চলেছিল তিন মাস। এক দিন এয়ারপোর্ট স্টেশন থেকেই পুলিশ তাকে আটক করে। তারপর পাঠিয়ে দেয় মিরপুর কেন্দ্রে। সেখানে ছিল দেড় বছর। এরপর এই আশ্রয়কেন্দ্রে। এখানেও দেড় বছর কেটে গেছে। পরিবার তার কোনো খবর নেয়নি।

 

কুমিল্লার তুফান

এলাকায় সবাই ডাকত তুফান নামেই। তুফানের বেগে ছুটত বলেই এই নাম। বয়স বারো হবে। চার ভাই-তিন বোনের মধ্যে সে দ্বিতীয়। সে পাপড় বিক্রি করত ট্রেনে ট্রেনে। যা রোজগার হতো তুলে দিত মায়ের হাতে। এক দিন পাপড় বিক্রি করতে করতে চলে যায় কমলাপুর রেলস্টেশনে। রাত হয়ে যাওয়ায় আর ফিরতি ট্রেন পায়নি। পাউরুটি খেয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মেই শুয়ে পড়ে। ভিক্ষুক ভেবে তাকে পুলিশ আটক করে নিয়ে যায় মিরপুর শিশু আশ্রয়কেন্দ্রে। সেখানে তিন মাস ছিল। তারপর এখানে। বছরখানেক পার হয়ে গেছে। এখনো সে দিনের বেশির ভাগ সময় কেঁদেই কাটায়। মা-বাবার কাছে ফিরে যেতে চায়; কিন্তু বাড়ি ফেরার পথ তার চেনা নেই। কেন্দ্রের একজন কর্মকর্তা বললেন, ওরা একেক সময় একেক ঠিকানা বলে। তাই অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না।

 

বরিশালের শান্ত

শান্তর বয়স এগারো হবে হয়তো। জটলার মধ্যে হঠাৎ দৌড়ে এসে বলে, ‘স্যার, আমি কিছু বলব। আমার কথা শুনতেই হবে। আমার বাড়ি বরিশাল। আমরা পাঁচ ভাই-বোন। আমি আমাদের গ্রামের স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়তাম। এক দিন আমাদের বাড়ির মালিকের মোবাইল চুরি করি। মা জানতে পেরে আমাকে মারধর করে আর মোবাইলটাও ফেরত দিয়ে আসে। সন্ধ্যায় বাবা বাড়িতে এসে আমাকে মারার জন্য খুঁজতে থাকে। আমি ভয়ে দৌড়ে বাড়ির পাশের ফেরিঘাটে চলে যাই। ফেরিতে উঠে ঘুমিয়ে যাই। সকালে দেখি সদরঘাটে। না খেয়ে ঘুরতে থাকি সারা দিন। বিকেলে মানুষের বস্তা টেনে ৩০ টাকা কামাই করে খেয়েদেয়ে ঘাটেই ঘুমিয়ে যাই। তিন-চার দিন এভাবে যাওয়ার পর দুই বন্ধুর সঙ্গে এয়ারপোর্টে চলে আসি। এখানে ভাঙ্গারি কুড়িয়ে বিক্রি করি আর ওভারব্রিজে ঘুমাই। এক দিন সকালে ওভারব্রিজ থেকে পুলিশ ধরে আমাকে মিরপুর পাঠিয়ে দেয়। সেখানে থেকে আমাকে এখানে পাঠানো হয়।’ দুই বছর হলো শান্ত এখানে আছে। সে এখান থেকে বের হতে চায়। লেখাপড়া করতে চায়। ফেরত যেতে চায় মা-বাবার কাছে।

 

ঢাকার মজনু

মজনুর বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। এই বয়সী মানুষের সংখ্যা এখানে হাতে গোনা। বাড়ি বরগুনা। এক ছেলে ও দুই মেয়ে তাঁর। পত্রিকা বিক্রি করে সংসার চালাতেন। এক দিন পত্রিকা বিক্রি করে বাড়ি ফেরার পথে ভিক্ষুুক ভেবে পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। অনেক কাকুতি-মিনতি করেও শেষ রক্ষা হয়নি। মিরপুরে ১৪ দিন ছিল। তারপর এখানে। আজ ছয় মাস হয়ে গেল। বাড়িতে খবর পাঠিয়েছে। কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা বললেন, তাঁর পরিবারের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করতে পেরেছি। তাঁরা ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যম ফেরত দেওয়া হবে।

আশ্রয়কেন্দ্রের ভেতরটা সবুজে ঘেরা। পুকুরও আছে বড়। বেশ বড় একটি মাঠ আছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এখানে আছে ২০৮ জন ভবঘুরে। তাদের মধ্যে ৩৯ জন মানসিক প্রতিবন্ধী। প্রায় ৫০ জন শিশু নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত। দুজন ডাক্তার সপ্তাহে এক দিন করে এখানে চিকিৎসা দেন। তবে প্রয়োজন আরো অধিক।

এই আশ্রয়কেন্দ্রে একজন সহকারী ব্যবস্থাপকসহ ২৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও একজন শিক্ষকসহ রয়েছেন ১১ জন।

 

আশার বাণী

ত্রিশাল উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাছান। বললেন, সপ্তাহে এক দিন খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। খাবারের মান ঠিক রাখতে তিনি নিজেও ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলেছেন। বছরে তিনবার পোশাক পরিবর্তনের বিধান আছে। সেটি যেন বাস্তবায়ন হয় সেদিকেও লক্ষ রাখছেন। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ৪৮ জনের পরিবারের খোঁজ পেয়ে তাদের হস্তান্তরের ব্যবস্থা করেছি। এই শিশুরা আগামী দিনের পৃথিবী গড়বে। তাদের জন্য সবারই যত্নবান থাকা দরকার।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা